নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা রেসিপি

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা কেবল একটি মিষ্টি নয়। এটি বাঙালির রন্ধন ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা শীতের আগমনী বার্তা বয়ে আনে। খেজুরের গুড়ের মনোমুগ্ধকর গন্ধ

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা কেবল একটি মিষ্টি নয়। এটি বাঙালির রন্ধন ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা শীতের আগমনী বার্তা বয়ে আনে। খেজুরের গুড়ের মনোমুগ্ধকর গন্ধ এবং ছানার নরম, মোলায়েম স্পর্শ এই মিষ্টিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

উৎপত্তি এবং ইতিহাস

কাঁচাগোল্লা নামটি থেকেই বোঝা যায় যে এই মিষ্টি তৈরিতে ছানাকে খুব বেশি জ্বাল দেওয়া হয় না বা পুরোপুরি রান্না করা হয় না—এটি অনেকটা 'কাঁচা' অবস্থায় থাকে। এই মিষ্টির উদ্ভাবন নিয়ে নানা মত থাকলেও, এটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শান্তিপুর বা রানাঘাটের ঐতিহ্যবাহী সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। শুরুতে এটি ছানার একটি সাধারণ প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু যখন এর সাথে শীতকালীন বিশেষ উপাদান 'নলেন গুড়' যুক্ত হলো, তখন এটি বাঙালির কাছে অমৃতের সমান হয়ে উঠলো। নলেন গুড় (নতুন গুড়) শুধুমাত্র শীতের মাসগুলিতেই পাওয়া যায়, যা এই মিষ্টিকে একটি মৌসুমী আকর্ষণ করে তোলে।

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা

নলেন গুড়ের মাহাত্ম্য

কাঁচাগোল্লার স্বাদ ও গন্ধের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে নলেন গুড়ের ব্যবহারে। নলেন গুড় হলো খেজুরের রস থেকে তৈরি এক বিশেষ ধরনের গুড়, যা সাধারণ আখের গুড়ের চেয়ে অনেক বেশি সুগন্ধি এবং স্বাদে অতুলনীয়। এই গুড়ের 'নলেন' বা নতুন গন্ধ মিষ্টিতে একটি প্রাকৃতিক ফ্লেভার যোগ করে যা কোনো কৃত্রিম এসেন্স দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। গুড়ের ক্যারামেলাইজড স্বাদ এবং ছানার সতেজ ভাব মিলেমিশে এক অসাধারণ ব্যালেন্স তৈরি করে।

প্রস্তুত প্রণালী: সরলতার মাঝে জটিলতা

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা তৈরি পদ্ধতি আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ মনে হলেও, এর আসল চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক উপাদানের অনুপাত এবং ছানার গুণমান বজায় রাখা।

উপাদান: প্রধানত দুটি উপাদান—টাটকা ছানা এবং নলেন গুড়।

বিশেষত্ব: এই মিষ্টিতে ছানা এবং গুড়ের মিশ্রণকে খুব বেশি আগুনে পাক করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই ছানা মেখে সরাসরি গুড় মিশিয়ে মিষ্টির আকার দেওয়া হয়। এই 'কাঁচা' পদ্ধতিই এর নরম এবং আর্দ্র ভাব বজায় রাখে। ছানা যত নরম আর মসৃণ হবে, মিষ্টি তত সুস্বাদু হবে।

সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং জনপ্রিয়তা

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর শীতকাল মানেই পিঠা-পুলি আর নলেন গুড়ের উৎসব। এই সময়ে যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব-পার্বণ বা অতিথি আপ্যায়নে নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা একটি অপরিহার্য পদ।

কলকাতার নামী মিষ্টির দোকান যেমন মিঠাই বা বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক তাদের নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লার জন্য বিখ্যাত। এই মিষ্টি কেবল দেশেই নয়, বিদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছেও শীতের নস্টালজিয়া হিসেবে সমাদৃত। প্রবাসীরা শীতকালে দেশে ফিরলে বা কেউ বিদেশ গেলে এই মিষ্টি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার আবদার থাকেই।

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা বাঙালির রন্ধন শিল্পের এক সূক্ষ্ম নিদর্শন। এটি প্রমাণ করে যে, সেরা স্বাদ পেতে সবসময় জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না, বরং সঠিক মৌসুমি উপাদান এবং ঐতিহ্যের ছোঁয়াই যথেষ্ট। এই মিষ্টি মুখে দিলেই যেন শীতের সকালের মিষ্টি রোদ আর খেজুর গাছে টাঙানো হাঁড়ির দৃশ্য ভেসে ওঠে। এটি কেবল রসনার তৃপ্তি নয়, এটি বাঙালির এক গভীর আবেগ এবং সংস্কৃতির ধারক।

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা তৈরি করার একটি সহজ রেসিপি নিচে দেওয়া হলো। এই মিষ্টির বিশেষত্ব হলো এতে গুড়ের মিষ্টি গন্ধ আর নরম ভাব।

প্রয়োজনীয় উপকরণ:

ছানা: ৫০০ গ্রাম (জল ঝরানো, বাড়িতে তৈরি হলে ভালো)

নলেন গুড় (পাটালি গুড়): ২৫০-৩০০ গ্রাম (মিষ্টির পরিমাণ অনুযায়ী)

এলাচ গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ (ঐচ্ছিক, সুন্দর গন্ধের জন্য)

কাজু বা পেস্তা কুচি: সাজানোর জন্য

প্রস্তুত প্রণালী:

১. ছানা তৈরি:

যদি বাড়িতে ছানা তৈরি করেন, তবে দুধ ফুটিয়ে তাতে ভিনিগার বা লেবুর রস মিশিয়ে ছানা কাটান। ছানা একটি পরিষ্কার কাপড়ে ছেঁকে জল ঝরিয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন ছানা যেন খুব শুকনো না হয়ে যায়, একটু আর্দ্র থাকা দরকার।

২. ছানা মাখা:

একটি বড় পাত্রে ছানা হাত দিয়ে ভালো করে মেখে নিন। ছানা মাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, এটি যত মসৃণ হবে মিষ্টি তত নরম হবে। ৫-৭ মিনিট ধরে ভালো করে মেখে একটি নরম মণ্ড তৈরি করুন।

৩. গুড় মেশানো:

ছানা মাখার পর তাতে নলেন গুড় (পাটালি গুড় হলে ছোট ছোট টুকরো করে নেবেন) মেশান। গুড়ের পরিমাণ আপনার স্বাদ অনুযায়ী কমানো বা বাড়ানো যেতে পারে। গুড় এবং ছানা একসাথে আরও কিছুক্ষণ মেখে নিন, যাতে গুড় ভালো করে মিশে যায়।

৪. গ্যাস বা মাইক্রোওয়েভে সামান্য গরম করা (মিষ্টির স্থায়িত্ব বাড়াতে):

এই মিশ্রণটি একটি নন-স্টিক প্যানে নিয়ে মাঝারি আঁচে ২-৩ মিনিট হালকা গরম করতে পারেন, যাতে গুড় পুরোপুরি গলে ছানার সাথে মিশে যায় এবং সামান্য আঠালো ভাব আসে। তবে ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লায় এটি কাঁচা (গরম না করেই) রাখা হয়। আপনি যদি কাঁচা রাখতে চান তবে এই ধাপটি বাদ দিন।

৫. মিষ্টি তৈরি:

এবার ছানা-গুড়ের মিশ্রণ থেকে অল্প অল্প অংশ হাতে নিয়ে গোল বা ডিম্বাকৃতির মিষ্টি গড়ে নিন।

৬. সাজানো:

প্রতিটি মিষ্টির উপরে একটি করে কাজু বা পেস্তা কুচি দিয়ে সাজাতে পারেন।

পরিবেশন:

নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা তৈরি! এটি একটি এয়ারটাইট পাত্রে ফ্রিজে রেখে কয়েকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। পরিবেশনের কিছুক্ষণ আগে ফ্রিজ থেকে বের করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনলে স্বাদ ভালো পাওয়া যায়।

Kalyan Panja is a photographer and a travel writer sharing stories and experiences through photographs and words since 20 years
NextGen Digital... Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...