সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

বিশ্বকর্মা পূজার ইতিহাস

বিশ্বকর্মা পুজো মানেই ঘুড়ি লাটাই আর দুপুরে জমিয়ে খাসির মাংস খাওয়া-দাওয়া । হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে বিশ্বকর্মা ছিলেন দেবশিল্পী। বিষ্ণুপুরাণের মতে প্রভাসের ঔরসে বৃহস্পতির ভগিনীর গর্ভে বিশ্বকর্মার জন্ম হয় । বেদে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বকর্মা বলা হয়েছে। বিশ্বকর্মা মূলত সৃষ্টিশক্তির রূপক নাম । সেই অর্থে ইনি পিতা, সর্বজ্ঞ দেবতাদের নামদাতা । বিশ্বকর্মা সর্বমেধ-যজ্ঞে নিজেকে নিজের কাছে বলি দেন। বিশ্বকর্মা বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা, বিধাতা ।

ঋগবেদের মতে ইনি সর্বদর্শী ভগবান। এঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পা সর্বদিক বিদ্যমান। বাহু ও পায়ের সাহায্যে ইনি স্বর্গ ও মর্ত্য নির্মাণ করেন । বিশ্বকর্মা শিল্পসমূহের প্রকাশক ও অলঙ্কারের স্রষ্টা,দেবতাদের বিমান-নির্মাতা । এঁর কৃপায় মানুষ শিল্পপকলায় পারদর্শিতা লাভ করে। ইনি উপবেদ, স্থাপত্য-বেদের প্রকাশক এবং চতুঃষষ্টি কলার অধিষ্ঠাতা । ইনি প্রাসাদ, ভবন ইত্যাদির শিল্পী ।

ইনি দেবতাদের জন্য অস্ত্র তৈরি করেন । মহাভারতের মতে– ইনি শিল্পের শ্রেষ্ঠ কর্তা, সহস্র শিল্পের আবিস্কারক, সর্বপ্রকার কারুকার্য-নির্মাতা । স্বর্গ ও লঙ্কাপুরী ইনিই নির্মাণ করেছিলেন । রামের জন্য সেতুবন্ধ নির্মাণকালে ইনি নলবানরকে সৃষ্টি করেন । কোনো কোনো পুরাণ মতে, বিশ্বকর্মা বৈদিক ত্বষ্টা দেবতার কর্মশক্তিও আত্মসাৎ করেছিলেন। এই জন্য তিনি ত্বষ্টা নামেও অভিহিত হন । বিশ্বকর্মার কন্যার নাম ছিল সংজ্ঞা। ইনি এঁর সাথে সুর্যের বিবাহ দেন ।

সংজ্ঞা সুর্যের প্রখর তাপ সহ্য করতে না পারায়, ইনি সুর্যকে শানচক্রে স্থাপন করে তাঁর উজ্জলতার অষ্টমাংশ কেটে ফেলেন । এই কর্তিত অংশ পৃথিবীর উপর পতিত হলে, উক্ত অংশের দ্বারা বিশ্বকর্মা বিষ্ণুর সুদর্শনচক্র, শিবের ত্রিশূল, কুবেরের অস্ত্র, কার্তিকেয়ের শক্তি ও অন্যান্য দেবতাদের অস্ত্রশস্ত্রাদি নির্মাণ করেন ।
বলা হয়ে থাকে, শ্রীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ জগন্নাথমূর্তি বিশ্বকর্মা প্রস্তুত করেন ।

বাঙালী হিন্দু গণ যে বিশ্বকর্মার মূর্তি পূজো করেন তিনি চতুর্ভুজা । এক হাতে দাঁড়িপাল্লা, অন্য হাতে হাতুরী, ছেনী, কুঠার থাকে । অবশ্যই এগুলি শিল্পের প্রয়োজনীয় জিনিষ, তাই শিল্প দেবতা বিশ্বকর্মা এগুলি ধারন করে থাকেন । দাঁড়িপাল্লার একটি কারন আছে ।

আমরা যদি দাঁড়িপাল্লা কে ভালো মতো লক্ষ্য করি দেখি সুপাশে সমান ওজনের পাল্লা থাকে। ওপরের মাথার সূচক যখন সমান ভাবে ঊর্ধ্ব মুখী হয়- তখন বুঝি মাপ সমান হয়েছে । এভাবে একটি পাল্লায় বাটখারা রেখে অপর টিতে দ্রব্য রেখে পরিমাপ হয় । এর তত্ত্ব কথা আছে । আমাদের জীবনের কাটাতি আত্মিক বিন্দুতে স্থির রাখতে হবে । দুই পাল্লার একদিকে থাকবে জ্ঞান আর কর্ম।

জ্ঞানের দিকে বেশী ঝুকে পড়লে কর্ম কে অবহেলা করা হবে পরিণামে আসবে দুঃখ, অভাব। আর কাটাতি কর্মের দিকে বেশী ঝুকে পড়লে তবে আসবে আধ্যাত্মিক অকল্যাণ । তাই কাটাতি দুয়ের মাঝে সমন্বয় করে রাখতে হবে । কোন দিকেই না যেনো বেশী ঝুকে পড়ে। এই নিয়ম না মেনে চললে বিশ্বপ্রেম, বিশ্ব ভাতৃত্ব সচেতনতা কোন টাই সম্ভব না।

Viswakarma Puja


বিশ্বকর্মার মূর্তি যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখি তাঁর বাহন হস্তী । কলকাতার কর্মকার সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট নেতা শিক্ষা ব্রতী স্বর্গত হরষিত কেশরী রায় প্রথম বিশ্বকর্মার হস্তী বাহন বিগ্রহের পূজা করেন । হাতী কেন বাহন? পুরানের প্রনাম মন্ত্রে বিশ্বকর্মা কে মহাবীর বলে বর্ণনা করা হয়েছে । হাতীর কত টা শক্তি তার আন্দাজ করতে পারি। নিমিষে গাছ পালা মাথা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেয় ।

কারোর ওপর চরণ ভার দিলে তার মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মৃত্যু আর অস্থি সকল চূর্ণ চূর্ণ হবে । এমন প্রবাদ আছে, হাতী নাকি একটু বড় পাথর শুঁড়ে তুলে ছুঁড়ে মারতে পারে । প্রাচীন কালে রাজারা যুদ্ধে হস্তী বাহিনীর প্রবল ভাবে ব্যবহার করতেন । তাই এই মহা শক্তিমান প্রানী এই দিক থেকে মহা যোদ্ধা বিশ্বকর্মার বাহন হবার যোগ্যতা রাখে ।

হস্তীর হাত নেই । তবে একটি ‘কর’ বা ‘শুন্ড’ আছে । কর আছে বলেই হাতীর এক নাম ‘করী’ । ‘কৃ’ ধাতু থেকেই ‘কর’ শব্দটির উৎপত্তি। সে এই শুন্ডের সাহায্যেই গাছের ডাল টানে, জল খায়, স্নান করে । আবার দেখি শিল্পের মাধ্যমেই কর্ম সংস্থান । তাই বিশ্বকর্মা কর্মের দেবতা । এই শূন্ড দ্বারা কর্ম করা – এই দিক থেকে হস্তী একভাবে বিশ্বকর্মার বাহন হিসাবে মানানসই ।

হস্তীকে দিয়ে অনেক কাজ করানো হয় । বন দপ্তর হস্তীকে দিয়ে কাঠ সরানোতে কাজে লাগায় । মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি, কান্ড মাহুতের নির্দেশে হাতী এক স্থান থেকে আর এক স্থানে নিয়ে যায়, আবার কখনো সে গাছের ডাল বয়ে নিয়ে যায় মাহুতের নির্দেশে । আবার বন্য হাতীদের তাড়াতে বন দপ্তর পোষা হাতী গুলিকে কাজে লাগায়। হাতীর জীবন টাই এই রকম কাজের। নিজের খাদ্য আরোহণ থেকে, মাল বওয়া সব সময় কাজ ।

আর শিল্পের সাথে কর্মের সংস্থান জল আর ঠান্ডার মতো। জলে যেমন ঠান্ডা ভাব থাকে তেমনই কর্মের মাধ্যমেই শিল্পের বিকাশ। তাই বিশ্বকর্মা হলেন কর্মেরও দেবতা । এই দিকে থেকে শ্রমিক হাতী বিশ্বকর্মার বাহন হিসাবে একেবারে মানানসই ।

বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

গণেশ চতুর্থী - নিয়ম, মন্ত্র, ছবি, পদ্ধতি

আজ, হিন্দু পৌরাণিক অনুযায়ী গণেশ চতুর্থী বা গণেশউৎসব। শিব ওঁ পার্বতী পুত্র গনপতি, নিজে মর্তে নেমে সমস্ত ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এই বিশেষ দিনে। হিন্দু পঞ্জিকা মতে ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গনেশ বা গজানন এই মর্তে পূজিত হন।

শ্রী গণেশ কে মঙ্গল মূর্তি, বিঘ্নহর্তা নামে ডাকা হয় । বলা হয় সমস্ত শুভ কাজের শুরু শ্রী গণেশের নাম নিয়ে করলে তা সফল হয় । দেবতাদের মধ্যে তাঁকে প্রথম পূজ্য বলা হয় । ঋক বেদে গণনাং ত্বা গণপতিং হবামহে মন্ত্রে গণপতির আহ্বান দেখা যায় । যজু বেদের মন্ত্রে গণেশ কে দেব গনের মধ্যে গণপতি, প্রিয় গনের মধ্যে প্রিয়পতি এবং নিধি গনের মধ্যে নিধিপতি বলা হয়েছে ।

গনপতয়ে স্বাহা মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়- কৃষ্ণ যজু বেদের কাণ্বসংহিতা এবং ঐ বেদের মৈত্রায়নী সংহিতা তে । মৈত্রায়নী সংহিতা ও তৈত্তিরীয় আরণ্যকের গণপতির গায়ত্রী উল্লেখ সহকারে তাঁর বর্ণনা আছে । গণেশ পুরানে গণেশ কেই ওঁঙ্কার রূপী ভগবান বলা হয় । পুরান মতে গণেশ ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর পুত্র – তথা কুমার কার্ত্তিকের অনুজ ।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে গণেশ ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় উৎপন্ন হন এবং ইনি ভগবান বিষ্ণুর মতো চক্র, শঙ্খ, গদা, পদ্ম ধারন করেন । বামন পুরান মতে ভগবতী মাতা পার্বতী স্বীয় দেহ থেকে ভগবান গণেশ কে প্রকট করেন । আবার বরাহ পুরান মতে গণেশের সৃষ্টি হয়েছিল ভগবান শিবের মুখ থেকে। গণেশের মুখ কিভাবে গজানন হল – তা নিয়ে পুরানে একাধিক কাহানী দেখা যায় ।

গণেশ চতুর্থী

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে গ্রহরাজ শণি দেব গণেশ কে দর্শন করলে গণেশের মুণ্ড পাত হয় । পুরানে শনি দেবতার দৃষ্টিকে হানিকারক বলা হয় । আবার শিব পুরান মতে গণেশের মুণ্ডচ্ছেদ করেন স্বয়ং তাঁর পিতা মহাদেব । বরাহ পুরানেও শিব দ্বারা গণেশের মুণ্ডপাতের ঘটনা দেখা যায় । এতে মহাদেবী গৌরী ভীষনা রুষ্টা হলে শাপযুক্ত ঐরাবতের মস্তক কেটে গণেশের ধড়ে লাগিয়ে তাঁকে পুনর্জীবন দিয়ে দেবতাদের মধ্যে সর্ব অগ্রে পূজ্য ঘোষোনা করা হয় । গণ+ ঈশ= গণেশ । গণ অর্থে সমষ্টি যিনি ঈশ্বর বা নায়ক। তিনিই গণেশ ।

গণ শব্দটির মধ্যে আর একটি অর্থ আছে। এর অর্থ সেনাবাহিনী । গনেদের দের অগ্র দেখে তাঁর এক নাম গনণায়ক । গণেশ কে একদন্ত নামে ডাকা হয়। বলা হয় গণেশের একটি দাঁত কেটেছিলেন পরশুরাম । মহাভারত স্বহস্তে লিখেছিলেন গণেশ । ব্যাস ঋষি বলতেন আর গণেশ লেখতেন । গণেশ হল ‘গন শক্তি’ এর প্রতীক ।

মূষিককে শ্রী গণেশের বাহন বলা হয় । এই অপকারী প্রানীটি কিভাবে বাহন হল – এর মধ্যেও তত্ত্ব কথা আছে । মূষিক তাঁর দন্ত দিয়ে জিনিষপত্র কেটে তছনছ করে। ভালো মতো দেখলে দেখা যায় মূষিক অত্যন্ত ধৈর্য নিষ্ঠা সহকারে একস্থানে বসে এগুলো কাটে । যা আমদের ধৈর্যপরায়ন ধীর স্থির হবার শিক্ষা দেয় । তাছারা জীব অষ্টপাশে বদ্ধ । ঘৃনা, অপমান, লজ্জা, মান, মোহ, দম্ভ, দ্বেষ, বৈগুণ্য ইত্যাদি অষ্ট পাশ । শ্রী গণেশের বাহন এই অষ্টপাশ ছিন্ন করবার শক্তি দেয় । আগামীকাল গণেশ চতুর্থী। সকলকে শুভেচ্ছা জানাই। শ্রী গণেশের চরণে প্রনাম জানিয়ে বলুন-

ওঁ দেবেন্দ্র- মৌলি- মন্দার মকরন্দ কণারুণাঃ ।
বিঘ্নং হরন্তু হেরম্বচরণাম্বুজরেণবঃ ।

বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

শিক্ষক দিবস

শিক্ষক দিবস বা গুরু পূর্নিমা সাধারণত হিন্দু এবং বৌদ্ধরা পালন করে থাকে। গুরু শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘গু’ যার অর্থ অন্ধকার এবং ‘রু’ যার অর্থ যিনি অন্ধকার দূর করেন।গুরু হচ্ছেন তিনি যিনি আমাদের মধ্যে থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করেন। আষাঢ় মাসের পূর্নিমা তিথিতে এই অনুষ্ঠান পালিত হয়। এইদিনে ভক্তরা পুজার্চনার মাধ্যমে গুরুকে সম্মান প্রদর্শন করেন।

বৌদ্ধরা ভগবান বুদ্ধের সম্মানে এই দিনটি পালন করেন, কারন এই দিনে তিনি প্রথম ধর্ম-উপদেশ দিয়েছিলেন। হিন্দুরা এইদিনটি পালন করেন মহান ঋষি বেদব্যাস কে স্মরণ করে। বেদব্যাস শুধু জন্মগ্রহন করেন নি, এইদিনে তিনি ব্রহ্ম সুত্র লেখা শেষ করেন। এটাকে ব্যাস পূর্নিমাও বলা হয়। এইদিনে হিন্দুরা তাদের শিক্ষকদের সম্মান প্রদর্শন করেন। হিন্দু যোগী এবং তপস্বীরা তাঁদের গুরুর পূজা করেন।

শিক্ষক দিবস


গুরু আর শিষ্যর সম্পর্কে থাকে এক অদৃশ্য বন্ধন - যাকে এক কথায় বলা যায় মুক্তির বন্ধন। প্রতিটি শিষ্যের জন্যে একজন গুরু নির্দিষ্ট থাকেন আর সেই শিষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় গুরুকেই। শিষ্যকে যে গুরু দীক্ষা দেন তার নেপথ্যে গুরুর নিজস্ব কোন স্বার্থ থাকেনা। থাকে একটাই লক্ষ্য - শিষ্যকে তার ঠিকানায় পৌছে দেয়া। আর সেখানে শিষ্য পৌছতে পারাই হচ্ছে গুরুর একমাত্র গুরুদক্ষিনা।

গুরু যখন শিষ্যকে দীক্ষা দেন তখন আপন সাধনশক্তি দিয়ে সৃষ্ট উর্জাশক্তিকে তিনি মন্ত্রের সাথে শিষ্যের ভিতরে প্রতিষ্ঠা করে দেন। এজন্যে কম শক্তি ব্যয় হয় না। এর ফলে দীক্ষার পর শিষ্যের একটা প্রারব্ধের অংশ গুরুকে টেনে নিতে হয়। জগতের অন্য কোন সম্পর্ক কিন্তু কারোর প্রারব্ধ নেয় না কোন কারণেই।

একমাত্র গুরুই এই প্রারব্ধ টানেন। শুধু তাই নয়। এরপর শিষ্য অনেকসময়েই নানা ভুল করে,অন্যায় করে আর তার শাস্তির একটা বড় অংশ গিয়ে পরে গুরুর উপরে।দোষ করে শিষ্য আর প্রারব্ধ ভোগেন গুরু। তাই দীক্ষার পর প্রতিটি শিষ্যের উচিত - কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে গুরুর থেকে মত নেয়া। গুরুর প্রতি কখনোই অসম্মান প্রদর্শন করতে নেই। তাতে ইষ্ট রুষ্ট হয়ে যান। আর গুরু যদি কখনো শিষ্যের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তার মন্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হন তখন শিষ্যের প্রতি যে ঘর বিপত্তি নেমে আসে তা সামাল দেয়ার শক্তি কিন্তু জগতে কারোরই থাকেনা। এমনকি ইষ্ট নিজেও সেই শিষ্যকে বাচাতে যান না।

সাধারনত শিষ্য যখন অসুস্থ হয়ে পরে তখন গুরু তাঁর জপ বাড়িয়ে দেন যাতে শিষ্য তার জপের শক্তিতে তাড়়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। একইভাবে শিধ্যের কর্তব্য - গুরু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের জপের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া যাতে গুরু সুস্থ হয়ে ওঠেন।কারণ গুরুর অধিকাংস ভোগ আসে শিষ্যের দুর্ভোগ থেকে। তাই শিষ্যের কর্তব্য - সেটি যথাসম্ভব কম গুরুর উপর চাপানো। উত্তম শিষ্যরা এটাই করে থাকেন। যেমন কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী করে দেখিয়েছিলেন বিজয়্কৃশ্ন গোস্বামীর জন্যে।

আসলে শিষ্য এবং গুরুর মধ্যে একটা জ্যোতির সংযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যা গুরুর সাথে শিষ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলে আলোর দিকে। তাই এই যাত্রায় দুজনের সাধনশক্তিরই প্রয়োজন পড়ে। যেখানে একইসাথে দ্রোনের মত গুরু আর অর্জুনের মত শিষ্য থাকে সেখানে অগ্রগতি হয় দ্রুত দুজনের মিলিত শক্তিতে কিন্তু যেখানে "গুরু আছেন,তিনি দেখবেন,আমি যা করার করি"ভাবনা নিয়ে শিষ্য চলে সেখানে বুঝতে হবে গুরু দিকপাল হলেও শিষ্যের জন্যে তার ফাটা কপাল।

অর্থাত সেখানে দুজনেই পিছিয়ে পড়বে। তাই শিষ্যের সবসময়ে উচিত -গুরুর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে অত্র দেখানো প্রণালীতে ঠিকমত জপ ধ্যান এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তবেই সার্থক হয় গুরু শিষ্যের অমৃতের পথে যাত্রা।

মঙ্গলবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৮

ভারতের স্বাধীনতা দিবস - সংগ্রাম, ইতিহাস

স্বাধীনতা দিবস হল ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একটি জাতীয় ছুটির দিন। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনকর্তৃত্ব থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। তারই স্মৃতিতে প্রতি বছর ১৫ অগস্ট ভারতে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে প্রধানত অহিংস অসহযোগ ও আইন অমান্য কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের পর ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হয়ে ভারত অধিরাজ্য ও পাকিস্তান অধিরাজ্য নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই বিভাজনের সময় ধর্মীয় দাঙ্গায় প্রচুর জীবন ও সম্পত্তি হানি ঘটেছিল। ভারত বিভাজনের ফলে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন জওহরলাল নেহেরু। এই দিন দিল্লির লাল কেল্লার লাহোরি দরজার উপর ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এর পর থেকে প্রতি বছরই স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লায় পতাকা উত্তোলন করে ভাষণ দেন।

স্বাধীনতা দিবসে সারা ভারতে পতাকা উত্তোলন কর্মসূচি, কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ভারতীয়রা এই দিন তাঁদের পোষাক-পরিচ্ছদ, যানবাহন ও বাড়িতে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত করেন। দেশাত্মবোধক গান ও দেশপ্রেমমূল চলচ্চিত্র সম্প্রচারিত হয়। এই দিনটি পারিবারিক পুনর্মিলন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে একত্রে মিলিত হওয়ার একটি দিনও বটে।

যে সব চলচ্চিত্র বা গ্রন্থে স্বাধীনতা ও দেশভাগের কথা রয়েছে, সেগুলিও এই দিন সম্প্রচারিত বা পঠিত হয়ে থাকে। ১৫ অগস্ট এবং তার আগের ও পরের দিনগুলিতে দেশে সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি হানার আশঙ্কা থাকে। তাই এই সময় দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা

Independence Day Kolkata


১৭শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বণিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করতে শুরু করে।.১৮শ শতাব্দীতে অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তির বলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থানীয় রাজ্যগুলিকে পরাজিত করে ভারতে নিজেদের শাসন কায়েম করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারত শাসন আইন (১৮৫৮) পাস হয় এবং ব্রিটিশ রাজশক্তি ভারতের প্রত্যক্ষ শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেয়। পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে ভারতে সুশীল সমাজ গড়ে ওঠে।

এই গড়ে ওঠার পিছনে অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি ছিল ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার প্রভৃতি শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে উদ্যোগী হয়। সেই সঙ্গে দমনমূলক রাওলাট আইনও পাস হয়। এর ফলে ভারতীয় আন্দোলনকারীরা স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি জানাতে থাকেন। এই সময় ভারতীয় জনসাধারণের অসন্তোষ সারা দেশব্যাপী অহিংস অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের জন্ম দেয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোহনদাস করমচন্দ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী)।

১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার ভারতে আংশিক স্বায়ত্তশাসন মঞ্জুর করার পর আইনসভা গঠিত হয়। এরপর নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করে। পরবর্তী দশকটি ভারতের ইতিহাসে একটি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার দশক। এই দশকেই ভারত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়, কংগ্রেস সর্বশেষ বারের জন্য অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে এবং অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের ইসলামি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে। তবে স্বাধীনতা লাভের আগে ভারতীয় উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে বিভাজিত হয়।

১৯২৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় এবং ২৬ জানুয়ারি তারিখটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কংগ্রেস জনসাধারণের কাছে আবেদন জানায়, যতক্ষণ না ভারত পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করছে ততক্ষণ তারা যেন আইন অমান্য কর্মসূচি পালন করেন এবং বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেস কর্তৃক প্রচারিত নির্দেশাবলি অনুসরণ করেন। এই ধরনের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রসার এবং ভারতের স্বাধীনতা অনুমোদনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।

১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস ২৬ জানুয়ারি তারিখটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে এসেছে। সেই সময় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জনসভার আয়োজন করা হত। সেই জনসভায় অংশগ্রহণকারীরা স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করতেন। জওহরলাল নেহেরু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, এই জনসভাগুলি ছিল শান্তিপূর্ণ ও ভাবগম্ভীর এবং এই সব সভায় কোনও প্রকার ভাষণ দেওয়া হত না বা কোনও সনির্বন্ধ মিনতি জ্ঞাপন করাও হত না।

গান্ধী ভেবেছিলেন যে এই সব জনসভার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কিছু সৃজনশীল কাজও করা যায়। যেমন, চরকা কাটা, সামাজিকভাবে অস্পৃশ্যদের সেবা করা, হিন্দু-মুসলমান সমন্বয়, সরকারিভাবে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অথবা এই সব কটি কাজই। ১৯৪৭ সালে ভারত প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সংবিধান কার্যকর হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তারিখে। সেই থেকে ২৬ জানুয়ারি তারিখটি ভারতে সাধারণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে

১৯৪৬ সালে ব্রিটেনে লেবার সরকার গঠিত হয়। সদ্যসমাপ্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের সরকারি অর্থভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে, ভারতে ক্রমবর্ধমান অস্থির পরিস্থিতির মোকাবিলায় তারা স্বদেশের সম্মতি বা আন্তর্জাতিক সাহায্য তো পাবেই না, তার উপর স্থানীয় বাহিনীর উপরেও নির্ভর করতেও পারবে না। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি ঘোষণা করেন, ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যেই ভারতকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার প্রদান করবে।

ভারতের নবনিযুক্ত ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন মনে করেন, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে ক্রমান্বয়িক বিতর্ক অন্তর্বর্তী সরকারের পতনের কারণ হতে পারে। তাই তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনটি এগিয়ে আনেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ অগস্ট তারিখটিকে ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ হিসেবে নির্ধারিত করেন।

১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করে, সরকার ব্রিটিশ ভারতকে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে এবং উক্ত দুই রাষ্ট্রের সরকারকে অধিরাজ্য মর্যাদা দেওয়া হবে এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্ণ অধিকারও দেওয়া হবে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭ পাস হয়।

উক্ত আইন বলে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ব্রিটিশ ভারত দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং স্বাধীন ভারতীয় অধিরাজ্য ও পাকিস্তান অধিরাজ্য (অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূখণ্ড সহ) গঠিত হয়। দুই রাষ্ট্রেরই গণপরিষদের উপর রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ আইনি কর্তৃত্ব স্বীকৃত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই এই আইনটি ব্রিটিশ রাজশক্তির সম্মতি লাভ করেছিল।

বুধবার, ২৫ জুলাই, ২০১৮

বাংলার ও পুরীর রথযাত্রা কেন হয়

রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত পালিত হয় চন্দ্র আষাঢ়ের শুক্লাপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে। হিন্দু দেবতাদের মাঝে অন্যতম জগন্নাথ দেব; ইনি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের একটি বিশেষ রূপ। জগন্নাথ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ জগৎ+নাথ=জগতের নাথ বা প্রভু। পৌরাণিক উপাখ্যান জগন্নাথদেব কে কেন্দ্র করে দুটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত আছে। প্রথম কাহিনি অনুসারে, কৃষ্ণ তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যন্মুর সম্মুখে আবিভূর্ত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তাঁর মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন।

মূর্তি নির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন সময় চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে জানিয়ে দেন মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তাঁর কাজে বাধা না দেন। বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। রাজা ও রানী সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

প্রতিদিন তাঁরা বন্ধ দরজার কাছে যেতেন এবং শুনতে পেতেন ভিতর থেকে খোদাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। ৬-৭ দিন বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। অত্যুৎসাহী রানী কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত।

বাংলার ও পুরীর রথযাত্রা কেন হয়

এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ। দ্বিতীয় কাহিনিটির অবতারণা করা হয়েছিল পূর্বোল্লিখিত উপখ্যানটির ব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসনের উদ্দেশ্যে। বৃন্দাবনে গোপীরা একদিন কৃষ্ণের লীলা ও তাঁদের কৃষ্ণপ্রীতির কথা আলোচনা করছিলেন।

কৃষ্ণ গোপনে সেই সকল কথা আড়ি পেতে শুনছিলেন। কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা নিয়োগ করা হয়েছিল গোপীরা যখন কৃষ্ণের কথা আলোচনা করেন তখন কৃষ্ণ যেন তাঁদের নিকটবর্তী না হতে পারে সেদিকে নজর রাখার জন্য। কিন্তু গোপীদের কৃষ্ণপ্রীতি দেখে পরিতুষ্ট সুভদ্রা তাঁদেরই কথা শুনতে শুনতে বিমোহিত হয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন না যে তাঁদের দুই দাদা কৃষ্ণ ও বলরাম এগিয়ে আসছেন।

শুনতে শুনতে দুই ভাইয়ের কেশ খাড়া হয়ে উঠল, হাত গুটিয়ে এল, চোখদুটি বড় বড় হয়ে গেল এবং মুখে আনন্দের উচ্চ হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই কারণেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এইপ্রকার রূপ। বৈষ্ণবেরা কৃষ্ণের এই বিমূর্ত রূপটিকে পূজা করেন।


মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১৮

জামাই ষষ্ঠী কি

ক’দিন আগেই ক্যালেন্ডারে কেটে গেছে ‘বঙ্গজীবনের অঙ্গ’ এক বিশেষ দিন। বিবাহিতা কন্যা তথা জামাই বাবাজীবনদের জন্য বাঙালি সমাজে দারুণ এক পার্বণ—জামাইষষ্ঠী! আনকোরা নতুন জামাই থেকে পুরনো জামাই বাবাজিদের জন্য বাংলা পঞ্জিকার এক বিশেষ দিন: জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিনটি। বাংলার জামাইদের জন্য উৎসর্গীকৃত নির্দিষ্ট দিনটিতে জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় শাশুড়িরা প্রতি বছর পালন করেন। এটি মূলত লোকায়ত এক প্রথা ও ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ। পরবর্তীতে এই পুজো ধর্মীয় সংস্কারের চেয়ে সামাজিকতায় স্থান পেয়েছে বেশি।

আধুনিকতার দিক থেকে আমরা যতই সমকালীন হই না কেন, কিছু কিছু প্রথা-পার্বণ আজও বাঙালি ঘরে থেকে গেছে। তাই বিশ্বায়নের যুগে বাঙালি জীবন থেকে আচার-অনুষ্ঠান সবই যে এক-এক করে উঠে যাচ্ছে, তা বোধহয় বলা যাবে না। কখনও পুরনো লোকাচার হাজির হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, যেমন নয়া মোড়কে জামাই আদর। গ্রামবাংলার পাশাপাশি শহুরে পরিমণ্ডলেও জামাইষষ্ঠী পালনের রীতি-রেওয়াজ খুব একটা ফিকে হয়ে যায়নি।

মনোলোভা নানান পদ রেঁধে-বেড়ে জমিয়ে জামাইকে খাওয়ানোর আহ্লাদ আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে। আদরের জামাইকে খাতির-আপ্যায়নের ধরনটা যদিও বদলে বদলে যাচ্ছে। যেমন বদলে যাচ্ছে আয়োজনের রকমও। সারা দিন ধরে ঘেমে নেয়ে রান্নার জোগাড় করা থেকে শুরু করে জামাইয়ের জন্য ভুরিভোজ বানানোর ব্যাপার বদলে দিয়েছিল কিছু বাঙালি রেস্তোরাঁর ‘ষষ্ঠী স্পেশাল’ বা ‘স্পেশাল থালি’।

ইদানীং মিডিয়া ফেসবুক অথবা বাণিজ্যিক পত্রিকার কল্যাণে অনেক আগেভাগেই জানা হয়ে যায়, কোন অনুষ্ঠানের জন্য কবে কী ব্যবস্থা থাকছে। পত্রিকা, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ ইত্যাদিতে সেই বিশেষ দিন ক’টি নিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রচার, তামাশা, রঙ্গ, কেনাকাটার হাতছানি। এ বছর ‘প্যান্টালুনস’ সংস্থার জামাইষষ্ঠীর বিজ্ঞাপনটি এই প্রতিবেদকের বেশ নজর কেড়েছে।

সেখানে রয়েছে ৩৪ প্রকার জামাইয়ের চরিত্রের ফিরিস্তি। ঘরজামাই, প্রবাসী জামাই, দায়িত্বশীল জামাই, উদাসীন জামাই, পেন্নামঠোকা জামাই, ইংলিশ-মিডিয়াম জামাই, ডাকসাইটে জামাই, প্রভাবশালী জামাই, সুবিধাবাদী জামাই, মিষ্টিমুখ জামাই, শুগার-ফ্রি জামাই, শৌখিন জামাই, আপনভোলা জামাই, টি-টোয়েন্টি ভক্ত জামাই—এমনই ৩৪ প্রকার জামাইয়ের মজাদার ফিরিস্তি।

তো মাদারস ডে, ফাদারস ডে, অমুক দিবস, তমুক দিবসের ফাঁক-ফোকরে আমাদের বাঙালিদের যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসা সাবেকি প্রথাসিদ্ধ ‘জামাইবরণ’ দিবসটিও একটু নতুন আন্তর্জাতিক মোড়কে ‘সন-ইন-ল’স ডে’ হিসেবে জুড়ে দেওয়া যায় না? যদিও বাংলা পত্রিকায় জামাইষষ্ঠী দিনটি কিন্তু বেশ তুখোড় ভাবেই নিজের স্থান অধিকার করে আছে সেই কবে থেকেই।

জামাইষষ্ঠী পার্বণটি লোকায়ত ও সামাজিক প্রথা হলেও মূলত ষষ্ঠী দেবীর পুজো। সন্তানের মঙ্গলকামনায় মা ষষ্ঠীর ব্রত পাঠ করা হয়। জামাইষষ্ঠীর নির্ধারিত দিনটিতে অনেক পরিবারেই মা ষষ্ঠীর পুজোর আয়োজন করা হত। কোথাও প্রতিমার ছবিতে, কোথাও বা ঘটে। মা ষষ্ঠী মাতৃত্বের প্রতীক। বিড়াল তাঁর বাহন।

ষষ্ঠীপুজোর থালায় পান সুপুরি ধান দুব্বো, ফলফলাদি অর্থাৎ গ্রীষ্মের জোগান যা যা রয়েছে সেই আম জাম কাঁঠাল তরমুজ লিচু ইত্যাদি এবং অবশ্যই তালপাতার একটি নতুন পাখা রাখা হয়। এ ছাড়াও ঘরের বাইরে কোনও দালান বা খোলা জায়গায় বট ও করমচা গাছের ডাল পুঁতে প্রতীকী অর্থে অরণ্য রচনা করে পুজো-আর্চা করা হয়। সে জন্যই এই ষষ্ঠীকে অন্য অর্থে ‘অরণ্যষষ্ঠী’ও বলা হয়।

মেয়ে-জামাইকে আপ্যায়ন করে ঘরে এনে, প্রথমে জামাইয়ের কপালে পুজোর নৈবেদ্যস্বরূপ পাঁচ রকম ফল, পান, সুপুরি, ১০৮টি দুব্বো-বাঁধা আঁটি, ধানের ছড়া, হলুদ তাগা, মাঙ্গলিক হলুদ ও দই, তালপাতার নতুন পাখার উপর আম্রপল্লব—সব একটি থালায় সাজিয়ে ছোঁয়ানো হয়। এর পর জামাইয়ের ডান হাতের কব্জিতে হলুদ সুতো ও দুব্বোর তাগা বেঁধে দেওয়ার রীতি। শাঁখ ও উলুধ্বনি দিয়ে জামাইকে বরণ করে নেওয়া এবং তাঁকে সামনে আসন পেতে বসিয়ে চর্বচোষ্য ভূরিভোজের এলাহি ব্যবস্থা। জামাইকে নতুন তালপাতার পাখার বাতাসও এ দিনের সনাতনী রীতি।

তবে শুধুই কি আর জামাই আদর? পেছনে লুকোনো একটা অর্থ তো থেকেই যায়। বাড়ির আদরের দুলালীকে তার হাতে সঁপে দিয়েই তো নিশ্চিন্ত হতে চায় বাবা-মায়ের স্নেহাবেগে ভারাক্রান্ত মন। তবু যেন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারা যায় না। চিন্তা থেকেই যায়। নতুন রাজ্যপাট নিয়ে কেমন আছে সে? স্বামীর কাছে, নতুন শ্বশুরবাড়ির কাছে কতটা মান্যতা পাচ্ছে?

Jamai Sasthi images

বাড়ির বউয়ের যথাযথ সম্মানটুকু কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিতে কোনও বাড়তি বেগ পেতে হচ্ছে না তো? ওই বাড়িতে তাদের আদরের কন্যাটির ঠিকমত যত্নআত্তি করা হয় তো? সত্যিই সুখী হতে পারবে তো আমাদের মেয়ে? কত রকম সাতপাঁচ দুশ্চিন্তা থেকেই যায় অভিভাবকের মনে। কবেকার সেই এক প্রবচন ছিল:

পুড়বে মেয়ে, উড়বে ছাই
তবেই মেয়ের গুণ গাই!’

আদ্যিকালের ওই প্রবচনটি শুনতে হয়তো এখন প্রচণ্ড বোকা বোকা লাগবে। গা জ্বলে যাবে। আগেকার সেই বস্তাপচা মানসিকতা তো এখন আর নেই। যথার্থ আধুনিক সমাজে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল। আর এ কথাও ঠিক যে, শ্বশুরবাড়িগুলো আজ অনেক বেশি লিবারাল এবং সহৃদয় মুক্তবুদ্ধি শিক্ষিত স্বামীরা আজ শুধু মাত্র ‘স্বামী’ পদবাচ্য নয়। তারাও আজ স্ত্রীদের প্রতি অনেক উদার ও বন্ধুবৎসল। অবশ্য স্ত্রী যাতে সংস্কারে স্বাধিকার ভোগ করতে পারে, সে বিষয়ে স্বামীকেও দায়িত্ববান হতেই হয়। সেটাই দস্তুর। আজকের জামাইরা বউয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট কেয়ারিং।

শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা শুনলে আজকের সপ্রতিভ পুরুষদের আর পেট গুড়গুড় মথা ভনভন হয় না। কাছেপিঠে শ্বশুরবাড়ি হলে তো কথাই নেই। সপ্তাহখানেক আগে থেকেই বউদের তাই এখন আর ‘হ্যাঁ গো, কী গো, যাবে তো?’ এই সব বলেকয়ে স্বামীদের কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে হয় না। বরের সঙ্গে বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য কথায় কথায় ‘মাখন মারতেও’ হয় না। জামাইবাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি কিঞ্চিৎ দূরে হলে অবশ্য অন্য কথা। অফিসে ছুটি পাওয়ার হ্যাপা, ট্রেনের রিজার্ভেশনের ঝক্কি এই সব।

বাকি শুধু বিমানযাত্রা। তা, পকেটে কিছু রেস্ত থাকলেও জামাইষষ্ঠী খেতে বউকে নিয়ে বউয়ের বাপের বাড়ি ফ্লাইটে যাওয়াটা বেশ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। তাই প্রবাসে বা একটু বেশি দূরে হলে ফি-বছর জামাইষষ্ঠীতে যাওয়া হয়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে গ্যাপ দিতে হয়। কী আর করা তখন? সেলফোনে শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম জানিয়ে, আশীর্বাদ রিসিভ করেই কাটিয়ে দেওয়া।

কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া অবশ্য ‘ডিউ’ থেকেই যায়। কথায় বলে, ‘যম, জামাই, ভাগনা কেউ নয় আপনা!’ ওটা কথার কথা। যম যেহেতু মৃত্যুর দূত, আর জামাই ও ভাগনা পরের বাড়ির উত্তরাধিকারী—তাই তাদের কখনও নিজের বলে দাবি করা যায় না। তবু জামাই খুশি থাকলে শ্বশুরবাড়িতে মেয়েরও কদর থাকবে। তাই জামাইকে একরকম ঘুষ দিয়েই কন্যাসন্তানের সুখ কিনতে চাওয়া। এ কথা জামাই ও তার বাড়ির লোকও বিলক্ষণ বোঝেন।

হ্যাংলা জামাই যদিও চক্ষুলজ্জার খাতিরে এমন নির্লিপ্ত ভাব করে খেতে বসে, যাতে সকলে তাকে আর একটু খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে! ওই যে একটা ঠাট্টার কথা আছে না? ‘একবার সাধিলেই খাইব’! তেমনই আর কী। তবে এখনকার শাশুড়িরা আসন পেতে, সুদৃশ্য হাতপাখা নেড়ে, কাঁসার থালা-বাটিতে বত্রিশ রকম পদ সাজিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে, শাঁখ বাজিয়ে, উলু দিয়ে ঘটা করে আর করেন না। কর্পোরেট অফিসে চাকরি করা জামাই এ সব সেকেলে রকম- সকম মোটেও পছন্দ করবে না।

তবু মায়ের মন চায় নিজে রান্না করে মেয়ে-জামাইকে খাওয়াতে। গালভরা কিছু রেসিপি শিখে ডাইনিং টেবিলে গুছিয়ে খেতে দিলেন। জামাই যখন ওই নানান পদ দেখে ‘কোনটা খাব আর কোনটা রাখব’ করছে—তখন তাকে আরও একটু প্রশ্রয়ের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে, গলায় খানিক আর্তি রেখে শাশুড়ি মা গর্ব করে হয়তো বলবেন, ‘আজ কিন্তু সব কিছু খেয়ে নেবে বাবা। আজ আর তোমার কোনও অজুহাতই ধোপে টিকবে না, বলে দিলাম! তোমার শ্বশুরমশাই দেখেশুনে পছন্দ করে সব বাজার করে এনেছেন। গলদা চিংড়িগুলো এত ফ্রেশ ছিল যে..এ দিকে রেওয়াজি খাসির মাংস কিনতেই পাক্কা চল্লিশ মিনিট লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। তার ওপর গাঙ্গুরামের মিষ্টির দোকানেও আজ যা ভিড় ছিল!’

দুপুরে না হয় একপ্রস্ত চর্ব-চোষ্য হল। দুপুরে হালকা ভাতঘুম দিয়েই বিকেলে মাল্টিপ্লেক্সে সবাইকে নিয়ে একটা ভাল মুভি দেখানোর ফিনান্সের দায়িত্ব কিন্তু জামাইয়ের। নামী রেস্তোরাঁয় আগে থেকেই ডিনার টেবিল বুক করে রাখা। সেও জামাইয়ের দায়িত্ব। মুড বুঝে বাঙালি খানা, নয় তো কন্টিনেন্টাল। ধোঁয়া ওঠা পুরোদস্তুর বাঙালি বনেদি মেনু।

আহা, দু’পক্ষই আজ খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে অন্তত দরাজ। খেয়ে, খাইয়ে পরিতৃপ্তির সঙ্গে আলাদা একটা আদেখলেপনাও। দেখনদারি। একটা বিনিময়প্রথা। এখনও কি আর সেই দিনকাল আছে, যখন কোনও যৌথ পরিবারের এ-তরফ বা ও-তরফের কোনও জামাই হঠাৎ করে বিনা নেমন্তন্নেই শ্বশুরবাড়ি এসে পড়েছেন আর বাড়ির কোনও উদয়াস্ত রান্নাঘরে পড়ে-থাকা গিন্নি গাইছেন—

‘বলি ও ননদি, আর দু’মুঠো
চাল ফেলে দে হাঁড়িতে
ঠাকুরজামাই এল বাড়িতে!’

জামাইদের নিয়ে আস্ত একটা দিন সেলিব্রেট করার মধ্য থেকেই শাশুড়ি ও জামাইয়ের মধ্যেকার নির্মল একটা সাবেক পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন টের পাওয়া যায়। এলাহি খাতির সে দিন। জামাইকে কাছে বসিয়ে পাত পেড়ে খাওয়ানো!’ অবশ্য এখনকার একটু আধুনিক শাশুড়ি মা হলে মেয়ে-জামাইকে তিনি নিয়ে যেতেন আধুনিক কোনও রেস্তোরাঁয়। নিজেই মেনু কার্ডে চোখ বুলিয়ে আমিষ নিরামিষ নানান পদের অর্ডার করে দিতেন। ষষ্ঠীর দিনের জামাই আদর সেই পছন্দসই মেনুতেই দিব্যি হয়ে যায়।

রেস্তোরাঁগুলোও অপেক্ষা করে থাকে, শাশুড়ি-জামাইয়ের পাতে ভেটকি পাতুরি, কষা মাংস, চিতল, ইলিশ, ডাব চিংড়ি অথবা চিংড়ি মালাইকারি, মোচার ঘণ্ট, লুচি, বেগুনভাজা, কাতলা মাছের মাথা দেওয়া মুগডাল, আমপানা থেকে ভাপা দই আর বেকড রসগোল্লা তুলে দেওয়ার জন্য—যা খেয়ে সুখ যেমন, খাইয়েও সুখ! গতিশীল যুগেও সে নব্যই হোক বা পুরনো, জামাইরাও এখন দিব্যি অনলাইনের বাজারে ফ্লিপকার্ড বা অ্যামাজন বা স্ন্যাপডিলেই শ্বশুর-শাশুড়ির উপহারটাও চুপিচুপি বুক করে দিচ্ছেন।

আসলে শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোর চাওয়া-পাওয়ারও তো কদর দিতে হয়। ওঁরাও তো এই বিশেষ দিনটায় জামাইকে নানা আদর-যত্ন ও উপহারে ভরিয়ে দিতে ত্রুটি রাখেন না। অনলাইনে বুক করা উপহার সামগ্রীও এখন জামাই নিজে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছনোরও ঢের আগেই পৌঁছে যায় শ্বশুরবাড়িতে। নিন্দুকেরা হয়তো মুখ বাঁকাবেন।

তাঁরা বলবেন, এই নব্যযুগে যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব। এককালে জামাই বাবাজিরা সস্ত্রীক এই জামাইষষ্ঠীর দিনটায় শ্বশুরবাড়ি যেতেন রীতিমত মাঞ্জা দিয়ে। কখনও সোনার চেন আঁটা সোনার বোতাম-সহ সিল্কের পাঞ্জাবি, কিংবা গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। আর খানিকটা অবধারিত ভাবেই হাতে থাকত পেল্লায় সাইজের মিষ্টি দইয়ের হাঁড়ি, বড় বাক্স ভর্তি নকুড়ের সন্দেশ, আড়াই-তিন কেজির ইলিশ, না হয় কাতলা বা রুই। আর তামাম শ্বশুরকুলের প্রণম্যদের জন্য শাড়ি-জামাকাপড়-সহ অন্যান্য উপহার।

কিন্তু দিনকাল বদলেছে। এখন জামাইবাবুরা একটা কিছু জমকালো অথচ বেশ এথনিক গিফট দিতে চান শাশুড়ি মা ও শ্বশুর মশাইকে। ওই প্যানপ্যানানি সন্দেশ-মিষ্টি, দইয়ের হাঁড়ি আর মাছ এখনকার দিনে ফেড আউট। কেমন এক ভেতো বাঙালি টাইপ আদিখ্যেতা হয়ে যায়। তা ছাড়া এখন নাগালে প্রচুর সুবিধা-সুযোগ, মোবাইলের কি-প্যাডে আঙুলের কারসাজিতে চটজলদি অনলাইনে কেনাকাটার হরেক অফার। তার চেয়ে স্ত্রীকে খানিক উসকে দিয়ে তার মায়ের জন্য নামী দোকানের হালকা

সোনার দুল বা পেনডেন্ট। দারুণ ফ্যাশনেবল হবে ব্যাপারটা। তবে এও জামাই বাবাজি ঠারেঠোরে জানে যে, মেয়ে মাকে ওই গয়না বেশি দিন পরতেই দেবে না! কিছু দিন বাদেই নিজের বিয়েতে উপহার পাওয়া একটা অপছন্দের ডিজাইনের দুলের সঙ্গে বদলে নেবে। দিলদার জামাইরা তো আজকাল শ্বশুরবাড়িতে উপহার দিতে বিশেষ হিসেবনিকেশও করেন না।

কখনও শৌখিন ব্যাগ, কিচেন গ্যাজেট, ডিনার সেট, বসার ঘরের পুরনো কুশন বা পর্দা পাল্টে একদম নতুন সেট, শ্বশুরমশাইকে বিদেশি শ্যাম্পেন, অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল, আইপ়ড, ডিভিডি—কত কিছুই তো দেওয়া যায়। কিছু শৌখিন জামাই আবার উপহার দেওয়ার ব্যাপারে আরও দড়। হয়তো শ্বশুর-শাশুড়িকে চার দিন তিন রাত ট্র্যাভেল প্যাকেজে পাঠিয়ে দিলেন বনভয়েজ-এ। জামাইকেও তো একটু ঠাটবাট, একটু ‘হাটকে পসন্দ’ দেখাতে হবে। তাই না? ছিদ্রান্বেষী নিন্দুকেরা চোখ টাটাল তো ভারী বয়েই গেল! উপহার বিনিময়ে জামাই খুশ। মেয়েও আহ্লাদে গদগদ। শ্বশুর-শাশুড়িরও অপার তৃপ্তি ও ভাল লাগা।

দিন বদলেছে। দু’পক্ষই এখন দু’পক্ষকে দিতে কী বৈভবে, কী দেখনদারিতে টেক্কা দিতে চায়। জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে শপিং মল, দোকানপাট, রেস্তোরাঁয় আহ্লাদের রমরমা। কেনাকাটা, গিফট, রিটার্ন গিফট—কত দেদার আয়োজন! বাড়ির মেয়েটা যেন একটু সুখে-আহ্লাদে থাকে, আরামে থাকে, আনন্দে থাকে, তাই তার ‘কেয়ার অব’ হাজব্যান্ডকে তোয়াজে রাখা আর কী। বচ্ছরকার এই দিনটিতে আমাদের গেরস্তপোষ মননে জামাইদের কিছুটা খাতিরদারি করে, সারা বছরের জন্য মেয়ের ভাল থাকাটা ফের ‘রিনিউ’ করে নেও।

মঙ্গলবার, ৮ মে, ২০১৮

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। তিনি বাড়িতে শিক্ষিত ছিলেন এবং সতেরো বছরে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে স্কুলে যাওয়ার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি তার পড়াশোনা শেষ করেননি। প্রাপ্তবয়স্ক বছরগুলিতে, তার বহুবিশিষ্ট সাহিত্যিক কার্যক্রম ছাড়াও, তিনি পারিবারিক এস্টেটে পরিচালনা করেন, একটি প্রকল্প যা তাকে সাধারণ মানবতার সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মধ্যে নিয়ে আসে এবং সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তার আগ্রহ বৃদ্ধি করে।

তিনি শান্তিনিকেতনে একটি পরীক্ষামূলক স্কুল শুরু করেন যেখানে তিনি তাঁর উপনিষদ শিক্ষার আদর্শের চেষ্টা করেন। সময়ে সময়ে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশ নেন, যদিও তার নিজের অনুভূতিহীন এবং স্বপ্নদর্শী উপায়ে এবং আধুনিক ভারতে রাজনৈতিক পিতা গান্ধী ছিলেন তাঁর অনুগত বন্ধু।

rabindranath tagore wallpaper images

1915 সালে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নাইটহুড পান, তবে কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ভারতে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে পদত্যাগ করেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি বাংলায় লেখক হিসেবে সাফল্য লাভ করেন। তাঁর কিছু কবিতা এবং অনুবাদের মাধ্যমে তিনি দ্রুত পশ্চিমে পরিচিত হন । আসলে তার খ্যাতি একটি উজ্জ্বল উচ্চতা অর্জন করে। বিশ্বের জন্য তিনি ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন এবং ভারতের জন্য, বিশেষত বাংলার জন্য, তিনি একটি মহান জীবিত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন।

যদিও রবীন্দ্রনাথ সব সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সফলভাবে সফল ছিলেন, তবে তিনি সর্বপ্রথম কবি ছিলেন। তাঁর পঞ্চাশ ও অদ্ভুত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সোনার তরি, গীতাঞ্জলি এবং বালাকা সব থেকে বেশি সাফল্য পায়। গীতাঞ্জলি, তাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রশংসিত। তিনি কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কাহিনী এবং কয়েকটি উপন্যাস লেখেন। এর পাশাপাশি তিনি তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে দুটি আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ অনেক ছবি ও গানও লিখেছিলেন যা রবীন্দ্র সঙ্গীত হিসেবে পরিচিতি পায়।

সোমবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৮

বুদ্ধ পূর্ণিমা, গৌতম বুদ্ধ ও তার জীবন দর্শন

বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা হল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি অতি পবিত্রতম দিন। এই দিনে অর্থাৎ বৈশাখী পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতেই মহামতি গৌতম বুদ্ধ লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, বুদ্ধগয়ায় বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন এবং কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ বা মহাপ্রয়াণ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জন্ম, বোধিজ্ঞান লাভ ও মহাপরিনির্বাণ একই দিনে হওয়ায় ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য শ্রেষ্ঠতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বের সকল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে এটি বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে পরিচিত। বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ একই দিনে অর্থাৎ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে হয়েছিল বলে বৈশাখী পূর্ণিমাকে বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে আখ্যায়িত করা হয়।

আজ থেকে ২৫৫৮ বছর পূর্বে বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধ আভির্ভূত হয়েছিলেন বা শুভ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ধন ধান্য ও সম্পদ প্রাচুর্যে ভরা কপিরাবস্তু রাজ্যের শাক্য বংশের রাজা ছিলেন শুদ্ধোধন। রাজা শুদ্ধোধন পত্নী রাণী মহামায়ার গর্ভে দেবদহে (রাণী মহামায়ার পিতৃগৃহ) যাওয়ার পথে লুম্বিনী'র (বর্তমান নেপালে অবস্থিত) শালবনে দেব-মনুষ্যের দুঃখ মুক্তির প্রবল মনোবাসনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন।

গৌতম বুদ্ধের বাল্য নাম ছিল সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থের জন্মের পরপরই তিনি সামনে হেঁটে এগিয়ে গেলেন। সাত পা এগোলেন এবং সপ্তপদে সাতটি পদ্মফুল প্রস্ফুটিত হলো। সিদ্ধার্থ বড় হয়ে অধিত জ্ঞানের কলা ও বিজ্ঞান এবং রনকৌশলের সার্বিক দক্ষতা অর্জন করেন। অতঃপর কোলীয় রাজ্যের রাজা সুপ্রবুদ্ধের কন্যা যশোধরার সাথে সিদ্ধার্থের বিয়ে হয়। রাজ প্রাসাদ, ঐশ্বর্য, রাজকীয় মর্যাদা, বিত্ত বৈভব সবকিছু মিলে পরম সুখে সংসার জীবন উপভোগ করছিলেন সিদ্ধার্থ।

একদিন সিদ্ধার্থ রাজ্য দর্শনে বের হয়ে দেখলেন জরাজীর্ণ, ব্যাধিগ্রস্ত লোক, মৃত ব্যক্তি ও সন্যাসী। মানব জীবনের এসব দূর্ভোগ ও চরম পরিণতি দেখে ও তার ব্যাখ্যা শুনে এবং তা উপলব্দি করে তিনি গভীর চিন্তামগ্ন হলেন এবং বিত্ত বৈভব ও সংসার জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে রাজকীয় জীবন বিসর্জন দিয়ে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

সিদ্ধার্থ একটি পুত্র সন্তান লাভ করলেন। নাম তার রাহুল। রাহুলের জন্মের সংবাদ পাওয়ার পরপরই সিদ্ধার্থ চিন্তা করলেন সংসারের বন্ধন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া রাজপ্রাসাদের রঙ্গমঞ্চে বাদ্যযন্ত্রসহ নর্তকীদের অপসৃত পরিধেয় কাপড়ে বীভৎস দৃশ্য এবং আরও সবকিছু মিলিয়ে রাজ প্রাসাদকে সিদ্ধার্থের শ্মশানের মত মনে হলো। এসময় তিনি জাগতিক ধর্মের এরূপ বিভিন্ন বীভৎস দৃশ্য দেখে অনিত্য ভাবনায় নিজেকে নিমগ্ন করেন এবং বিত্ত বৈভব-রাজকীয় ঐশ্বর্য ছেড়ে গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং একদিন আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে রাতে স্ত্রী, পুত্র, রাজ-বৈভবসহ সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে দেব মনুষ্যের কল্যাণে ও মুক্তির পথ অন্বেষণে গৃহত্যাগ করেন।

বুদ্ধ পূর্ণিমা

সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগের পর বিভিন্ন রাজ্য ভ্রমণ শেষে একদিন মাথার চুল নিজে কর্তন করে ঋষিপ্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। এরপর যথাক্রমে পঞ্চবর্গীয় ঋষির সাক্ষাৎ, কৃচ্ছতা সাধন, মধ্যম পন্থা অবলম্বনের মধ্য দিয়ে কঠোর ধ্যানে নিমগ্ন হন। ধ্যানের সময় বাধাদানকারীদের পরাজিত করে দীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনার পর ভারতের বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষ মূলে পূর্বনিবাসানুস্মৃতি বা পূর্ব জন্ম বৃত্তান্ত, দিব্যচক্ষু জ্ঞান বা জীবের জন্ম মৃত্যু, আসবক্ষয় জ্ঞান বা জাগতিক ভোগাঙ্খার নিবৃত্তি এই তিন প্রকার জ্ঞান লাভ করার পর বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি বা বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতেই সর্বজ্ঞতা জ্ঞান বা বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন।

মহামতি গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর মৈত্রীময় বৌদ্ধ ধর্ম সারা বিশ্বময় প্রচার করে দীর্ঘ ৪৫ বর্ষাবাস পূর্ণ করতঃ ভারতের কুশীনগরে ৮০ বৎসর বয়সে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি বা বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতেই মহাপরিনির্বাণ বা মহাপ্রয়াণ লাভ করেন।

মহামতি গৌতম বুদ্ধ সারা বিশ্বের মানব জাতির দুঃখ-বেদনাকে নিজের দুঃখ বলে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই মানব জীবনের দুঃখ-কষ্ট, জন্ম, জরা, ব্যাধি মৃত্যু স্বচক্ষে দেখে এবং তা উপলব্দি করে তিনি অঢেল সম্পদ, ঐশ্বর্য, রাজকীয় মর্যাদা, বিত্ত বৈভব ও সংসার জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু-এই চারটি চিরসত্যের কারণ উদঘাটন এবং মানব জাতির শান্তি ও মুক্তির পথ খুঁজতে নিজেকে গভীরভাবে নিমগ্ন রাখেন। এক সময় রাজপ্রাসাদের বিত্ত-বৈভব ও সুখ এবং স্বজনের মায়া ত্যাগ করে সম্বোধি বা বুদ্ধত্ব লাভের পন্থা অন্বেষণে তিনি বেরিয়ে পড়েন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে অজানার পথে। দীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনার পর মহামতি গৌতম বুদ্ধ বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন।

বিত্ত ও বৈভবের মধ্যে বড় হয়েও মহামতি বুদ্ধ উপলব্ধি করেছিলেন ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। তাই অহিংসা পরম ধর্ম এই নীতিকে ধারণ করে মহামতি গৌতম বুদ্ধ সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় আজীবন সাম্য ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করে গেছেন। শান্তি ও সম্প্রীতির মাধ্যমে আদর্শ সমাজ গঠনই ছিল তথাগত বুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য।

জগতের দেব-মনুষ্য তথা সকলের বিমুক্তি লাভের পথ প্রদর্শন করেছেন। জগতে হিংসা-হানাহানি বাদ দিয়ে, লোভ-দ্বেষ-মোহ ত্যাগ করে, তৃঞ্চাকে ক্ষয় করে, জন্ম-জরা-ব্যাধি-মৃত্যুকে জয় করে, একমাত্র মুক্তির পথ নির্বাণ-কে আবিষ্কার করেছেন এবং কি পন্থা অবলম্বন করলে নির্বাণ লাভ করা যায় তা মানব জাতিকে আজীবন শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

এই দিনটি যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে প্রতি বছরই পালিত হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধানতম উৎসব হিসেবে এই দিনটিতে সরকারি ছুটি থাকে। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে চলতে থাকে এই মহাপূণ্যময় দিবসটি উদযাপনের যাবতীয় কার্যক্রম। ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু, বৌদ্ধ সম্প্রদায়, বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটি ও বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগঠনগুলো এই প্রধান ধর্মীয় উৎসব পালনের লক্ষ্যে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে যাবতীয় ধর্মীয় কার্যাদি সম্পাদন করে থাকেন। বৌদ্ধ বিহারে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়।

সকালে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, বুুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল গ্রহণ, অষ্টশীল গ্রহণ, মহাসংঘদান, মহা অষ্টপরিস্কারদান, পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পাঠ, ভিক্ষু সংঘকে পিন্ডদান, বিকেলে বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভা, সন্ধ্যায় আলোক সজ্জা, হাজার বাতি প্রজ্জ্বলন, ফানুস উড্ডয়ন, দেশ ও জাতির মঙ্গল ও সমৃদ্ধি কামনায়, বিশ্ব শান্তি কামনায় এবং জগতের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে সমবেত বিশেষ প্রার্থনা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ পল্লীগুলোতে এ দিনে মেলা বসে।

শনিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৮

পহেলা বৈশাখ - স্বাগত বাংলা নববর্ষ

১৪ এপ্রিল মানে বাংলা সনের প্রথম দিবস। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। কালের যাত্রায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যুগে ক্ষণ গণনার প্রথা চালু করা হয়। এর মধ্যে ইসায়ী বা ইংরেজী সনের হিসাব দুনিয়া ব্যাপী প্রচলিত। অঞ্চল এবং ভাষা ভেদেও ক্ষণ গণনার প্রথা চালূ রয়েছে। আরবী সন বা হিজরী সালের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী। ফার্সিদেরও পৃথক সন রয়েছে। কালের আবর্তে বাংলায় ক্ষণ গণনার প্রথাও চালু হয়।

এটা নিশ্চয়ই বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের জন্য গর্বের বিষয়। বাংলা যাদের মুখের ভাষা, জন্মভুমির ভাষা তারা এ নিয়ে গর্ব করবেন। সুতরাং এই ভাষার ক্ষণ গণনার হিসাবের প্রথম দিন নিয়ে কিছুটা আবেগ থাকতেই পারে। যারা বা যিনি এই সন আবিস্কার করেছেন বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পেতে পারেন। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। অন্তত এটা বলা যায় বাংলা ভাষার প্রচলন এই অঞ্চলে এরও বহু আগে শুরু হয়েছিল। যে কারনে এই ভাষার সাথে সঙ্গতি রেখে ক্ষণ গণনা করার একটি পদ্ধতিও চালু করা হয়।

যদিও বাংলা সন চালুর বয়স ৫০০ বছর হয়েছে। কারন হিজর‍ী সানের সাথে সঙ্গতি রেখে এটার হিসাব শুরু করা হয়েছিল। তখন এই অঞ্চলে মুসলমানদের আধিপত্য ছিল। এই ক্ষণ গণনাকে এ অঞ্চলের বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন সকলেই আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন। কারন বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানই বেশি। কাজেই এই ক্ষণ গণনা পদ্ধতিটির পৃথক কোন ধর্মীয় আবেগ বা আবহ তৈরির কোন সুযোগ থাকতে পারে না। এটা নিয়ে বারাবারিও কিছু নেই।

পহেলা বৈশাখ নামটি উচ্চারিত হবার সাথে সাথে দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে মহা উৎসবের একটি চিত্র। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নারীদের শাড়ি ও ছেলেদের পায়জামা পাঞ্জাবি পোশাকে সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে। এদিনে তাদের পূজা এ আরাধনার পবিত্র রং লাল সাদা রঙ্গের কাপড় পরে দলে দলে শোভাযাত্রা বের করে দুঃখকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার লক্ষ্যে। বিভিন্ন কনসার্ট ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখে যোগ করে নতুন মাত্রা। কালক্রমে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখ পূজার সকল আসর অনুষ্ঠান বর্তমানে পহেলা বৈশাখে রুপ নিয়েছে। এদিনে নতুন বস্ত্র পরিধান করে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে,প্রদীপ জ্বালিয়ে রাতে গানের আসর বসায় যাতে গানে গানে সব রোগ শোক দূরীভূত হয়।

১লা বৈশাখ হল বাংলা বর্ষের প্রথম দিন। এই দিনে বাঙালি জাতি শুভ নববর্ষের উৎসব পালন করে। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শুভ নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে বরণ করে নেয়।

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ই এপ্রিল অথবা ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। আধুনিক বা প্রাচীন যে কোন পঞ্জিকাতেই এই বিষয়ে মিল রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

সকল সম্প্রদায় ও জাতি গোষ্ঠী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ১লা বৈশাখের এই শুভ দিনটিকে নিজেদের সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের শেকড় হিসাবে পালন করে। বাংলা নববর্ষের সাল গণনায় এবছরের বর্ষপঞ্জির হিসাবে ১৪২২ সাল । বলতে গেলে নববর্ষের বৈশাখী চেতনা আমাদের বিজাতীয় অপসংস্কৃতি হতে শেকড়ের মূল ধারায় ও রক্তের স্রোতের দিকে নিয়ে যেতে অসম্ভব রকম সাহায্য করে। বছর বছর বৈশাখের অবগাহন আমাদের নতুন প্রত্যয়ে - শেকড় অন্সুন্ধানের সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়।

বাংলা দিনপঞ্জীর সঙ্গে হিজরী ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুর হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু না সূর্যদোয় থেকে থেকে শুরু এটা নিয়ে অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যদোয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু হয়।

বাংলা সনের উৎপত্তি বিতর্ক ও সম্রাট আকবর

সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত।

এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন বাংলা শুভ নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।

ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতেহত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।

বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে নানা তথ্য ও তত্ত্ব পাওয়া যায়। বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে সঠিক কোন ইতিহাস পাওয়া না গেলেও অনেকে বলে থাকেন সম্রাট আকবরের নির্দেশে বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। আবার অনেকে রাজা শশাঙ্কের সময়ে বাংলা সনের শুরু হয়েছিল বলে মত দিয়ে থাকেন। তাদের মতে, সৌর পঞ্জিকা অনুসারে অনেক আগে থেকেই বাংলা বারটি মাস নিয়ে বছর গণনা করা হত৷ এ সৌর পঞ্জিকা ও গ্রেগেরিয় পঞ্জিকা শুরু হতো এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে৷ প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্ক (৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) নাকি গ্রেগেরিয় পঞ্জিকা অনুসারে ১৪ এপ্রিল থেকে বাংলার কাল গণনা শুরু করেছিলেন৷

অনেকে মনে করেন, পাল আমলে এই অঞ্চলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রভূত উন্নতি লাভ করার সময় বৌদ্ধ সহজিয়াদের হাতে সাল গণনার এই রীতি গণমানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছে। বাংলার শাসক পাল রাজাদের সময়ে তাদের সাম্রাজ্য প্রথম বাংলাভুমির বাইরে গিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করে। ফলে বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য এলাকায়। সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এ সময় থেকেই আসাম, ত্রিপুরা, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, উরিষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাডুতে নববর্ষ উদযাপিত হতো৷ কিন্তু সার্বজনীন উৎসব হিসেবে নয়৷ তখন এই নববর্ষকে ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবেই পালন করা হতো৷ এ উৎসবের মূল বিষয় ছিল কৃষিকাজকে প্রাধান্য দেয়া৷ কেননা এ সময় সমাজ-অর্থনীতি কৃষিকাজের উপর অধিকাংশ নির্ভরশীল ছিল ৷

ভারতবর্ষে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর তারা ঋতু বৈশিস্ট্যহীন হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে রাজ্য চালাতে শুরু করেন ও খাজনা আদায় করতেন ৷ কিন্তু খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে সেই বিশেষ দিনটির সাথে কৃষি ফসলের কোনো সমন্বয় ছিল না৷ ফলে অসময়ে কৃষকরা ফসলের খাজনা প্রদান করতে ব্যর্থ হতো৷ বলা হয়, খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা আনা ও প্রজাদের অনুরোধ রক্ষার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাধ্য হয়ে বিখ্যাত রাজ জ্যোর্তিবিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে হিজরি সালে সংস্কার আনার জন্য নির্দেশ দেন৷

তিনি সেই নির্দেশ অনুসারে সৌর ও হিজরি পঞ্জিকা বিশ্লেষণ করে নতুন বাংলা সালের নিয়ম নির্ধারণ করেন৷ ১৫৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয় এবং সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় বা ২৯তম বর্ষে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬) থেকেই নতুন পঞ্জিকা অনুসারে সাল গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয়৷ এ সালের নাম রাখা হয়ে ছিল ফসলি সাল, কিন্তু পরে এটি বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে বলে জানা যায়।

সম্রাট আকবর আসলেই বাংলা সন চালু করেছিলেন কিনা

সম্রাট আকবর কি আসলেই বাংলা সন চালু করেছিলেন নাকি অন্য কিছু ? ইদানিং অনেক লেখক এটি প্রমাণ করতে চান যে মুলতঃ সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক। আসলে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক ছিলেন না। তিনি শাসক হিসেবে অতি জোরে অবৈজ্ঞানিক ও সাধারণ নিয়মে অনুপযোগী একটি ঋতু বৈশিস্ট্যহীন বর্ষকে বাতিল করে পূর্ব হতে প্রচলিত এই এলাকার গণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় অথচ শাসকগণ কর্তৃক উপেক্ষিত একটি ঐতিহ্যপূর্ণ সার্বজনীন বর্ষ গণনার রীতিকে গ্রহণ করে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে ছিলেন। তুর্কি সহায়তায় ভারতে আরব ও মধ্য এশিয়া হতে আগত মুসলিমদের রাজত্ব শুরু হলে ধর্মের নামে এখানকার দীর্ঘ দিনের প্রচলিত বর্ষ গণনার রীতি বা অব্দগুলোকে গোঁড়াও অন্ধ ইসলামী শাসকেরা উৎখাত করে এখানে হিজরী সাল চালু করেছিল। কিন্তু সম্রাট আকবর ছিলেন মুক্ত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী, তিনি গোঁড়া আরব্য রীতির সমর্থক ছিলেন না।

তুলনামূলকভাবে তিনি পারস্য সংস্কৃতিকেই ধারণ করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি ধর্মেও পরিবর্তন এনেছিলেন। ইসলাম ধর্মের পরিবর্তে চালু করেছিলেন দীন-ই-ইলাহি। সেই আদলে তিনি দেখলেন, আরবের হিজরী সালের ব্যবহারটি এই এলাকায় ছিল অকার্যকর। তাই তিনি ভারতের বিশাল এলাকায় বা নেপাল হতে তামিলনাডু পর্যন্ত প্রচলিত অব্দকেই তাঁর শাসন ব্যবস্থায় গ্রহণ করেন। তাছাড়া বাংলা সাল বা বাংলা সংস্কৃতির সাথে সম্রাট আকবরের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি আরব্য সংস্কৃতির চেয়ে ফার্সি সংস্কৃতি ও ফার্সি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন ।

তিনি লোকজ সংস্কৃতি ও পীর ফকিরে ছিলেন বিশ্বাসী। তাই স্বাভাবিক ভাবেই সম্রাট আকবর আরবীর চেয়ে ফার্সিকে গুরুত্ব দিয়ে ছিলেন। তাঁর ভাবনায় এসেছিল ফার্সি আদলে বর্ষ গণনার নিয়ম যা মূলত বাংলা নয়, বলা চলে- সম্রাট আকবর একটি মুঘল অব্দ চালু করতে চেয়ে ছিলেন। সম্রাট আকবরের আমলে ফার্সি মাসের অনুকরণে নতুন প্রবর্তিত মুঘল মাসের নাম ছিল যথাক্রমে কারওয়ারদিন, আর্দি, খোরদাদ, তীর, আমারদাদ, শাহারিবার, ভিহিসু, আবান, আজার, দে, বাহমান ও ইসকান্দার মিজ৷ সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন ধর্ম দীন-ই-ইলাহি’র মতো এই পঞ্জিকারও নাম ছিল তারিখ-ই ইলাহি৷

ভারতীয় ঐতিহ্য ও বাংলা নববর্ষ

সম্রাট আকবর যে পার্সী ভাষা দিয়ে মোঘল শাসিত এলাকায় মাসের নাম দিয়ে ছিলেন এই অঞ্চলের মানুষ কিন্তু তা মেনে নেয়নি। তারা এই সব নাম বাদ দিয়ে সময়ের বিবর্তনে তা বদলিয়ে পূর্ব পুরুষদের আবিষ্কৃত ও চর্চিত নাম ব্যবহার করে আসছে। সে হিসেবে মাসের নামগুলো বিভিন্ন তারকার নাম অনুসারে বর্তমান নামে প্রর্বতন করা হয় ৷ বাংলা বা ফসলি সালে বারো মাসের নাম করা হয়েছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে যা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ সূর্যসিদ্ধান্ত (ঝঁৎুধ ঝরফফযধহঃধ) থেকে গৃহীত হয়েছে ৷ মাসের নামগুলো নিম্নরূপ-

বিশাখা নক্ষত্রের নাম থেকে বৈশাখ; জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ; উত্তরাষাঢ়া থেকে আষাঢ; শ্রবণা থেকে শ্রাবণ; পূর্বভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র; আশ্বিনী থেকে আশ্বিন; কৃত্তিকা থেকে কার্তিক; মৃগশীরা থেকে মাগশীষর (অগ্রহায়ণ);পূষ্যা থেকে পৌষ; মঘা থেকে মাঘ; উত্তর ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন; চিত্রা থেকে চৈত্র ৷ এই নাম গুলো সব এই উপমহাদেশের আদি ঐতিহ্য বহন করে এবং এই নামের সাথে আকবরের প্রচলিত মাসের নামের কোন মিল নাই।

আমাদের সংস্কৃতির এক মৌলিক উপাদন এই বাংলা বর্ষপঞ্জি৷ এ বর্ষপঞ্জির সূচনা হয় নববর্ষ উৎসবের মধ্য দিয়ে যা আমাদের জাতীয় চেতনার মূর্ত প্রতীক ৷ এ উৎসবের উদ্ভব হয়েছিল বাংলার কৃষক সমাজের মধ্য থেকে৷ আজও বাংলাবর্ষ আমাদের কৃষক সমাজের চেতনায় মিশে আছে৷ ভারতীয় ব্যবসায়ীরা অতি নিষ্ঠার সাথে শুদ্ধ চিত্তে হালখাতা এই দিন হালনাগাদ করেন। মূলত ব্যবসায়ীরা এই হালখাতা উৎসবকে বাঙালি জীবনে একটি উচ্চতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

বাংলা নববর্ষ নানা আয়োজনে সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও ভারতে সরকারী ভাবে প্রচলিত নববর্ষ কিন্তু শকাব্দ নিয়মে। আবার ভারতে এই শকাব্দ চালু করেছিলেন বৌদ্ধ সম্রাট রাজা কনিস্ক। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের বাইরে আজকাল এই শকাব্দের নিয়মেই ভারতের সরকারী ও পঞ্জিকা অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতি বছর ২২ মার্চ এই শকাব্দের নববর্ষ। পূজা পার্বণে অনুসরণ করলেও এই নববর্ষ কিন্তু ভারতীয়রা ধুমধামের সাথে পালন করে না।

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ

হালখাতা

এখন পহেলা বৈশাখ ও হালখাতা একে অপরের পরিপূরক। আগে পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা তাদের চাষাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখতেন। যা পরবর্তিতে ব্যবসায়িক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানীরা সারা বছরের বাকীর খাতা সমাপ্ত করার জন্য পহেলা বৈশাখের দিনে নতুন সাজে বসে দোকানে। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে শুরু করেন নতুন বছরের ব্যবসার সূচনা।

বিভিন্ন কর্পোরেট অফিস আজকাল হালখাতা করে তাদের ক্লায়েন্টদের কাছে কার্ড, মিষ্টি সহ নানা মুখরোচক খাবার দিয়ে থাকে। এখন আর বর্ষবরণের এই আয়োজন দেশে সীমাবদ্ধ নেই, এই অনুষ্ঠান বিদেশে প্রবাসীদের জন্য হয়ে ওঠেছে মিলন মেলার মেলার এক বিশাল ক্ষেত্র। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ। দুবাই, টোকিও, নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডনসহ বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে বসে পহেলা বৈশাখের বাহারি আয়োজন। সেই সাথে হালখাতাও দেশের বাইরে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে।

বাংলাদেশে বাংলা শুভ নববর্ষ বাপহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পড়ে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটমুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম-এর লালদিঘী ময়দান-এ। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহবান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ । ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবণ এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো নয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ।

বউমেলা

ঈশা খাঁর সোনারগাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে, যার নাম 'বউমেলা'। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো হিসেবে এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পেতে চায় ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে। বউমেলায় কাঙ্ক্ষিত মানুষের খোঁজে কাঙ্ক্ষিত মানসীর প্রার্থনা কিংবা গান্ধর্ব প্রণয়ও যে ঘটে না সবার অলক্ষে, তা কে বলতে পারবে।

ঘোড়ামেলা

এ ছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত জামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে।

সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে। শিশু-কিশোররা সকাল থেকেই উদগ্রীব হয়ে থাকে মেলায় আসার জন্য। এক দিনের এ মেলাটি জমে ওঠে দুপুরের পর থেকে। হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারণে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তথাপি সব ধর্মের লোকজনেরই প্রাধান্য থাকে এ মেলায়। এ মেলায় শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশি থাকে। মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়। নানারকম আনন্দ-উৎসব করে পশ্চিমের আকাশ যখন রক্তিম আলোয় সজ্জিত উৎসবে, যখন লোকজন অনেকটাই ক্লান্ত, তখনই এ মেলার ক্লান্তি দূর করার জন্য নতুন মাত্রায় যোগ হয় কীর্তন। এ কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। এভাবেই শেষ হয় বৈশাখের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।

চট্টগ্রামে বর্ষবরণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি পাহাড় পার্ক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এখানে পুরোনে বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুইদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মুক্ত মঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থবকে নানা প্রামীণ পন্যের পশরা। থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থাও। চট্টগ্রামে সম্মিলিত ভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিকগণের চেষ্টায়। ইস্পাহানী পাহাড়ের পাদদেশে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ১৯৭৮ সালে এই উৎসা এখনকবর ডিসি হিল পার্কে সরিয়ে নেওযা হয়।

১৯৭৮ সালের উদ্যোগের সয্গে জড়িত ছিলেন ওয়াহিদুল হক, নির্মল মিত্র, মিহির নন্দী, অরুন দাশ গুপ্ত, আবুল মোমেন সুভাষ দে প্রমূখ। প্রথম দিকে প্রত্যেক সংগঠন থেকে দুইজন করে নিয়ে একটি স্কোয়াড গঠন করা হত। সেই স্কোয়াডই সম্মিলিত সঙ্গীত পরিবেশন করতো। ১৯৮০ সাল থেকে সংগঠনগুলো আলাদাভাবে গাণ পরিবেশন শুরু করে। পরে গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদ যুক্ত হওয়ার পর অনুষ্ঠানে নাটকও যুক্ত হয়েছ। নগরীর অন্যান্য নিয়মিত আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শিশু সংগঠন ফুলকীর তিনদিন ব্যাপী উৎসা যা শেষ হয় বৈশাখের প্রথম দিবসে। নগরীর মহিলা সমিতি স্কুলে একটি বর্ষবরণ মেলা হয়ে থাকে।

পার্বত্য জেলায়, আদিবাসীদের বর্ষবরণ

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্রজাতিস্বত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিস্বত্ত্বা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি। উৎসবের নানা দিক রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মার্মাদের পানি উৎসব।

পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন

পশ্চিমবঙ্গে মহাসমারোহে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষারম্ভ পয়লা বৈশাখ। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিতে বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে সমগ্র পশ্চিম বাংলায়। বাংলার গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের মেলবন্ধন সাধিত হয়ে সকলে একসূত্রে বাঁধা পড়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দে। সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুবসংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়কপূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে।

এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। এই মেলায় অংশগ্রহণকারীগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকে। এছাড়া বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তিতা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করে সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা বর্জন করার প্রতীকী প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যমান। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি বহুলপ্রচলিত।

বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই এদিন থেকে তাদের ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন করে, যার পোশাকি নাম হালখাতা। গ্রামাঞ্চলে এবং কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে পয়লা বৈশাখ থেকে আরম্ভ হয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা সমগ্র বৈশাখ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়।

কলকাতা

ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা পয়লা বৈশাখ উদযাপনে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। নববর্ষারম্ভ উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন পাড়ার অলিতে গলিতে নানা সংগঠনের উদ্যোগে প্রভাতফেরি আয়োজিত হয়। বিগত বছরের চৈত্র মাসে শহরের অধিকাংশ দোকানে ক্রয়ের উপর দেওয়া হয়ে থাকে বিশেষ ছাড়, যার প্রচলিত কথ্য নাম চৈত্র সেল।

তাই পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে এবং এই ছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করতে অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে কলকাতার সমস্ত মানুষ একমাস ধরে নতুন জামাকাপড়, ইত্যাদি ক্রয় করে থাকে। পয়লা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার বিখ্যাত কালীঘাট মন্দিরে। সেখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ভোর থেকে প্রতীক্ষা করে থাকেন দেবীকে পূজা নিবেদন করে হালখাতা আরম্ভ করার জন্য। ব্যবসায়ী ছাড়াও বহু গৃহস্থও পরিবারের মঙ্গল কামনা করে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন। এইদিন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধুতি-পাঞ্জাবি এবং শাড়ি পরার রেওয়াজ প্রচলিত।

অন্যান্য দেশে পয়লা বৈশাখ

বাংলাদেশ এবং ভারত ছাড়াও পৃথিবীর আরো নানান দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়ে থাকে।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে যেমনঃ সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানবেরাতে বৈশাখী মেলার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ নাচ-গান-ফ্যাশন শো-খাবারের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির এ ধারাকে আনন্দময় করে তোলে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আগে বার্নউড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলেও ২০০৬ সাল থেকে সিডনি অলিম্পিক পার্কে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলায় বিপুল পরিমাণ লোকের সমাগম ঘটে এবং প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এটি একটি আনন্দঘন দিন।

সুইডেন

সুইডেনেও বিপুল উৎসাহের সাথে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়।

ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডে অবস্থানকারী প্রবাসী বাঙালিরা স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল (পথ উৎসব) পালন করে। এই উৎসবটি লন্ডনে করা হয়।ইউরোপে অনুষ্ঠিত সর্ববৃহৎ এশীয় উৎসব এটি এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া সর্ববৃহৎ বাঙালি উৎসব।

সোমবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৮

ইডেন গার্ডেন - বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম

কলকাতার নন্দন কানন খ্যাত ইডেন গার্ডেন ক্রিকেট স্টেডিয়াম হল ধারণ ক্ষমতার দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ১৮৬৪ সালে নির্মিত এই স্টেডিয়াম টির বর্তমান ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার। যদিও তা প্রথম দিকে মাত্র ৬৭,৫৪৯ ছিল। তবে সে যাই হোক না কেনো এই ১৫০ বছর বয়সের স্টেডিয়ামটি কিন্তু এখন শুধুমাত্র একটি স্টেডিয়ামই নয়, এ যেনো ক্রিকেট ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্দ অংশ।

এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামটি নির্মিত হয় ইংরেজ শাসন আমলে। তখন শুধুমাত্র ক্রিকেট খেলার জন্য এ স্টেডিয়াম নির্মান করা হয় নি। এটি নির্মান করা হয়েছিল রাগবি এবং ক্রিকেট এই দু'ধরনের খেলার জন্য। ১৮৬৪ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এ স্টেডিয়ামে দু'টি খেলাই প্রচলিত ছিল কিন্তু ১৯৮৪ সালের পর থেকে এটাকে শুধুমাত্র ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই স্টেডিয়ামটি বর্তমানে ক্রিকেট এসোসিয়েশন অব বেঙ্গল এর তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হয়।

এই সুপরিচিত স্টেডিয়ামটির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু ১৯৩৪ সাল থেকে। ১৯৩৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভারত বনাম ইংল্যান্ড এর মধ্যকার টেস্ট খেলার মধ্য দিয়ে এ স্টেডিয়ামে শুরু হয় প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। এর আগে নানা ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা এখানে অনুষ্ঠিত হলেও এটিই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক খেলা। তবে একদিনের ম্যাচ এ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তারও অনেক পরে। ১৯৮৪ সালে এটিকে শুধুমাত্র ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে ঘোষনা দেয়ার পর ১৯৮৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বনাম ভারতের ম্যাচ দিয়ে একদিনের ম্যাচে এ স্টেডিয়ামের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এ স্টেডিয়ামটি অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলা ছাড়াও বেঙ্গল ক্রিকেট টিম ও কলকাতা নাইট রাইডার এ দুটি দলের ঘরোয়া মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৫০ বছরের এই স্টেডিয়ামটি হাজারও ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে আছে। ক্রিকেটের ইতিহাসের অসামান্য অনেক ঘটনার সাথেই নিবির ভাবে জড়িয়ে আছে এই স্টেডিয়াম। সে ইতিহাস গুলো যদি স্মরণ করা হয় তবে সর্বপ্রথম মনে পড়বে অসাধারন সেই দিনের কথা। যে দিন মোস্তাক আলি নামক এক ভারতীয় ক্রিকেটার কে তার ভক্তরা অতুলনীয় সম্মান দিয়েছিল।

ঘটনাটা ১৯৪৬ সালের ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ান সার্ভিস-একাদশ এর মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচের। সে ম্যাচে বাজে খেলার জন্য মোস্তাক আলি কে টিম থেকে বাদ দিয়ে ভারতীয় একাদশ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে খেলা শুরু হওয়ার পর দর্শকরা যখন জানতে পারেন যে মোস্তাক আলিকে বাদ দেয়া হয়েছে তখন তারা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং তারা মোস্তাককে ফিরিয়ে আনার জন্য দাবি জানান। তাদের দাবির জন্যই দল আবার মোস্তাককে ফিরিয়ে আনে যা এখন পর্যন্ত এক বিরল ইতিহাস হয়ে আছে।

এছাড়াও এই স্টেডিয়ামের আছে আরও অনেক ইতিহাস। এই স্টেডিয়ামেই ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে এক টেস্ট খেলা নিয়ে এবং ১৯৯৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে অন্যএক টেস্ট খেলা নিয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা এ মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড বিশ্ববাসিকে এক অসাধারণ প্রতিদ্বন্দিতা মুলক খেলা উপহার দিয়েছিলেন। এ মাঠেই ১৯৯১ সালে ভারতের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম কপিল দেব হ্যাট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন।

১৯৯৯ সালে ঠিক এই স্টেডিয়ামেই পাকিস্তানি বোলার সোয়েব আকতার জীবনের প্রথমবার শচীন টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে বোল করেন এবং প্রথম বোলেই তার উইকেট শিকার করেন। যার ফলে সেখানে দর্শকদের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা দেখা দেয় এবং পরবর্তিতে সম্পুর্ণ দর্শক শুন্য মাঠে খেলা সম্পন্ন হয়। এই ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়ামেই ২০০০ সালে হারভাজন সিং ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম টেস্টে হ্যাট্রিক করেন। তবে এ সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ২০১৪ সালের ১৩ই নভেম্বর এর রেকর্ডটি। এই দিনে ভারতের রোহিত শর্মা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় ব্যক্তিগত ২৬৪ রান করেন যা ক্রিকেট এর ইতিহাসে একদিনের খেলার সর্বাধিক ব্যক্তিগত রান।

এছাড়া আরও হাজারও ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে এই ইডেন গার্ডেন কে ঘিরে। এ স্টেডিয়ামেই সর্বমোট তিনটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ এর খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে দু'টি মহিলা বিশ্বকাপের খেলাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৫০ বছরের ইতিহাস কাধে নিয়ে বেড়ানো এই স্টেডিয়াম কে এজন্যই বোধহয় ভারতের লর্ডস বলে আখ্যায়িত করা হয়। সময়ের সাথে এ স্টেডিয়াম হয়ে উঠছে আরও আধুনিক ও অসাধারণ। তাই এ ব্যাপারে সম্পুর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই স্টেডিয়ামটি ক্রিকেট ইতিহাসকে শেষ পর্যন্ত তার মাঝে ধারণ করে রাখবে।

রবিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৮

বাসন্তী পূজার ইতিহাস

স্মরণাতীত কাল থেকে দুর্গা পূজা এ ভূখণ্ডে হয়ে আসছে। সেই পূজা হচ্ছে চৈত্র মাসের বাসন্তী পূজা। বসন্ত কালের এ দুর্গাপূজা হচ্ছে আদি দুর্গাপূজা। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশেই দুর্গাপূজো প্রধান উৎসব রূপে গণ্য হয়ে আসছে।

কলকাতার নামকরা পুরনো পূজাগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে আছে শোভাবাজার রাজবাড়ি, হাটখোলার দত্ত, পাথুরিয়াঘাটা, লাহাবাড়ির পূজা, ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির পূজা, মালিক বাড়ির পূজা ইত্যাদি।

প্রাণকৃষ্ণ হালদারের পুজো: কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটলে সবচেয়ে পুরনো পূজা বলতে পাওয়া যায় বাগবাজারের প্রাণকৃষ্ণ হালদারের পূজা। কষ্ঠিপাথরের খোদাই করা সেই মূর্তির সঙ্গে ছেলেমেয়ে নন, ছিলেন জয়া আর বিজয়া নামে দুই সঙ্গিনী। সে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা।

বেহালার সাবর্ণ রায় চৌধুরীর পূজা: কলকাতার প্রথাগত দুর্গা পূজার পথিকৃৎ কিন্তু প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো বেহালা সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের এই পূজা। ১৬১০ সালে এই পূজার সূত্রপাত করেন বড়িশার জমিদার লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মজুমদার। এই পূজা আজো চলছে শুরুর সময়কার আচার পদ্ধতি অনুসারেই। পূজার বোধন হয় কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে, অর্থাৎ মহানবমীর ১৫ দিন আগের তিথিতে। দেবী মূর্তির রূপ ও রংয়ের কোনো পরিবর্তন নেই। মণ্ডপে মূর্তিও তৈরি হয় সেই পুরনো আমলের কাঠামোর ওপর। আটচালা মণ্ডপেই হয় কুমারী পূজা।

শোভাবাজারের রাজবাড়ির পূজা: ১৭৫৭ সালে লর্ড ক্লাইভের পলাশী জয়ের পরে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসারদের আপ্যায়নের জন্যই রাজা নবকৃষ্ণদেব এই পূজার আয়োজন করেন। রথের দিনে কাঠামো পূজা করে মূর্তি বানানো শুরু হয়। বোধন হয় নবমীর ১৫ দিন আগে। পূজায় বসত বাছাই করা বাইজিদের নাচের আসর। সন্ধিপূজায় কামান ছোঁড়া হতো। গোরাদের ব্যান্ড বাজিয়ে মহাসমারোহে জোড়া নৌকায় ভাসান হতো দশমীতে। তারপর উড়িয়ে দেওয়া হতো কৈলাশের উদ্দেশ্যে নীলকণ্ঠ পাখি।

বাসন্তী পূজা

হাটখোলার দত্তবাড়ির পূজা: পূজায় শোভাবাজার বাড়ির সঙ্গে বরাবরের টক্কর দিত হাটখোলার দত্তরা। নিমতলা স্ট্রিটে জগৎরাম দত্ত এই পূজার প্রচলন করেন। পরে পূজার দায়িত্ব নেন ঈশ্বর দেব প্রসাদ। সিংহের মুখ হতো ঘোড়ার মতো। চালচিত্রের উপরে রাধাকৃষ্ণ আর নিচে নিশুম্ভ যুদ্ধের বর্ণনা আঁকা। মাথায় থাকত দুটি টিয়া। রিপু বলির নামে ফল, সবজি বলি হতো। বাইজি থেকে সপুত্র মহিলা সব কিছুতেই ছিল টেক্কা দেওয়ার লড়াই। লড়াই চলত ভাসানের মিছিল বা ঘাটের লড়াই নিয়ে। ভাসানে উড়ত দুইটি নীলকণ্ঠ।

লাহাবাড়ির পূজা: ঈশ্বর প্রাণকৃষ্ণ লাহা প্রায় ২০০ বছর আগে এই পূজা শুরু করেন। কথিত আছে স্বপ্নে পারিবারিক দেবী জয়া জয়া মায়ের নির্দেশেই পূজা আরম্ভ হয়। এই পূজা লাহা বাড়ির পূজা নামে বিখ্যাত। এদের দুর্গা শিবনেত্র। শিবের কোলে তার অধীষ্ঠান। রিপু বলি এদেরও হয়। পূজা শুরু হয় সপ্তমীতে নাটমন্দিরে জয়া জয়া মা-এর অধীষ্ঠানের পরে। দশমীতে যখন মা বেরিয়ে যান তারপর থেকে মূল ফটক বন্ধ থাকে। বিসর্জনের পরে একজন বাইরে থেকে চেঁচিয়ে ৩ বার মা কে ডাকেন, মা ভিতরে থেকে গেছেন কী না জানতে। নিশ্চিত হলে তবে দরজা খোলে।

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূজা: ১৭৮০ সালে থেকেই রামদুলাল দে সরকার তার বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে যে পূজার প্রচলন করেন তাই পরে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূজা নামে খ্যাত। এদের ঠাকুরদালান গঙ্গামাটির তৈরি, এদেরও রথের দিনে কাঠামো পূজা হয়। এখানে অসুরসহ মা-দুর্গা এবং তার সন্তানদের সাজানো হয় মঠচুবড়ি আর্টে। সিংহ ঘোটকাকৃতি। লক্ষ্মী- সরস্বতী পূজিত হন জয়া-বিজয়া রূপে। আর থাকেন শিব, রাম, হনুমান। প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠি পর্যন্ত ঘট পূজা করা হয়। সপ্তমীতে কলা বোউ স্নান করিয়ে মূর্তিপূজা শুরু। শুরুর দুই বছর পরে এক অষ্টমীতে বলির জন্য আনা ছাগশিশু রামদুলালের পায়ের ফাঁকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নেয়। এই ঘটনার পরে প্রাণি বলি বন্ধ হয়ে যায়। আখ ও চালকুমড়ো বলি হয়।

পাথুরিয়াঘাটার পূজা: পাথুরিয়াঘাটায় প্রায় ১৬৫ বছরের পুরনো দুর্গা পূজার সূত্রপাত রামলোচন ঘোষের হাতে। ৩ চালার ঠাকুর আর ঘোড়া মুখের সিংহ এই পূজায়। ষষ্ঠী ও নবমীতে কুমারী পূজা ছাড়া সধবা পূজাও হয়। এদের শিল্পী ও ঢাকিরাও আসত পরিবারের মধ্যে থেকেই। ৭০-৮০ বছর হলো এখানে বলি বন্ধ।

হাওড়া পণ্ডিত মহাশয়ের বাড়ির পূজা: হাওড়া পণ্ডিত সমাজের সভাপতি মুরারী মোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পূজা শুরু হয় ৩৫০ বছর আগে। মা এখানে কন্যারূপে পূজিত হন। বাড়ির মেয়েরা পূজার বৈদ্যের জন্য মুড়কি, নাড়ু তৈরি করেন। সারা বছর বাড়িতে যা রান্না হয় সপ্তমী থেকে নবমী সেই সমস্ত পদ রান্না করে মায়ের ভোগ নিবেদন করা হয়। অষ্টমীর দিন সন্ধি পূজার পর একটি থালায় সমান করে সিঁদুর দিয়ে চৌকির ওপর মূল বেদীর তলায় একটি কাঠির সাহায্যে রাখা হয়। দশমীর দিন ওই থালায় মায়ের হাত, পা কিংবা পদ্মের চিহ্ন পাওয়া যায়।

সোমবার, ১২ মার্চ, ২০১৮

বিশ্ব মাতৃ দিবস - যেভাবে আসলো মায়েদের জন্য শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার দিন

মাতৃ দিবস হল একটি সম্মান প্রদর্শন জনক অনুষ্ঠান যা মায়ের সন্মানে এবং মাতৃত্ব, মাতৃক ঋণপত্র, এবং সমাজে মায়েদের প্রভাবের জন্য উদযাপন করা হয়। এটি বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বিভিন্ন দিনে, সাধারণত মার্চ, এপ্রিল বা মে উদযাপন করা হয়। এটি বাবা দিবসের অনুপূরক, যা পিতার সম্মান প্রদর্শন জনক অনুষ্ঠান।

বিশ্বের সর্বত্র মায়ের এবং মাতৃত্বের অনুষ্ঠান উদযাপন করতে দেখা যায়। এ গুলোর অনেকই প্রাচীন উৎসবের সামান্য প্রামাণিক সাক্ষ্য, যেমন, সিবেল গ্রিক ধর্মানুষ্ঠান, হিলারিয়ার রোমান উত্সব যা গ্রিকের সিবেল থেকে আসে, অথবা সিবেল এবং হিলারিয়া থেকে আসা খ্রিস্টান মাদারিং সানডে অনুষ্ঠান উদযাপন। কিন্তু, আধুনিক ছুটির দিন হল একটি আমেরিকান উদ্ভাবন যা সরাসরি সেই সব অনুষ্ঠান থেকে আসেনি।তা সত্ত্বেও, কিছু দেশসমূহে মা দিবস সেই সব পুরোনো ঐতিহ্যের সমার্থক হয়ে গেছে।

ছুটির দিনটি ক্রমে এত বেশি বাণিজ্যিক হয়ে পড়ে যে এটির স্রষ্টা আনা জার্ভিস এটিকে একটি হলমার্ক হলিডে অর্থাৎ যে দিনটির বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা অভিভূত করার মতো, সেই রকম একটি দিন হিসাবে বিবেচিত করেন। তিনি শেষে নিজেরই প্রবর্তিত ছুটির দিনটির নিজেই বিরোধিতা করা শুরু করেন। একটি গোষ্ঠীর মতে এই দিনটির সূত্রপাত প্রাচীন গ্রীসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে যেখানে গ্রিক দেবতাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট দেবী সিবেল-এর উদ্দেশ্যে পালন করা হত একটি উৎসব। এশিয়া মাইনরে মহাবিষ্ণুব -এর সময়ে এবং তারপর রোমে আইডিস অফ মার্চ (১৫ই মার্চ) থেকে ১৮ই মার্চের মধ্যে এই উৎসবটি পালিত হত। প্রাচীন রোমানদের ম্যাত্রোনালিয়া নামে দেবী জুনোর প্রতি উৎসর্গিত আরো একটি ছুটির দিন ছিল, যদিও সেদিন মায়েদের উপহার দেওয়া হত।

মাদারিং সানডের মতো ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বহু আচারানুষ্ঠান ছিল যেখানে মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে আলাদা করে রাখা হত। মাদারিং সানডের অনুষ্ঠান খ্রিস্টানদের অ্যাংগ্লিকানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পঞ্জিকার অঙ্গ। ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এটিকে বলা হয় লেতারে সানডে যা লেন্টের সময়ে চতুর্থ রবিবারে পালন করা হয় ভার্জিন মেরি বা কুমারী মাতার ও প্রধান গির্জার সম্মানে। প্রথানুযায়ী দিনটিকে সূচিত করা হত প্রতিকী উপহার দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রান্না আর ধোয়া-পোছার মত মেয়েদের কাজগুলো বাড়ির অন্য কেউ করার মাধ্যমে।

মা দিবস ছাড়াও বহু দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয় ৮ই মার্চ। জুলিয়া ওয়ার্ড হোই রচিত মাদার্স ডে প্রক্লামেশন বা মা দিবসের ঘোষণাপত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের গোড়ার দিকের প্রচেষ্টাগুলির মধ্যে অন্যতম। আমেরিকান গৃহযুদ্ধ ও ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধের নৃশংসতার বিরুদ্ধে ১৮৭০ সালে রচিত হোই-এর মা দিবসের ঘোষণাপত্রটি ছিল একটি শান্তিকামী প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক স্তরে সমাজকে গঠন করার ক্ষেত্রে নারীর একটি দায়িত্ব আছে, হোই-এর এই নারীবাদী বিশ্বাস ঘোষণাপত্রটির মধ্যে নিহিত ছিল।



মা আর সন্তান মধুর এক সম্পর্কের নাম; এটি চিরন্তন, এটি জীবন্ত। এ সত্য সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই চলে আসা এক বাস্তবতা। যা ভালোবাসা আর মমতার সর্বোচ্চ আধার৷ নিরাপদ আশ্রয় আর ভরসার স্থান। মা, তুমি তো মমতাময়ী, গর্ভধারিনী, জননী৷ মায়ের এ ভালোবাসাকে সম্মান জানাতে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে আন্তর্জাতিক মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনী। ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ওই দিনটিকে মা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি এ দিনকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্টের এ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পেছনে আছে মা দিসব নিয়ে মার্কিন এক পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষাকর্মীর দীর্ঘ ইতিহাসের গল্প। এ নারীর নাম আনা জার্ভিস।

১৯০৭ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মারা যান আনা জার্ভিসের মা অ্যান জার্ভিস। তার একবছর পর ১৯০৮ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার (১০ মে) সকালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফিটন শহরে অবস্থিত একটি চার্চ প্রথমবারের মতো দিনটি উদযাপন করলেন আনা। যেখানে তার মা এ্যান জার্ভিস রোববারে পড়াতেন। বিকেলে তার নিজের শহর ফিলাডেলফিয়ায় মাতৃ দিবস পালন করেন তিনি।

এরপর আমেরিকার প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের সরকারের কাছে তিনি দিবসটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করার অনুরোধ জানান। ১৯১২ সালেই আমেরিকার কিছু অঙ্গরাজ্যে দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা দেয়। আর ১৯১৪ সালে এসে উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মাতৃ দিবসের মর্যাদা দিয়ে সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ওইদিনটি সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। ১৯৬২ সালে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক দিবসের স্বীকৃতি পায়।

দিসবটিকে স্বীকৃতির জন্য নিজের মায়ের একটি কথাকে সবসময়েই স্মরণে রেখেছেন আনা। তার মা বলতেন, মানবতার জন্য তার বিভিন্ন কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ কেউ না কেউ কোন একদিন মা দিবসকে স্বীকৃতি দেবে। আর মা দিবসের অফিসিয়াল প্রতীক হিসেবে তার মায়ের পছন্দের ফুল সাদা কার্নেশানকেই (সুগন্ধি পুষ্পবিশেষ) বাছাই করেন তিনি। শিশুদের প্রতি আনা জার্ভিসের অনুরোধ, এদিন প্রত্যেকেই যেন মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করে কিংবা অন্তত মায়ের কাছে চিঠি লেখে।

আনার বয়স যখন ৪০, তখন কন্যার চোখে মায়ের মাতৃত্ব দেখেছেন অ্যান জার্ভিস। তখনই তিনি দিসবটি কীভাবে পালন করা যায়, তা নিয়ে ভেবেছেন। তার ভাবনায় এলো, সন্তানকেন্দ্রিক উদযাপন। মানে এদিন তাদের সন্তানদের কাছ থেকে ভালোবাসা পাবেন মায়েরা। এটা কোন মাতালের উদযাপন নয়; এটা একটা বাস্তব, সময়োপযোগী এবং সামাজিক জীবনে মায়েরা যে আমাদের কত বড় আশীর্বাদ, তারই স্বীকৃতি।

দিনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হলেও এটিকে একদমই নিজের উদ্ভাবন হিসেবে দাবি করেন আনা। মায়েদের প্রতি আমাদের অবজ্ঞাকে স্মরণ করিয়ে দিতেই দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য আন্দোলন করেছিলেন তিনি। কিন্তু মা দিবসের ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণে ক্ষুদ্ধও হয়েছেন আনা নিজেই।

অন্য আরেক ইতিহাস থেকে জানা যায় মা দিবসের’প্রচলন শুরু হয় প্রথম প্রাচীন গ্রীসে। সেখানে প্রতি বসন্তকালে একটি দিন দেবতাদের মা ‘রিয়া’; যিনি ক্রোনাসের সহধর্মিনী তার উদ্দেশ্য উদযাপন করা হতো। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় ‘মা দিবস’ পালিত হতো বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে। রোমানরা পালন করতেন ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে, তারা দিনটিকে উৎসর্গ করেছিলেন ‘জুনো’র প্রতি।

ষোল’শ শতাব্দী থেকে এই দিনটি যুক্তরাজ্যেও উদযাপন করা হয় মাদারিং সানডে হিসেবে। ইস্টার সানডের ঠিক তিন সপ্তাহ আগের রোববারে এটি পালন করেন তারা। নরওয়েতে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় রোববারে, সৌদি আরব, বাহরাইন, মিশর, লেবাননে বসন্তের প্রথম দিন অর্থ্যাৎ ২১শে মার্চে এই দিনটি উদযাপিত হয়। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে এই যে বনার্ঢ্য মাতৃ দিবস এর উদযাপন, এটি আসে মূলত আমেরিকানদের থেকে।

পশ্চিমের দেশগুলোতে মা বাবাদের তারা বৃদ্ধ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। কোন কোন বিশেষ দিনে তাদের কথা মনে পড়ে তাদের সম্মান দেখানোর জন্য। আর আজকের এইদিনে তাদের মায়ের কথা মনে পড়ে, আর মাডার ডে নামে আড়ম্বরের সহিত পালন করে।

সোমবার, ৫ মার্চ, ২০১৮

হোলি বা দোল উৎসব এর সঠিক ইতিহাস কি

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হোলির রীতি ও বিশ্বাস বিভিন্ন। বাংলা অঞ্চলে বৈষ্ণব প্রাধান্য রীতি প্রচলিত। রঙ উৎসবের আগের দিন হোলিকা দহন হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম, একে আমরা বলি ‘চাঁচর’।

এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন চাঁচর উদ্যাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদ্যাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদ্যাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।

হোলি বা দোল উৎসব এর সঠিক ইতিহাস কি

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও জৈমিনি মীমাংসা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক হোলিকোৎসব পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক রত্নাবলী তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুনীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হত।

মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়।শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্নুৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বহ্নুৎসব হোলিকাদহন বা মেড়াপোড়া নামে পরিচিত। উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়।

দোলযাত্রা উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব নামে পরিচিত। অতীতে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে বসন্তের আগমন উপলক্ষ্যে একটি ছোটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নাচগান, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয় করা হত। পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠানটি পরিব্যপ্ত হয়ে শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব বসন্তোৎসবের আকার নেয়। ফাল্গুনী পূর্ণিমা অর্থাৎ দোলপূর্ণিমার দিনই শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের আয়োজন করা হয়। পূর্বরাত্রে বৈতালিক হয়। দোলের দিন সকালে ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল গানটির মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক অভিনীত হয়।