ইডেন গার্ডেন

কলকাতার নন্দন কানন খ্যাত ইডেন গার্ডেন ক্রিকেট স্টেডিয়াম হল ধারণ ক্ষমতার দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ১৮৬৪ সালে নির্মিত এই স্টেডিয়াম টির বর্তমান ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার। যদিও তা প্রথম দিকে মাত্র ৬৭,৫৪৯ ছিল। তবে সে যাই হোক না কেনো এই ১৫০ বছর বয়সের স্টেডিয়ামটি কিন্তু এখন শুধুমাত্র একটি স্টেডিয়ামই নয়, এ যেনো ক্রিকেট ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্দ অংশ।

এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামটি নির্মিত হয় ইংরেজ শাসন আমলে। তখন শুধুমাত্র ক্রিকেট খেলার জন্য এ স্টেডিয়াম নির্মান করা হয় নি। এটি নির্মান করা হয়েছিল “রাগবি” এবং “ক্রিকেট” এই দু’ধরনের খেলার জন্য। ১৮৬৪ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এ স্টেডিয়ামে দু’টি খেলাই প্রচলিত ছিল কিন্তু ১৯৮৪ সালের পর থেকে এটাকে শুধুমাত্র ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই স্টেডিয়ামটি বর্তমানে “ক্রিকেট এসোসিয়েশন অব বেঙ্গল” এর তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হয়।

এই সুপরিচিত স্টেডিয়ামটির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু ১৯৩৪ সাল থেকে। ১৯৩৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভারত বনাম ইংল্যান্ড এর মধ্যকার টেস্ট খেলার মধ্য দিয়ে এ স্টেডিয়ামে শুরু হয় প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। এর আগে নানা ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা এখানে অনুষ্ঠিত হলেও এটিই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক খেলা। তবে একদিনের ম্যাচ এ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তারও অনেক পরে। ১৯৮৪ সালে এটিকে শুধুমাত্র ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে ঘোষনা দেয়ার পর ১৯৮৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বনাম ভারতের ম্যাচ দিয়ে একদিনের ম্যাচে এ স্টেডিয়ামের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এ স্টেডিয়ামটি অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলা ছাড়াও বেঙ্গল ক্রিকেট টিম ও কলকাতা নাইট রাইডার এ দুটি দলের ঘরোয়া মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।



১৫০ বছরের এই স্টেডিয়ামটি হাজারও ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে আছে। ক্রিকেটের ইতিহাসের অসামান্য অনেক ঘটনার সাথেই নিবির ভাবে জড়িয়ে আছে এই স্টেডিয়াম। সে ইতিহাস গুলো যদি স্মরণ করা হয় তবে সর্বপ্রথম মনে পড়বে অসাধারন সেই দিনের কথা। যে দিন “মোস্তাক আলি” নামক এক ভারতীয় ক্রিকেটার কে তার ভক্তরা অতুলনীয় সম্মান দিয়েছিল।

ঘটনাটা ১৯৪৬ সালের ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ান সার্ভিস-একাদশ এর মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচের। সে ম্যাচে বাজে খেলার জন্য মোস্তাক আলি কে টিম থেকে বাদ দিয়ে ভারতীয় একাদশ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে খেলা শুরু হওয়ার পর দর্শকরা যখন জানতে পারেন যে মোস্তাক আলিকে বাদ দেয়া হয়েছে তখন তারা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং তারা মোস্তাককে ফিরিয়ে আনার জন্য দাবি জানান। তাদের দাবির জন্যই দল আবার মোস্তাককে ফিরিয়ে আনে যা এখন পর্যন্ত এক বিরল ইতিহাস হয়ে আছে।

এছাড়াও এই স্টেডিয়ামের আছে আরও অনেক ইতিহাস। এই স্টেডিয়ামেই ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে এক টেস্ট খেলা নিয়ে এবং ১৯৯৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে অন্যএক টেস্ট খেলা নিয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা এ মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড বিশ্ববাসিকে এক অসাধারণ প্রতিদ্বন্দিতা মুলক খেলা উপহার দিয়েছিলেন। এ মাঠেই ১৯৯১ সালে ভারতের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম কপিল দেব হ্যাট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন।

১৯৯৯ সালে ঠিক এই স্টেডিয়ামেই পাকিস্তানি বোলার সোয়েব আকতার জীবনের প্রথমবার শচীন টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে বোল করেন এবং প্রথম বোলেই তার উইকেট শিকার করেন। যার ফলে সেখানে দর্শকদের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা দেখা দেয় এবং পরবর্তিতে সম্পুর্ণ দর্শক শুন্য মাঠে খেলা সম্পন্ন হয়। এই ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়ামেই ২০০০ সালে হারভাজন সিং ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম টেস্টে হ্যাট্রিক করেন। তবে এ সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ২০১৪ সালের ১৩ই নভেম্বর এর রেকর্ডটি। এই দিনে ভারতের রোহিত শর্মা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় ব্যক্তিগত ২৬৪ রান করেন যা ক্রিকেট এর ইতিহাসে একদিনের খেলার সর্বাধিক ব্যক্তিগত রান।

এছাড়া আরও হাজারও ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে এই ইডেন গার্ডেন কে ঘিরে। এ স্টেডিয়ামেই সর্বমোট তিনটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ এর খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে দু’টি মহিলা বিশ্বকাপের খেলাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৫০ বছরের ইতিহাস কাধে নিয়ে বেড়ানো এই স্টেডিয়াম কে এজন্যই বোধহয় ভারতের “লর্ডস” বলে আখ্যায়িত করা হয়। সময়ের সাথে এ স্টেডিয়াম হয়ে উঠছে আরও আধুনিক ও অসাধারণ। তাই এ ব্যাপারে সম্পুর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই স্টেডিয়ামটি ক্রিকেট ইতিহাসকে শেষ পর্যন্ত তার মাঝে ধারণ করে রাখবে।