Saturday, September 23, 2017

কফি হাউজের সেই আড্ডাটা

মান্না দে’র সেই সুবিখ্যাত গান কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই - কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালী বিকেলগুলো সেই - আজ আর নেই। ইন্ডিয়ান কফি হাউজ যার আদি নাম এ্যালবার্ট হল। এ্যালবার্ট হলেন রাণী ভিক্টেরিয়ার স্বামী। গত ৮ মার্চ কলকাতায় ইন্ডিয়ান কফি হাউজে ঢু মারি ঠিক রাত সোয়া আটটায়। টানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট কফি হাউজের আড্ডারুদের পর্যবেক্ষণ করি। দেওয়ালে বিশ্বকবির প্রতিকৃতি টাঙানো। উপরের ব্যালকুনি জুড়ে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা অবধি চলে কফি, স্যান্ডউইচ, কোল্ড কফি, চিকেন ফ্রাইড, টোস্ট, ডিমের অমলেট সহ সস্তাদরের সব নাস্তাখাবার।

৪ টাকা থেকে ৫২ টাকার মধ্যে সবকিছুরদাম। আড্ডাটা বিকেল থেকে জমজমাট হয়। কলকাতার বইপাড়া হলো কলেজস্ট্রিট। নামিদামি প্রকাশনী থেকে শুরু করে অনেক বইয়ের দোকান এখানে। কফি হাউস, ইন্ডিয়ান কফি হাউস বা এ্যালবার্ট হল উত্তর কলকাতার কলেজ স্ট্রিট চত্বরে অবস্থিত বাঙালির-আড্ডাস্থল, কলকাতার কফি হাউসগুলির মধ্যে সেন্ট্রাল এ্যাভিনিউ এবং কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজ- দুটিই প্রাচীনতম।

Indian Coffee House kolkata images

ইন্ডিয়ান কফি বোর্ডের উদ্যোগে বাঙালি কফি সেবীদের জন্য সেন্ট্রাল এ্যাভিনিউর কফি হাউজ খোলা হয় ১৯৪১-৪২ সাল নাগাদ আর তার কিছুদিন পরেই ১৯৪৫ সালে চালু হয় কলেজ স্ট্রিটের কফি-হাউজটি। পরে ১৯৫৭-৫৮ সাল নাগাদ কফি-হাউজ (অ্যালবার্ট হল) ইন্ডিয়ান কফি বোর্ডের আওতা থেকে বেরিয়ে এসে শ্রমিক সমব্যয়ের আওতায় আসে।

দুটি কফি-হাউজই ছিল এককালের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রধান আড্ডাস্থল। নিকটতম বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রছাত্রীদের ভিড় করা ছাড়াও নামিদামী বুদ্ধিজীবী-লেখক, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা, চিত্রপরিচালক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিদেশি পর্যটকদের আড্ডা দেওয়ার অবারিত জায়গা হিসাবে এটি খ্যাত ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুরোনো বইয়ের বাজার ও নতুন বইয়ের বাজার সামনে আছে বলে হাউসটিতে সব সময়ই ভিড় থাকে।

চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়, লেখক শক্তি চট্টোপাধায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, জয় গোস্বামীদের মতো কবিরা, বাঙালি অভিনেতা রূদপ্রসাদ সেনগুপ্তর মত প্রমুখ ব্যক্তিরাও এই কফি হাউসটিতে আড্ডা দিয়ে গেছেন। কফি হাউসটি কলেজ স্ট্রিটের মর্মস্থলে অবস্থিত যেখানে প্রখ্যাত সব বুদ্ধিজীবিরা ঘন্টার পর ঘন্টা এক কাপ কফি নিয়ে আড্ডা জমান। পূর্বে অ্যালবার্ট হল নামে পরিচিত এই হলঘর বহু ঐতিহাসিক সভা বা জমায়তেরও সাী। কফি হাউজের নীচতলায় ৪২ খানা টেবিল ও ২১ খানা বৈদ্যুতিক পাখা ঝুলছে।



বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব

উত্তর কলকাতার বাগবাজার সার্বজনীনের দুর্গা প্রতিমা একেবারেই সাবেকি। একচালায় ডাকের সাজে মায়ের অপরূপ প্রতিমা এখানে দেখতে পাবেন। বাগবাজারে দুর্গাপূজা সার্বজনীন অভিহিত হয় ১৯২৬ সালে। এই পূজা আগে ছিল বারোয়ারি। এই পূজার উদ্যোক্তা ছিলেন—রামকালী মুখার্জি, দীনেন চ্যাটার্জি, নীলমণি ঘোষ, বটুকবিহারী চ্যাটার্জি প্রমুখ। সঠিক অর্থে এই পূজাই কলকাতা তথা তত্কালীন ভারতবর্ষের প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপূজা।

Bagbazar Sarbojanin durga puja

সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার সার্বজনীন দুর্গোৎসব

সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেই ১৯৩৬ সালে শিয়ালদহ অঞ্চলের সার্পেন্টাইন লেনে চ্যাটার্জীদের একচিলতে জমিতে জন্ম। সার্পেন্টাইন লেনের একচিলতে জমিতে জায়গা না হওয়াতে স্বাধীনতার সমসাময়িক কালে এই পূজা উঠে আসে অতীতের সেণ্ট জেমস্ স্কোয়ার অধূনা সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে অর্থাৎ লেবুতলা পার্কে। এই পুজোও বিবর্তনের হাত থেকে বাদ যায়নি। রমেশ পাল হিমালয়-কন্যা রূপে মা দুর্গাকে তৈরী করে সারা ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।



১৯৯৫ সালে মণ্ডপ ছিল লোটাস টেম্পল-এর আদলে। ১৯৯৬ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের জন্ম শতবর্ষে নেতাজীকে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে ইতিহাস ঘেটে তাঁর ব্যবহৃত কামাতামারু জাহাজের আদলে পূজা মণ্ডপ তৈরী করে বিশ্বের মণ্ডপ সজ্জার ইতিহাসে শুরু হল আলোড়ন।

মহম্মদ আলি পার্ক দূর্গা পুজো

মধ্য কলকাতার অন্যতম সেরা দূর্গা পুজো বলতে মনের কোণে উঁকি দেয় মহম্মদ আলি পার্কের দুর্গা পুজো। শহরের যে কোনও প্রান্ত থেকে এক বাসে বা মেট্রোয় সেন্ট্রাল এভিনিউ। সেখান থেকে কয়েক পা হাঁটলেই মহম্মদ আলি পার্ক। মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্ক সর্বজনীন শহরের আর একটি বড়ো পুজো। এদের থিম-ভাবনা একটু আলাদা রকমের–কিছুটা যেন থিম আর সাবেকিয়ানার মেলবন্ধনের প্রয়াস।






একডালিয়া এভারগ্রিন দূর্গা পুজো

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত বিখ্যাত দূর্গা পুজো একডালিয়া এভারগ্রিন। ১৯৪৩ থেকে গড়িয়াহাটে এই ক্লাবের পুজো হয়ে আসছে। সিংহি পার্কের পুজোই মূলত একডালিয়া এভারগ্রিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিবছরই দেশের কোনও না কোনও বিখ্যাত মন্দিরের আদলে প্যান্ডেল তৈরি করেন একডালিয়া এভারগ্রিনের উদ্যোক্তারা। শুধু প্যান্ডেল নয়, সেইসঙ্গে একডালিয়া এভারগ্রিনের অন্যতম আকর্ষণ ঝাড়বাতি। মণ্ডপ প্রাঙ্গনে বিশালাকারের ঝাড়বাতি লাগানো হয়।

শুধু জাঁকের বহরেই একডালিয়া কলকাতার প্যান্ডেল হপারদের আবশ্যিক ডেস্টিনেশন হয়ে উঠেছে। নয়ের দশক থেকে শহরে থিম পুজোর আগ্রাসন শুরু হলেও উত্তরের বাগবাজার, সিমলা ব্যায়াম সমিতি বা মধ্য কলকাতার কলেজ স্কোয়ারের মতোই একডালিয়াকে তা স্পর্শ করতে পারেনি। তবে, বাকিদের মতো সাবেকিয়ানা আঁকড়ে থাকলেও প্রতিমা, মণ্ডপ থেকে আলোকসজ্জায় স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে একডালিয়া।



কলকাতার সর্বজনীন পুজোর নিরিখে উত্তর কলকাতাই ছিল পথিকৃত। শহরের বেড়ে ওঠার আর্থ-সামজিক ইতিহাসের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বাগবাজার থেকে সিমলা ব্যায়াম সমিতির মতো পুজো কলকাতার বারোয়ারি পুজোর সংজ্ঞা নিরূপণ করেছিল। যদিও প্রায় একই সময়ে সংলগ্ন এলকায় আরও অনেক সর্বজনীন পুজোর সূচনা হয়। পরে সেই রেশ গিয়ে পড়ে দক্ষিণে। এতশত বারোয়ারি পুজোর ভিড়ে এখনও শতায়ু পুজো হাতে গোনা। তবে উত্তরে নয়ের কোঠায় পা রাখা পুজো খুঁজে পাওয়া যায়। নানা ঝড়-ঝাপটা সামলে তারা আজও টিকে আছে সসম্মানে।

উত্তরের থেকে ভিড় দক্ষিণে টেনে আনার ক্ষেত্রে মাইলস্টোন অবশ্যই একডালিয়া। সেই আকর্ষণের নিরিখে সাতের দশকের শুরুতে দক্ষিণ কলকাতার পুজো বলতে লোকে একডালিয়াকেই বুঝত। পাশের বালিগঞ্জ কালচারাল, সমাজসেবী, সংঘশ্রী, আদি বালিগঞ্জ, মুদিয়ালি, কলকাতার বারোয়ারি পুজোর ইতিহাসে দক্ষিণের প্রতিনিধিত্বকারী হলেও একমাত্র একডালিয়া বাকিদের পিছনে ফেলে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। পরে নয়ের দশকের শেষ পর্ব থেকে সুরুচি, শিবমন্দির, কসবা শীতলামন্দির, বাদামতলা বারোয়ারির ময়দানে নামলেও তাঁর একডালিয়া কাউকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে না।

কলেজ স্কোয়ার সর্বজনীন দুর্গোৎসব

মধ্য কলকাতার কলেজ স্কোয়ার সর্বজনীনের দুর্গা পুজো কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত পুজোগুলির অন্যতম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কলেজ স্কোয়ারে আয়োজিত এই পুজোটির সঙ্গে থিমের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সুবিশাল মণ্ডপ ও সুসজ্জিতা মাতৃপ্রতিমা প্রতিবছরই এখানকার প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকে। কলেজ স্কোয়ারের পুজোর উদ্দীপনাই আলাদা। অন্যান্য বারের মতো এবারেও কলেজ স্কোয়ারের মাতৃ মূর্তি সাধারণ অথচ অপরূপ। এখানে দেবীর অঙ্গসজ্জা হয় পূজাকমিটির নিজস্ব সোনার অলংকারে। মণ্ডপের মধ্যে একটি সুবিশাল বেলোয়াড়ি ঝাড়ও দেখার মতো।



আধুনিক হয়েও সনাতন ঐতিহ্য, সাবেকিয়ানা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত কলেজ স্কোয়ার সর্বজনীন। আড়ম্বরের আতিশয্য নেই, নেই থিম-বিষয় ভাবনার চাকচিক্য, তবু আজকের পৃথিবীর রুক্ষ মাটিতে চূড়ান্ত বাস্তব। কিন্তু এই থিমের লড়াইয়ের মধ্যে পড়েও সনাতনী ঐতিহ্য, সাবেকিয়ানা থেকে এতটুকু সরে আসেনি কলেজ স্কোয়ার সর্বজনীন। পোশাকি নাম বিদ্যাসাগর উদ্যান। কিন্তু খ্যাতি কলেজ স্কোয়ার নামেই। মধ্য কলকাতার সবথেকে বিখ্যাত পুজোগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এই পুজো।

কোনওদিনই থিমের মোহজাল ছিল না, আজও নেই। তবে চিরকালই সমাজ সচেতনতার একটা বার্তা দিয়ে এসেছে এই পুজো কমিটি। আর প্রতিমাসজ্জায় যথারীতি সাবেকিয়ানা। পুরাতনী সুসজ্জিতা মাতৃপ্রতিমাই যে বরাবরের প্রধান আকর্ষণ এই পুজোর। এখানে দেবীর অঙ্গসজ্জা হয় পুজোকমিটির নিজস্ব অলঙ্কারে। আর আলোকসজ্জা তো থাকবেই।

Monday, September 18, 2017

মহালয়া - মন্ত্র, গান, পাঠ

আজ শুভ মহালয়া । আজকের এই দিনে দেবীপক্ষের সূচনার মধ্য দিয়ে জগতের সকল অসুর ও আসুরীক শক্তি নিধধের জন্য সর্বশক্তির অধীকারি জগৎজননী মহামায়া শ্রী শ্রী দূর্গা মায়ের আহবানের মধ্য দিয়ে মাকে জাগ্রত করা হয় । মা মহামায়া দূর্গা এই পৃথিবী জগতে মহালয়ার দিনে ১০ দিনের জন্য এসে, জগতের সকল অশুভ শক্তি ধংস করে, জগৎকে তার মায়াই আবদ্ধ করে আবার দশমিতে চলে যায় । তাই জাগ্রতিক কল্যানের জন্য আসুন আমরা সবাই শ্রী শ্রী মহামায়া দূর্গার আহবান করি এবং তাকে পূনরায় জাগ্রত করি ।

আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জিত ধরনীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত । জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা, আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি, অসীম ছন্দে বেজেউঠে, রূপলোক ও রসলোকে আনে নবভাবনা ধূলির সঞ্জীবন, তাই আনন্দিতা শ্যামলী মাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন । সাথে সাথে শেষ হবে পিতৃপক্ষ ও সূচনা হবে দেবীপক্ষের ।



মহালয়া উপলক্ষেশুনতে পাবেন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে সেই সুমধুর মহালয়া । শরতে আজ কোন্‌ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে । আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে ।। নীল আকাশের নীরব কথা শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা বেজে উঠুক আজি তোমার বীণার তারে তারে ।। শস্যক্ষেতের সোনার গানে যোগ দে রে আজ সমান তানে, ভাসিয়ে দে সুর ভরা নদীর অমল জলধারে । যে এসেছে তাহার মুখে দেখ্‌ রে চেয়ে গভীর সুখে, দুয়ার খুলে তাহার সাথে বাহির হয়ে যা রে ।।

জয় মা দূর্গা। সবাইকে শুভ মহালয়ার শুবেচ্ছা ও অভিনন্দন ।

Saturday, September 16, 2017

বিশ্বকর্মা পূজা - মন্ত্র, পদ্ধতি

বিশ্বকর্মা পুজো মানেই ঘুড়ি লাটাই আর দুপুরে জমিয়ে খাসির মাংস খাওয়া-দাওয়া । হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে বিশ্বকর্মা ছিলেন দেবশিল্পী। বিষ্ণুপুরাণের মতে প্রভাসের ঔরসে বৃহস্পতির ভগিনীর গর্ভে বিশ্বকর্মার জন্ম হয় । বেদে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বকর্মা বলা হয়েছে। বিশ্বকর্মা মূলত সৃষ্টিশক্তির রূপক নাম । সেই অর্থে ইনি পিতা, সর্বজ্ঞ দেবতাদের নামদাতা । বিশ্বকর্মা সর্বমেধ-যজ্ঞে নিজেকে নিজের কাছে বলি দেন। বিশ্বকর্মা বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা, বিধাতা ।

ঋগবেদের মতে ইনি সর্বদর্শী ভগবান। এঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পা সর্বদিক বিদ্যমান। বাহু ও পায়ের সাহায্যে ইনি স্বর্গ ও মর্ত্য নির্মাণ করেন । বিশ্বকর্মা শিল্পসমূহের প্রকাশক ও অলঙ্কারের স্রষ্টা,দেবতাদের বিমান-নির্মাতা । এঁর কৃপায় মানুষ শিল্পপকলায় পারদর্শিতা লাভ করে। ইনি উপবেদ, স্থাপত্য-বেদের প্রকাশক এবং চতুঃষষ্টি কলার অধিষ্ঠাতা । ইনি প্রাসাদ, ভবন ইত্যাদির শিল্পী ।

ইনি দেবতাদের জন্য অস্ত্র তৈরি করেন । মহাভারতের মতে– ইনি শিল্পের শ্রেষ্ঠ কর্তা, সহস্র শিল্পের আবিস্কারক, সর্বপ্রকার কারুকার্য-নির্মাতা । স্বর্গ ও লঙ্কাপুরী ইনিই নির্মাণ করেছিলেন । রামের জন্য সেতুবন্ধ নির্মাণকালে ইনি নলবানরকে সৃষ্টি করেন । কোনো কোনো পুরাণ মতে, বিশ্বকর্মা বৈদিক ত্বষ্টা দেবতার কর্মশক্তিও আত্মসাৎ করেছিলেন। এই জন্য তিনি ত্বষ্টা নামেও অভিহিত হন । বিশ্বকর্মার কন্যার নাম ছিল সংজ্ঞা। ইনি এঁর সাথে সুর্যের বিবাহ দেন ।

সংজ্ঞা সুর্যের প্রখর তাপ সহ্য করতে না পারায়, ইনি সুর্যকে শানচক্রে স্থাপন করে তাঁর উজ্জলতার অষ্টমাংশ কেটে ফেলেন । এই কর্তিত অংশ পৃথিবীর উপর পতিত হলে, উক্ত অংশের দ্বারা বিশ্বকর্মা বিষ্ণুর সুদর্শনচক্র, শিবের ত্রিশূল, কুবেরের অস্ত্র, কার্তিকেয়ের শক্তি ও অন্যান্য দেবতাদের অস্ত্রশস্ত্রাদি নির্মাণ করেন ।
বলা হয়ে থাকে, শ্রীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ জগন্নাথমূর্তি বিশ্বকর্মা প্রস্তুত করেন ।

বাঙালী হিন্দু গণ যে বিশ্বকর্মার মূর্তি পূজো করেন তিনি চতুর্ভুজা । এক হাতে দাঁড়িপাল্লা, অন্য হাতে হাতুরী, ছেনী, কুঠার থাকে । অবশ্যই এগুলি শিল্পের প্রয়োজনীয় জিনিষ, তাই শিল্প দেবতা বিশ্বকর্মা এগুলি ধারন করে থাকেন । দাঁড়িপাল্লার একটি কারন আছে ।

আমরা যদি দাঁড়িপাল্লা কে ভালো মতো লক্ষ্য করি দেখি সুপাশে সমান ওজনের পাল্লা থাকে। ওপরের মাথার সূচক যখন সমান ভাবে ঊর্ধ্ব মুখী হয়- তখন বুঝি মাপ সমান হয়েছে । এভাবে একটি পাল্লায় বাটখারা রেখে অপর টিতে দ্রব্য রেখে পরিমাপ হয় । এর তত্ত্ব কথা আছে । আমাদের জীবনের কাটাতি আত্মিক বিন্দুতে স্থির রাখতে হবে । দুই পাল্লার একদিকে থাকবে জ্ঞান আর কর্ম।

জ্ঞানের দিকে বেশী ঝুকে পড়লে কর্ম কে অবহেলা করা হবে পরিণামে আসবে দুঃখ, অভাব। আর কাটাতি কর্মের দিকে বেশী ঝুকে পড়লে তবে আসবে আধ্যাত্মিক অকল্যাণ । তাই কাটাতি দুয়ের মাঝে সমন্বয় করে রাখতে হবে । কোন দিকেই না যেনো বেশী ঝুকে পড়ে। এই নিয়ম না মেনে চললে বিশ্বপ্রেম, বিশ্ব ভাতৃত্ব সচেতনতা কোন টাই সম্ভব না।

Viswakarma Puja

বিশ্বকর্মার মূর্তি যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখি তাঁর বাহন হস্তী । কলকাতার কর্মকার সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট নেতা শিক্ষা ব্রতী স্বর্গত হরষিত কেশরী রায় প্রথম বিশ্বকর্মার হস্তী বাহন বিগ্রহের পূজা করেন । হাতী কেন বাহন? পুরানের প্রনাম মন্ত্রে বিশ্বকর্মা কে মহাবীর বলে বর্ণনা করা হয়েছে । হাতীর কত টা শক্তি তার আন্দাজ করতে পারি। নিমিষে গাছ পালা মাথা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেয় ।

কারোর ওপর চরণ ভার দিলে তার মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মৃত্যু আর অস্থি সকল চূর্ণ চূর্ণ হবে । এমন প্রবাদ আছে, হাতী নাকি একটু বড় পাথর শুঁড়ে তুলে ছুঁড়ে মারতে পারে । প্রাচীন কালে রাজারা যুদ্ধে হস্তী বাহিনীর প্রবল ভাবে ব্যবহার করতেন । তাই এই মহা শক্তিমান প্রানী এই দিক থেকে মহা যোদ্ধা বিশ্বকর্মার বাহন হবার যোগ্যতা রাখে ।

হস্তীর হাত নেই । তবে একটি ‘কর’ বা ‘শুন্ড’ আছে । কর আছে বলেই হাতীর এক নাম ‘করী’ । ‘কৃ’ ধাতু থেকেই ‘কর’ শব্দটির উৎপত্তি। সে এই শুন্ডের সাহায্যেই গাছের ডাল টানে, জল খায়, স্নান করে । আবার দেখি শিল্পের মাধ্যমেই কর্ম সংস্থান । তাই বিশ্বকর্মা কর্মের দেবতা । এই শূন্ড দ্বারা কর্ম করা – এই দিক থেকে হস্তী একভাবে বিশ্বকর্মার বাহন হিসাবে মানানসই ।

হস্তীকে দিয়ে অনেক কাজ করানো হয় । বন দপ্তর হস্তীকে দিয়ে কাঠ সরানোতে কাজে লাগায় । মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি, কান্ড মাহুতের নির্দেশে হাতী এক স্থান থেকে আর এক স্থানে নিয়ে যায়, আবার কখনো সে গাছের ডাল বয়ে নিয়ে যায় মাহুতের নির্দেশে । আবার বন্য হাতীদের তাড়াতে বন দপ্তর পোষা হাতী গুলিকে কাজে লাগায়। হাতীর জীবন টাই এই রকম কাজের। নিজের খাদ্য আরোহণ থেকে, মাল বওয়া সব সময় কাজ ।

আর শিল্পের সাথে কর্মের সংস্থান জল আর ঠান্ডার মতো। জলে যেমন ঠান্ডা ভাব থাকে তেমনই কর্মের মাধ্যমেই শিল্পের বিকাশ। তাই বিশ্বকর্মা হলেন কর্মেরও দেবতা । এই দিকে থেকে শ্রমিক হাতী বিশ্বকর্মার বাহন হিসাবে একেবারে মানানসই ।

Friday, September 15, 2017

ইঞ্জিনিয়ার দের কাজ কী

ইঞ্জিনিয়ার দের কাজ কী?? এরা আসলে কি করে, কেনই বা এদেরকে উচ্চবেতনে চাকরি দেয় শিল্পমালিক রা। অনেকেই ইঞ্জিনিয়ার নাম শুনলেই নাক সিটকান,
বলেন এইটা কোন ইঞ্জিনিয়ারিং হইল, আবার কিসের ইঞ্জিনিয়ারিং? শতকরা ৮০ভাগ লোকই জানেন না যে ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরি মানে ইঞ্জিনিয়ারিং না। এটি সম্পূর্ন ম্যানুফ্যাকচারিং বেসড একটি প্রসেস যেখানে একজন ইঞ্জিনিয়ার কে মেশিন সেটাপ থেকে শুরু করে প্রসেস কন্ট্রোল, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, গিয়ার মেকানিসম এবং মেইন্টেনেন্স নিয়ে কাজ করতে হয়।

স্পিনিং এর ইঞ্জিনিয়ার দের প্রোগ্রাম ইনপুট দেয়া জানতে হয়। ওয়েট প্রসেসিং ইঞ্জিনিয়ার দের প্রথম সারির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে হয়। নাসার বিজ্ঞানিরা যারা দীর্ঘদিন যাবত মহাকাশে মানুষ পাঠাতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ার দের গবেষনায় নিযুক্ত করে স্পেস স্যুট এবং ন্যানোফাইবার, কার্বন ফাইবারের শিল্ড তৈরীর জন্য।



অতি সম্প্রতি বুয়েট নন-ওভেন জূট টেকনোলজী কে জিও টেক্সটাইল হিসেবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাজে ব্যবহার শুরু করেছে, আগামিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়মিত বিষয় হিসেবে যখন জিও-টেক্সটাইল পড়ানো হবে তখন এই কোর্সের জন্য ইঞ্জিনিয়ার দেরকেই শিক্ষক হিসেবে পাবে তারা। সত্যি বলতে কী ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টের সাথে সব চেয়ে বেশি মিল রয়েছে আইপিই ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাথে।

যাই হোক, পেশা হিসেবে অনেকের অ্যালার্জি থাকলেও একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ডিং শুরু করেছে। এই হল বস্ত্র প্রকৌশল বিষয়ে সারসংক্ষেপ। যারা এই ব্যাতিক্রমধর্মী কিন্তু অত্যন্ত সম্মানিত এই বিষয়ে পড়তে চাও তাদের জন্য আশা করি কিছুটা হলেও ধারনা দিতে পারবে এই লেখাটি।

Tuesday, September 12, 2017

স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা

আজ ১১ সেপ্টেম্বর।১৮৯৩ সালের আজকের দিনে এক অখ্যাত ভারতীয় সন্যাস্যী যুক্তরাষ্ট্রএর শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা প্রথম বারের মত ভারতের বেদান্ত ধর্মের সাথে পরিচিত করান বিশ্বমঞ্চের অন্যান্য জাতি ও মতবাদের সাথে আর বৈদিক দর্শনের বিজয় পতাকা উড়ান বিশ্ব সভায়।

১৮৯৩, ১১ই সেপ্টেম্বর চিকাগো ধর্ম-মহাসভার প্রথম দিবসের অধিবেশনে সভাপতি কার্তিন্যল গিবন্‍স্ শ্রোতূমণ্ডলীর নিকট পরিচয় করাইয়া দিলে অভ্যর্থনার উত্তরে স্বামীজী বলেনঃ হে আমেরিকাবাসী ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ, আজ আপনারা আমাদিগকে যে আন্তরিক ও সাদর অভ্যর্থনা করিয়াছেন, তাহার উত্তর দিবার জন্য উঠিতে গিয়া আমর হৃদয় অনিবর্চনীয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে।

পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসি-সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি। সর্বধর্মের যিনি প্রসূতি-স্বরূপ, তাঁহার নামে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্গত কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর হইয়া আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিতেছি।

এই সভামঞ্চে সেই কয়েকজন বক্তাকেও আমি ধন্যবাদ জানাই, যাঁহারা প্রাচ্যদেশীয় প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিলেন যে, অতি দূরদেশবাসী জাতিসমূহের মধ্য হইতে যাঁহারা এখানে সমাগত হইয়াছেন, তাঁহারাও বিভিন্ন দেশে পরধর্মসহিষ্ণুতার ভাব প্রচারের গৌরব দাবি করিতে পারেন। যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি।

আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করিনা, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভষায় ইংরেজী ‘এক্সক্লুশন’ (ভবার্থঃ বহিষ্হকরণ, পরিবর্জন) শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, অমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া গর্ব অনুভব করি। যে জাতি পৃথিবীর সকল ধর্মের ও সকল জাতির নিপীড়িত ও আশ্রয়প্রার্থী জনগণকে চিরকাল আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি সেই জাতির অর্ন্তভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি।

আমি আপনাদের এ-কথা বলিতে গর্ব অনুভব করিতেছি যে, আমরাই ইহুদীদের খাঁটি বংশধরগণের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাখিয়াছি; যে বৎসর রোমানদের ভয়ংঙ্কর উৎপীড়নে তাহদের পবিত্র মন্দির বিধ্বস্ত হয়, সেই বৎসরই তাহারা দক্ষিণভারতে আমাদের মধ্যে আশ্রয়লাভের জন্য আসিয়াছিল। জরথুষ্ট্রের অনুগামী মহান্ পারসীক জাতির অবশিষ্টাংশকে যে ধর্মাবলম্বিগণ আশ্রয় দান করিয়াছিল এবং আজ পর্যন্ত যাহারা তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করিতেছে, আমি তাঁহাদেরই অন্তর্ভুক্ত।



কোটি কোটি নরনারী যে-স্তোত্রটি প্রতিদিন পাঠ করেন, যে স্তবটি আমি শৈশব হইতে আবৃত্তি করিয়া আসিতেছি, তাহারই কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করিয়া আমি আপনাদের নিকট বলিতেছিঃ ‘রুচীনাং বৈচিত্র্যাদৃজুকুটিলনানাপথজুষাং। নৃণামেকো গম্যস্ত্বমসি পয়সামর্ণব ইব।।‘–বিভিন্ন নদীর উৎস বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু তাহারা সকলে যেমন এক সমুদ্রে তাহাদের জলরাশি ঢালিয়া মিলাইয়া দেয়, তেমনি হে ভগবান্, নিজ নিজ রুচির বৈচিত্র্যবশতঃ সরল ও কুটিল নানা পথে যাহারা চলিয়াছে, তুমিই তাহাদের সকলের একমাত্র লক্ষ্য।

পৃথিবীতে এযাবৎ অনুষ্ঠিত সন্মেলনগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাসন্মেলন এই ধর্ম-মহাসভা গীতা-প্রচারিত সেই অপূর্ব মতেরেই সত্যতা প্রতিপন্ন করিতেছি, সেই বাণীই ঘোষণা করিতেছিঃ ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।'–যে যে-ভাব আশ্রয় করিয়া আসুক না কেন, আমি তাহাকে সেই ভাবেই অনুগ্রহ করিয়া থাকি। হে অর্জুন মনুষ্যগণ সর্বতোভাবে আমার পথেই চলিয়া থাকে।

সাম্পদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বরাবার ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে। এই-সকল ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানবসমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত।

তবে ইহাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত; এবং আমি সর্বতোভাবে আশা করি, এই ধর্ম-মহাসমিতির সন্মানার্থ আজ যে ঘন্টাধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে, তাহাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লিখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।

Monday, September 4, 2017

শিক্ষক দিবস

শিক্ষক দিবস বা গুরু পূর্নিমা সাধারণত হিন্দু এবং বৌদ্ধরা পালন করে থাকে। গুরু শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘গু’ যার অর্থ অন্ধকার এবং ‘রু’ যার অর্থ যিনি অন্ধকার দূর করেন।গুরু হচ্ছেন তিনি যিনি আমাদের মধ্যে থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করেন। আষাঢ় মাসের পূর্নিমা তিথিতে এই অনুষ্ঠান পালিত হয়। এইদিনে ভক্তরা পুজার্চনার মাধ্যমে গুরুকে সম্মান প্রদর্শন করেন। বৌদ্ধরা ভগবান বুদ্ধের সম্মানে এই দিনটি পালন করেন, কারন এই দিনে তিনি প্রথম ধর্ম-উপদেশ দিয়েছিলেন। হিন্দুরা এইদিনটি পালন করেন মহান ঋষি বেদব্যাস কে স্মরণ করে। বেদব্যাস শুধু জন্মগ্রহন করেন নি, এইদিনে তিনি ‘ব্রহ্ম সুত্র’ লেখা শেষ করেন। এটাকে ব্যাস পূর্নিমাও বলা হয়। এইদিনে হিন্দুরা তাদের শিক্ষকদের সম্মান প্রদর্শন করেন। হিন্দু যোগী এবং তপস্বীরা তাঁদের গুরুর পূজা করেন।

Teachers Day wallpaper images

Saturday, August 26, 2017

মাদার তেরেসার বাণী, উক্তি ও ছবি

মাদার তেরেসা বিখ্যাত উক্তি সমূহ

১। ছোট বিষয়ে বিশ্বস্ত হও কারন এর উপরেই তোমার শক্তি নির্ভর করে।

২। আমি ঈশ্বরের হাতের একটি ছোট পেন্সিল যা দ্বারা ঈশ্বর পৃথিবীতে ভালোবাসার চিঠি লিকছেন।

৩। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি। প্রভু, আমাদের যোগ্য করো, যেন আমরা সারা পৃথিবীতে যেসব মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে ক্ষুধার মধ্যে জীবন যাপন করেন, মৃত্যুমুখে পতিত হন, তাদের সেবা করতে পারি।

৪। কেবল সেবা নয়, মানুষকে দাও তোমার হৃদয়। হৃদয়হীন সেবা নয়, তারা চায় তোমার অন্তরের স্পর্শ।

৫। আনন্দই প্রার্থনা, আনন্দই শক্তি, আনন্দই ভালোবাসা।

৬। হৃদয়কে স্পর্শ করতে চায় নীরবতা। কলরবের আড়ালে নীরবেই পৌঁছাতে হয় আর্তের কাছে।

৭। তুমি যখন কারো সঙ্গে দেখা করো তখন হাসিমুখ নিয়েই তার সামনে যাও। কেননা হাস্যোজ্জ্বল মুখ হলো ভালোবাসার শুরু।

৮। আমার শরীরজুড়ে প্রবাহিত আলবেনিয়ান রক্ত, নাগরিকত্বে একজন ভারতীয় আর ধর্মীয় পরিচয়ে আমি একজন ক্যাথলিক নান। তবে নিজের অন্তর্নিহিত অনুভূতি দিয়ে আমি অবগাহন করি বিশ্বময় এবং মনে-প্রাণে আমার অবস্থান যিশুর হৃদয়ে।

৯। ভালবাসার কথাগুলো হয়তো খুব সংক্ষিপ্ত ও সহজ হতে পারে কিন্তু এর প্রতিধ্বনী কখনো শেষ হয় না।

১০। তুমি যদি মানুষকে বিচার করতে যাও তাহলে ভালোবাসার সময় পাবে না।

১১। শান্তির জন্য কাজ করলে তাতেই যুদ্ধ কমে যায়। কিন্তু রাজনীতির মধ্যে আমি যাব না। রাজনীতি থেকেই যুদ্ধের উদ্ভব হয়। সেজন্য রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে আমি চাই না। রাজনীতির মধ্যে যদি আমি বাঁধা পড়ে যাই, তাহলে আর ভালোবাসতে পারব না। কেননা, তখন সকলের পক্ষে আর নয়, আমাকে দাঁড়াতে হবে একজনের পক্ষে।

১২। ঈশ্বর পৃথিবীকে ভালোবাসেন এবং তিনি আপনাকে, আমাকে পাঠিয়েছেন তার ভালোবাসা এবং সহায়তা দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

১৩। তুমি কী করলে তার চাইতে তুমি কতটা ভালোবাসা দিয়ে করলে তা-ই মুখ্য।

১৪। তুমি দৃশ্যমান মানুষকে ভালোবাসতে না পারো তবে অদৃশ্য ঈশ্বরকে কি করে ভালোবাসবে?

১৫। আমাদের মধ্যে সবাই সব বড় কাজগুলো করতে পারে না, কিন্তু আমরা অনেক ছোট ছোট কাজ করতে পারি আমাদের ভালোবাসা দিয়ে।

১৬। নেতার জন্য বসে থেকো না, একাই ব্যাক্তি থেকে ব্যাক্তি শুরু করে দেও।

১৭। সত্যিকারের ভালোবাসার অর্থ হলো যতক্ষন তা কষ্ট না দেয় ততক্ষন দেওয়া।

১৮। তুমি যদি শতশত লোকের খুধা মিটাতে না পারো তাহলে শুধুমাত্র একজনকে খাওয়াও।

১৯। শান্তির শুরুই হয় হাসির মাধ্যমে।

২০। গতকাল চলে গেছে, আগামিকাল এখনো আসেনি, আমাদের জন্য আছে আজকের দিন, এখনই শুরু করা যাক।

২১। কিছু লোক তোমার জীবনে আশির্বাদ হয়ে আসে, কিছু লোক আসে শিক্ষা হয়ে।

২২। আশা করো না যে তোমার বন্ধু নির্ভুল ব্যাক্তি হবে বরং তোমার বন্ধুকে নির্ভুল হতে সহায়তা করো এটাই প্রকৃত বন্ধুত্ব।

২৩। ঈশ্বর আমাদের সফলতা চায় না, তিনি চান আমরা যেন চেষ্টা করি।

Mother Teresa wallpaper

Friday, August 25, 2017

গণেশ চতুর্থী - নিয়ম, মন্ত্র, ছবি, পদ্ধতি

আজ, হিন্দু পৌরাণিক অনুযায়ী গণেশ চতুর্থী বা গণেশউৎসব। শিব ওঁ পার্বতী পুত্র গনপতি, নিজে মর্তে নেমে সমস্ত ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এই বিশেষ দিনে। হিন্দু পঞ্জিকা মতে ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গনেশ বা গজানন এই মর্তে পূজিত হন।

শ্রী গণেশ কে মঙ্গল মূর্তি, বিঘ্নহর্তা নামে ডাকা হয় । বলা হয় সমস্ত শুভ কাজের শুরু শ্রী গণেশের নাম নিয়ে করলে তা সফল হয় । দেবতাদের মধ্যে তাঁকে প্রথম পূজ্য বলা হয় । ঋক বেদে গণনাং ত্বা গণপতিং হবামহে মন্ত্রে গণপতির আহ্বান দেখা যায় । যজু বেদের মন্ত্রে গণেশ কে দেব গনের মধ্যে গণপতি, প্রিয় গনের মধ্যে প্রিয়পতি এবং নিধি গনের মধ্যে নিধিপতি বলা হয়েছে ।

গনপতয়ে স্বাহা মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়- কৃষ্ণ যজু বেদের কাণ্বসংহিতা এবং ঐ বেদের মৈত্রায়নী সংহিতা তে । মৈত্রায়নী সংহিতা ও তৈত্তিরীয় আরণ্যকের গণপতির গায়ত্রী উল্লেখ সহকারে তাঁর বর্ণনা আছে । গণেশ পুরানে গণেশ কেই ওঁঙ্কার রূপী ভগবান বলা হয় । পুরান মতে গণেশ ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর পুত্র – তথা কুমার কার্ত্তিকের অনুজ ।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে গণেশ ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় উৎপন্ন হন এবং ইনি ভগবান বিষ্ণুর মতো চক্র, শঙ্খ, গদা, পদ্ম ধারন করেন । বামন পুরান মতে ভগবতী মাতা পার্বতী স্বীয় দেহ থেকে ভগবান গণেশ কে প্রকট করেন । আবার বরাহ পুরান মতে গণেশের সৃষ্টি হয়েছিল ভগবান শিবের মুখ থেকে। গণেশের মুখ কিভাবে গজানন হল – তা নিয়ে পুরানে একাধিক কাহানী দেখা যায় ।

ganesh chaturthi images

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে গ্রহরাজ শণি দেব গণেশ কে দর্শন করলে গণেশের মুণ্ড পাত হয় । পুরানে শনি দেবতার দৃষ্টিকে হানিকারক বলা হয় । আবার শিব পুরান মতে গণেশের মুণ্ডচ্ছেদ করেন স্বয়ং তাঁর পিতা মহাদেব । বরাহ পুরানেও শিব দ্বারা গণেশের মুণ্ডপাতের ঘটনা দেখা যায় । এতে মহাদেবী গৌরী ভীষনা রুষ্টা হলে শাপযুক্ত ঐরাবতের মস্তক কেটে গণেশের ধড়ে লাগিয়ে তাঁকে পুনর্জীবন দিয়ে দেবতাদের মধ্যে সর্ব অগ্রে পূজ্য ঘোষোনা করা হয় । গণ+ ঈশ= গণেশ । গণ অর্থে সমষ্টি যিনি ঈশ্বর বা নায়ক। তিনিই গণেশ ।

গণ শব্দটির মধ্যে আর একটি অর্থ আছে। এর অর্থ সেনাবাহিনী । গনেদের দের অগ্র দেখে তাঁর এক নাম গনণায়ক । গণেশ কে একদন্ত নামে ডাকা হয়। বলা হয় গণেশের একটি দাঁত কেটেছিলেন পরশুরাম । মহাভারত স্বহস্তে লিখেছিলেন গণেশ । ব্যাস ঋষি বলতেন আর গণেশ লেখতেন । গণেশ হল ‘গন শক্তি’ এর প্রতীক ।

মূষিককে শ্রী গণেশের বাহন বলা হয় । এই অপকারী প্রানীটি কিভাবে বাহন হল – এর মধ্যেও তত্ত্ব কথা আছে । মূষিক তাঁর দন্ত দিয়ে জিনিষপত্র কেটে তছনছ করে। ভালো মতো দেখলে দেখা যায় মূষিক অত্যন্ত ধৈর্য নিষ্ঠা সহকারে একস্থানে বসে এগুলো কাটে । যা আমদের ধৈর্যপরায়ন ধীর স্থির হবার শিক্ষা দেয় । তাছারা জীব অষ্টপাশে বদ্ধ । ঘৃনা, অপমান, লজ্জা, মান, মোহ, দম্ভ, দ্বেষ, বৈগুণ্য ইত্যাদি অষ্ট পাশ । শ্রী গণেশের বাহন এই অষ্টপাশ ছিন্ন করবার শক্তি দেয় । আগামীকাল গণেশ চতুর্থী। সকলকে শুভেচ্ছা জানাই। শ্রী গণেশের চরণে প্রনাম জানিয়ে বলুন-

ওঁ দেবেন্দ্র- মৌলি- মন্দার মকরন্দ কণারুণাঃ ।
বিঘ্নং হরন্তু হেরম্বচরণাম্বুজরেণবঃ ।

Wednesday, August 23, 2017

জন্মাষ্টমী

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী তিথিতে পূজোর নিয়ম সংক্ষেপে বর্ণিত হোলো। এই ব্রত সব হিন্দুরাই করতে পারবেন । ব্রতের পূর্বদিন ও ব্রতের পরদিন নিরামিষ আহার ভক্ষণ করে সংযমী হয়ে থাকতে হবে। ব্রতের দিন উপোবাসী থেকে রাত ৮ টার পর পূজায় বসতে হবে। উপযুক্ত সময় রাত ১২ টায় ।

উপবাসে জল, ঔষধ, চিনি মিশ্রিত সরবত আর দুধ ছাড়া লাল চা ভিন্ন আর কিছু ভক্ষণ নিষেধ । সম্পূর্ণ উপবাসে অক্ষম তাহারা ফলের রস, কাঁচা দুধ আর এতেও অসমর্থ ব্যাক্তি কিছু ফলমূল খেয়ে থাকতে পারেন । ভগবানের পূজায় নারকেল নাড়ু, দৈ, ঘি, মধু, কাঁচা দুধ, ফলমূল, বাটার( মাখন) বা খোয়া ক্ষীর হলেই হবে । তাল ফল লাগবেই।

তালের বরা ও তালের কাঁচা রস নিবেদন করবেন, অভাবে শুধু মাত্র কাঁচা তালের রস সেটাও না থাকলে গোটা তাল ফল নিবেদন করবেন । এক আঁটি তাল, শ্বেত তাল দেবেন না । তিলক ও তুলসীমালা ধারণ করে পূজাতে বসবেন। অভাবে তুলসীতলার মাটি নিয়ে কপালে তিলক একে পূজোতে বসবেন ।

পূজার সময় প্রথমে আচমন করে নিতে হবে। আচমন করবেন এই বলে- “ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু” বলে । অতঃ ভগবান বিষ্ণুর দিব্য চতুর্ভুজ স্বরূপ স্মরণ করে ভগবান বিষ্ণুকে প্রনাম করবেন । তারপর স্বস্তি বাচন, স্বস্তি সুক্ত (ঋক, সাম, যজু তিন বেদের মধ্যে যেকোনো একটি বেদের মন্ত্র ফলো করবেন), সাক্ষ্য মন্ত্র পড়বেন । এরপর সংকল্প মন্ত্র পাঠ করবেন যথা বিষ্ণুরোমম্ তৎসদদদ্য ভাদ্রে মাসৈ কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমান্তিথৌ অমুক গোত্রঃ সর্বপচ্ছান্তিপূর্বক গণেশাদি নানা দেবতা পূজা পূর্বক শ্রীকৃষ্ণজন্মাষ্টমী ব্রতমহং করিষ্যে। এরপর কোশাকুশী সাজাবেন (অখণ্ড পুস্প, সুগন্ধি জল, কর্পূর, অগুরু, শ্বেত চন্দন, দূর্বা, গোটা আতপ চাল, তুলসী দিয়ে তীর্থ আহ্বান করবেন) ।

আসন শুদ্ধি করবেন। গুরুপূজা করে গণেশ, বিষ্ণু, সূর্য, শিব ও কৌষিকীর নামে পাঁচটি পুস্প দিবেন। শালগ্রাম বা বাণলিঙ্গে পুস্প গুলি দেবেন। এগুলি না থাকলে ঘটে দেবেন, ঘট না থাকলে ভগবানের সম্মুখে তাম্র পাত্র রেখে সেখানে দিতে পারেন- এবং দেওয়ার পর প্রত্যেকবার একটু করে সেখানে কোশাকুশী বা পঞ্চপ্ত্র (তামার পাত্র, তামার চামচ দিয়ে আচমন করা হয়) থেকে অল্প জল মনে করে দেবেন- এই নিয়ম ভুল করবেন না ।

Janmashtami ISKCON wallpaper images

এরপর দ্বার দেশে (ঠাকুর ঘরে প্রবেশের দরজার দুদিকে) দুটি চন্দন মিশ্রিত পুস্প দেবেন, জলের ছিটে দেবেন । অত ঋষি, মাস, পণ্ডিত, গজেভ্য , দশমহাবিদ্যা, দশ অবতার, নব গ্রহ, দশ দিকপাল, ইষ্ট দেবতা, কুল দেবতা, বাস্তু দেবতা, গ্রাম দেবতা ও সর্ব দেবদেবীর নামে একটি একটি পুস্প দেবেন- দেওয়ার সাথে সাথে জলের ছিটে দেবেন । এরপর মানস পূজা- জন্মাষ্টমীতে গোপালের ধ্যান করতে হয় । যথা –

ওঁ নবীননীরদশ্যামং নীলোন্দীবরলোচনম্ ।
বল্লবীনন্দনং বন্দে কৃষ্ণং গোপালরূপিনম্ ।।

মানস পূজার পর পুস্প টি নিজের মাথায় দিয়ে গোপালের ধ্যান করবেন মনে মনে। ধ্যান সমাপনের পর জলশঙ্খ স্থাপন করবেন । বিগ্রহ অভিষেক করবেন পঞ্চামৃত বা সুগন্ধি বারি দ্বারা । এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানী ও গোপালের পূজা করবেন । ১০৮ তুলসী পত্রের মালা রাধামাধবকে দিতে হবে । কৃষ্ণের ধ্যান আপনি যে কোনো বইতে পাবেন । রাধারানীর ধ্যান-

ওঁ অমলকমল- কান্তিং নীলবস্ত্রাং সুকেশীং,
শশধরসমবক্ত্রাংখঞ্জনাক্ষীং মনোজ্ঞাং ।
স্তনযুগগত- মুক্তাদামাদীপ্তাং কিশোরীং ,
ব্রজপতি- সুতকান্তাং রাধিকামাশ্রয়েহম্ ।।

এরপর গোপালের পূজা করবেন । অতঃ শ্রীকৃষ্ণের বীজ (বীজ বলা বারন। কৃষ্ণ বীজ বই বা নেট থেকে পেয়ে যাবেন।) জপ করে বা ওঁ শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ – এই মন্ত্র ১০৮/১১ বার জপ করে শ্রীকৃষ্ণকে জপ সমর্পণ করবেন ।

এরপর সুনন্দ , উপানন্দ, বসুদেব, দেবকী, যশোদা, রোহিনী, বলরাম, সুভদ্রা, উদ্ভব, অক্রুর, নন্দ, ষষ্ঠী, মার্কণ্ড, শ্রীদাম, সুদাম, দাম, বসুদাম, সুবল,বৃন্দারাণী, বৃন্দাবন, অষ্ট সখী, যোগমায়া, শিব, দুর্গা, গঙ্গা ও যমুনা দেবীর নামে একটি একটি করে পুস্প তামার পাত্রে দেবেন । এছাড়া ভগবানের অঙ্গ ভূষণ যেমন বংশী, ময়ূর পেখম ইত্যাদির নামের পুস্প ও ভগবানের অস্ত্রাদি যেমন সুদর্শন চক্র, গদা, শঙ্খ, শার্ঙ্গ ধনুক ইত্যাদির নামে পুস্প দেবেন । পূজা শেষ হলে ভোগ নিবেদন করবেন ।

এরপর আরতি করবেন । ধুপকাঠি, পঞ্চপ্রদীপ, কর্পূর প্রদীপ মাষ্ট , জল শঙ্খ , বস্ত্র, পাখা, চামর, পুস্পের পাত্র দ্বারা আরতি করবেন । তামার পাত্রে গুড়ো ধূপ রেখে তার ওপর কর্পূর প্রজ্বলিত করে বিষ্ণু দেবের আরতি করলে উনি প্রসন্ন হন (হরিভক্তিবিলাস) । এরপর “ওঁ গোবিন্দায় নমঃ” বলে তিনবার পুস্পাঞ্জলি দিয়ে স্তব পাঠ ( ১০৮ নাম পড়লেও হবে) করে ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে গোবিন্দকে প্রনাম করে শঙ্খ , কাঁসর ধ্বনি করবেন । পূজা সমাপন হলে প্রসাদ পরদিন সেবা নেওয়ার নিয়ম। অসমর্থ ব্যাক্তি পূজার পর প্রসাদ নিতে পারেন ।

পরদিন কোনো মন্দিরে বা সন্ন্যাসীকে সামান্য দান দিয়ে ভগবানের অন্ন প্রসাদ সেবা নেবেন । যদি পারেন তাহলে গোটা অষ্টমী তিথি উপবাস রাখবেন, নাহলে পূজার পর প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন । তালের বরা, সন্দেশ এ যেহেতু আটা ময়দা থাকে- তাই এই প্রসাদ সেদিন নেবেন না, পরদিন নেবেন । অষ্টমী পার হলে যারা ঘটে পূজো করবেন- তারা ঘট নাড়িয়ে দেবেন ।

জোর করে জলপান, ঔষুধ ছেড়ে কেউ উপবাস করবেন না। কারণ গরমের সময় জল পান না করলে কিডনির অসুখ দেখা দিতে পারে। আমরা কষ্ট করে থাকলে ভগবান নিজেও কষ্ট পান। যতটা পারবেন, ততটাই করবেন ।

সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি বলা হল। সবচেয়ে ভালো স্বীয় স্বীয় গুরু পরম্পরার মত অনুসরণ করে পূজা করা ।

Monday, August 21, 2017

সূর্য গ্রহণ কবে

সূর্য ও চন্দ্র গহণের ব্যাখ্যা অনেকটা বিজ্ঞানের মত । আলোর সামনে কোন পদার্থ থাকলে তার ঠিক বিপরীত দিকে ছায়া পড়ে । সূর্যের আলোর সামনে অবস্থিত পৃথিবীর একটি ছায়া প্রতিনিয়ত মহাশূন্যে পড়ছে । সে ছায়া যখন চন্দ্রের উপর পড়ে তখন চন্দ্র গ্রহণ হয় । চন্দ্র, পৃথিবী ও সূর্য একই সরল রেখার হলে চন্দ্র গ্রহন হয় । সকল পূর্ণিমা তিথিতেই চন্দ্র সূর্যের বিপরীত দিকে ও পৃথিবীর পশ্চাতে এক সরল রেখায় থাকে । তবে বছরে প্রত্যেক মাসে পূর্ণিমা তিথিতে চন্দ্র গ্রহন হয় না কেন?

সৌরজগৎ সহ সূর্যের সঞ্চার বৃত্তের দুই স্থানের সঙ্গে সূর্যের আকর্ষন দ্বারা পরিচালিত পৃথিবীর সূর্য প্রদক্ষিন কক্ষের দুই স্থান স্পর্শিত হয়ে যেমন শারদ বিষুব ও বাসন্তী বিষুব সৃষ্টি হয়েছে । ঠিক তেমনি উপবৃত্ত পৃথিবী কক্ষের দুই স্থান ও চন্দ্রের উপবৃত্ত কক্ষ পরিধির প্রান্তদ্বয়ে সম্পাত সংগঠিত হয়েছে । এই সম্পাতকে ভাগবতে রাহু নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে । রাহুতে উপস্থিতির সময় যদি চন্দ্রের পূর্ণিমা হয়, তবে পৃথিবীর ছায়া চন্দ্রের উপর পড়ে গ্রহণ ঘটায় । রাহু দ্বারা আড়ষ্ট না হলে পৃথিবীর ছায়া চন্দ্রকে আচ্ছাদিত করতে পারে না ।



তাই বছরে সকল পূর্ণিমা তিথিতে চন্দ্রগ্রহন হয় না । বছরে চন্দ্র গ্রহন নাও হতে পারে আবার তিনটি পর্যন্ত হতে পারে, তবে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বছরে একাধিক হয় না । পৃথিবীর ছায়ার মধ্যে চন্দ্রের যত অংশ প্রবিষ্ট হয় তত অংশই গ্রস্ত হয় একে আংশিক গ্রহন বলা হয় । ভাগবতে রাহুকে ছায়া গ্রহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণে রাহুর যথেষ্ট প্রভাব আছে । সূর্য গ্রহণের ক্ষেত্রে রাহু আড়ষ্ট চন্দ্র সূর্যকে আচ্ছাদিত করে এবং চন্দ্র নিক্ষিপ্ত ছায়াটি পৃথিবীর কোনো অংশের উপর দিয়ে যায় । চন্দ্র গ্রহণের ক্ষেত্রে রাহু আড়ষ্ট চন্দ্র পৃথিবী নিক্ষিপ্ত ছায়াতে প্রবেশ করে ।

অমাবস্যা হলেই সূর্য গ্রহণ বা পূর্ণিমা হলেই চন্দ্র গ্রহণ ঘটে না । গ্রহণ ঘটানোর জন্য চন্দ্রের রাহু আড়ষ্ট হওয়া চাই । সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ কুদরতী নিদর্শন । সূর্য গ্রহণের সময় কোনকিছু করা বা না করা নিয়ে গর্ভবতী মহিলাদের কি কোন বিধি-নিষেধ রয়েছে? সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলারা মুরগী, মাছ ইত্যাদি কাটলে, সন্তানের হাত-পা কাটা হয় এ ধরনের কথা বলা বা বিশ্বাস করা কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা ।

বস্তুত সূর্য গ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলাদের বা কারো জন্যই জাগতিক কোন কাজ করা বা না করা নিয়ে কোনরকম বিধি-নিষেধ নেই । এ ব্যাপারে যা প্রচলিত আছে, তা কেবলই কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস ।


Sunday, August 20, 2017

রথযাত্রা কি

রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত পালিত হয় চন্দ্র আষাঢ়ের শুক্লাপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে। হিন্দু দেবতাদের মাঝে অন্যতম জগন্নাথ দেব; ইনি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের একটি বিশেষ রূপ। জগন্নাথ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ জগৎ+নাথ=জগতের নাথ বা প্রভু। পৌরাণিক উপাখ্যান জগন্নাথদেব কে কেন্দ্র করে দুটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত আছে। প্রথম কাহিনি অনুসারে, কৃষ্ণ তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যন্মুর সম্মুখে আবিভূর্ত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তাঁর মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন।

মূর্তিনির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন সময় চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে জানিয়ে দেন মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তাঁর কাজে বাধা না দেন। বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। রাজা ও রানী সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

প্রতিদিন তাঁরা বন্ধ দরজার কাছে যেতেন এবং শুনতে পেতেন ভিতর থেকে খোদাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। ৬-৭ দিন বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। অত্যুৎসাহী রানী কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত।

ratha yatra kolkata images

এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ। দ্বিতীয় কাহিনিটির অবতারণা করা হয়েছিল পূর্বোল্লিখিত উপখ্যানটির ব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসনের উদ্দেশ্যে। বৃন্দাবনে গোপীরা একদিন কৃষ্ণের লীলা ও তাঁদের কৃষ্ণপ্রীতির কথা আলোচনা করছিলেন।

কৃষ্ণ গোপনে সেই সকল কথা আড়ি পেতে শুনছিলেন। কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা নিয়োগ করা হয়েছিল গোপীরা যখন কৃষ্ণের কথা আলোচনা করেন তখন কৃষ্ণ যেন তাঁদের নিকটবর্তী না হতে পারে সেদিকে নজর রাখার জন্য। কিন্তু গোপীদের কৃষ্ণপ্রীতি দেখে পরিতুষ্ট সুভদ্রা তাঁদেরই কথা শুনতে শুনতে বিমোহিত হয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন না যে তাঁদের দুই দাদা কৃষ্ণ ও বলরাম এগিয়ে আসছেন।

শুনতে শুনতে দুই ভাইয়ের কেশ খাড়া হয়ে উঠল, হাত গুটিয়ে এল, চোখদুটি বড় বড় হয়ে গেল এবং মুখে আনন্দের উচ্চ হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই কারণেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এইপ্রকার রূপ। বৈষ্ণবেরা কৃষ্ণের এই বিমূর্ত রূপটিকে পূজা করেন।


Thursday, June 1, 2017

জামাই ষষ্ঠী কি

ক’দিন আগেই ক্যালেন্ডারে কেটে গেছে ‘বঙ্গজীবনের অঙ্গ’ এক বিশেষ দিন। বিবাহিতা কন্যা তথা জামাই বাবাজীবনদের জন্য বাঙালি সমাজে দারুণ এক পার্বণ—জামাইষষ্ঠী! আনকোরা নতুন জামাই থেকে পুরনো জামাই বাবাজিদের জন্য বাংলা পঞ্জিকার এক বিশেষ দিন: জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিনটি। বাংলার জামাইদের জন্য উৎসর্গীকৃত নির্দিষ্ট দিনটিতে জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় শাশুড়িরা প্রতি বছর পালন করেন। এটি মূলত লোকায়ত এক প্রথা ও ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ। পরবর্তীতে এই পুজো ধর্মীয় সংস্কারের চেয়ে সামাজিকতায় স্থান পেয়েছে বেশি।

আধুনিকতার দিক থেকে আমরা যতই সমকালীন হই না কেন, কিছু কিছু প্রথা-পার্বণ আজও বাঙালি ঘরে থেকে গেছে। তাই বিশ্বায়নের যুগে বাঙালি জীবন থেকে আচার-অনুষ্ঠান সবই যে এক-এক করে উঠে যাচ্ছে, তা বোধহয় বলা যাবে না। কখনও পুরনো লোকাচার হাজির হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, যেমন নয়া মোড়কে জামাই আদর। গ্রামবাংলার পাশাপাশি শহুরে পরিমণ্ডলেও জামাইষষ্ঠী পালনের রীতি-রেওয়াজ খুব একটা ফিকে হয়ে যায়নি।

মনোলোভা নানান পদ রেঁধে-বেড়ে জমিয়ে জামাইকে খাওয়ানোর আহ্লাদ আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে। আদরের জামাইকে খাতির-আপ্যায়নের ধরনটা যদিও বদলে বদলে যাচ্ছে। যেমন বদলে যাচ্ছে আয়োজনের রকমও। সারা দিন ধরে ঘেমে নেয়ে রান্নার জোগাড় করা থেকে শুরু করে জামাইয়ের জন্য ভুরিভোজ বানানোর ব্যাপার বদলে দিয়েছিল কিছু বাঙালি রেস্তোরাঁর ‘ষষ্ঠী স্পেশাল’ বা ‘স্পেশাল থালি’।

ইদানীং মিডিয়া ফেসবুক অথবা বাণিজ্যিক পত্রিকার কল্যাণে অনেক আগেভাগেই জানা হয়ে যায়, কোন অনুষ্ঠানের জন্য কবে কী ব্যবস্থা থাকছে। পত্রিকা, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ ইত্যাদিতে সেই বিশেষ দিন ক’টি নিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রচার, তামাশা, রঙ্গ, কেনাকাটার হাতছানি। এ বছর ‘প্যান্টালুনস’ সংস্থার জামাইষষ্ঠীর বিজ্ঞাপনটি এই প্রতিবেদকের বেশ নজর কেড়েছে।

সেখানে রয়েছে ৩৪ প্রকার জামাইয়ের চরিত্রের ফিরিস্তি। ঘরজামাই, প্রবাসী জামাই, দায়িত্বশীল জামাই, উদাসীন জামাই, পেন্নামঠোকা জামাই, ইংলিশ-মিডিয়াম জামাই, ডাকসাইটে জামাই, প্রভাবশালী জামাই, সুবিধাবাদী জামাই, মিষ্টিমুখ জামাই, শুগার-ফ্রি জামাই, শৌখিন জামাই, আপনভোলা জামাই, টি-টোয়েন্টি ভক্ত জামাই—এমনই ৩৪ প্রকার জামাইয়ের মজাদার ফিরিস্তি।

তো মাদারস ডে, ফাদারস ডে, অমুক দিবস, তমুক দিবসের ফাঁক-ফোকরে আমাদের বাঙালিদের যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসা সাবেকি প্রথাসিদ্ধ ‘জামাইবরণ’ দিবসটিও একটু নতুন আন্তর্জাতিক মোড়কে ‘সন-ইন-ল’স ডে’ হিসেবে জুড়ে দেওয়া যায় না? যদিও বাংলা পত্রিকায় জামাইষষ্ঠী দিনটি কিন্তু বেশ তুখোড় ভাবেই নিজের স্থান অধিকার করে আছে সেই কবে থেকেই।

জামাইষষ্ঠী পার্বণটি লোকায়ত ও সামাজিক প্রথা হলেও মূলত ষষ্ঠী দেবীর পুজো। সন্তানের মঙ্গলকামনায় মা ষষ্ঠীর ব্রত পাঠ করা হয়। জামাইষষ্ঠীর নির্ধারিত দিনটিতে অনেক পরিবারেই মা ষষ্ঠীর পুজোর আয়োজন করা হত। কোথাও প্রতিমার ছবিতে, কোথাও বা ঘটে। মা ষষ্ঠী মাতৃত্বের প্রতীক। বিড়াল তাঁর বাহন।

ষষ্ঠীপুজোর থালায় পান সুপুরি ধান দুব্বো, ফলফলাদি অর্থাৎ গ্রীষ্মের জোগান যা যা রয়েছে সেই আম জাম কাঁঠাল তরমুজ লিচু ইত্যাদি এবং অবশ্যই তালপাতার একটি নতুন পাখা রাখা হয়। এ ছাড়াও ঘরের বাইরে কোনও দালান বা খোলা জায়গায় বট ও করমচা গাছের ডাল পুঁতে প্রতীকী অর্থে অরণ্য রচনা করে পুজো-আর্চা করা হয়। সে জন্যই এই ষষ্ঠীকে অন্য অর্থে ‘অরণ্যষষ্ঠী’ও বলা হয়।

মেয়ে-জামাইকে আপ্যায়ন করে ঘরে এনে, প্রথমে জামাইয়ের কপালে পুজোর নৈবেদ্যস্বরূপ পাঁচ রকম ফল, পান, সুপুরি, ১০৮টি দুব্বো-বাঁধা আঁটি, ধানের ছড়া, হলুদ তাগা, মাঙ্গলিক হলুদ ও দই, তালপাতার নতুন পাখার উপর আম্রপল্লব—সব একটি থালায় সাজিয়ে ছোঁয়ানো হয়। এর পর জামাইয়ের ডান হাতের কব্জিতে হলুদ সুতো ও দুব্বোর তাগা বেঁধে দেওয়ার রীতি। শাঁখ ও উলুধ্বনি দিয়ে জামাইকে বরণ করে নেওয়া এবং তাঁকে সামনে আসন পেতে বসিয়ে চর্বচোষ্য ভূরিভোজের এলাহি ব্যবস্থা। জামাইকে নতুন তালপাতার পাখার বাতাসও এ দিনের সনাতনী রীতি।

তবে শুধুই কি আর জামাই আদর? পেছনে লুকোনো একটা অর্থ তো থেকেই যায়। বাড়ির আদরের দুলালীকে তার হাতে সঁপে দিয়েই তো নিশ্চিন্ত হতে চায় বাবা-মায়ের স্নেহাবেগে ভারাক্রান্ত মন। তবু যেন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারা যায় না। চিন্তা থেকেই যায়। নতুন রাজ্যপাট নিয়ে কেমন আছে সে? স্বামীর কাছে, নতুন শ্বশুরবাড়ির কাছে কতটা মান্যতা পাচ্ছে?

Jamai Sasthi images

বাড়ির বউয়ের যথাযথ সম্মানটুকু কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিতে কোনও বাড়তি বেগ পেতে হচ্ছে না তো? ওই বাড়িতে তাদের আদরের কন্যাটির ঠিকমত যত্নআত্তি করা হয় তো? সত্যিই সুখী হতে পারবে তো আমাদের মেয়ে? কত রকম সাতপাঁচ দুশ্চিন্তা থেকেই যায় অভিভাবকের মনে। কবেকার সেই এক প্রবচন ছিল:

পুড়বে মেয়ে, উড়বে ছাই
তবেই মেয়ের গুণ গাই!’

আদ্যিকালের ওই প্রবচনটি শুনতে হয়তো এখন প্রচণ্ড বোকা বোকা লাগবে। গা জ্বলে যাবে। আগেকার সেই বস্তাপচা মানসিকতা তো এখন আর নেই। যথার্থ আধুনিক সমাজে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল। আর এ কথাও ঠিক যে, শ্বশুরবাড়িগুলো আজ অনেক বেশি লিবারাল এবং সহৃদয় মুক্তবুদ্ধি শিক্ষিত স্বামীরা আজ শুধু মাত্র ‘স্বামী’ পদবাচ্য নয়। তারাও আজ স্ত্রীদের প্রতি অনেক উদার ও বন্ধুবৎসল। অবশ্য স্ত্রী যাতে সংস্কারে স্বাধিকার ভোগ করতে পারে, সে বিষয়ে স্বামীকেও দায়িত্ববান হতেই হয়। সেটাই দস্তুর। আজকের জামাইরা বউয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট কেয়ারিং।

শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা শুনলে আজকের সপ্রতিভ পুরুষদের আর পেট গুড়গুড় মথা ভনভন হয় না। কাছেপিঠে শ্বশুরবাড়ি হলে তো কথাই নেই। সপ্তাহখানেক আগে থেকেই বউদের তাই এখন আর ‘হ্যাঁ গো, কী গো, যাবে তো?’ এই সব বলেকয়ে স্বামীদের কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে হয় না। বরের সঙ্গে বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য কথায় কথায় ‘মাখন মারতেও’ হয় না। জামাইবাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি কিঞ্চিৎ দূরে হলে অবশ্য অন্য কথা। অফিসে ছুটি পাওয়ার হ্যাপা, ট্রেনের রিজার্ভেশনের ঝক্কি এই সব।

বাকি শুধু বিমানযাত্রা। তা, পকেটে কিছু রেস্ত থাকলেও জামাইষষ্ঠী খেতে বউকে নিয়ে বউয়ের বাপের বাড়ি ফ্লাইটে যাওয়াটা বেশ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। তাই প্রবাসে বা একটু বেশি দূরে হলে ফি-বছর জামাইষষ্ঠীতে যাওয়া হয়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে গ্যাপ দিতে হয়। কী আর করা তখন? সেলফোনে শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম জানিয়ে, আশীর্বাদ রিসিভ করেই কাটিয়ে দেওয়া।

কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া অবশ্য ‘ডিউ’ থেকেই যায়। কথায় বলে, ‘যম, জামাই, ভাগনা কেউ নয় আপনা!’ ওটা কথার কথা। যম যেহেতু মৃত্যুর দূত, আর জামাই ও ভাগনা পরের বাড়ির উত্তরাধিকারী—তাই তাদের কখনও নিজের বলে দাবি করা যায় না। তবু জামাই খুশি থাকলে শ্বশুরবাড়িতে মেয়েরও কদর থাকবে। তাই জামাইকে একরকম ঘুষ দিয়েই কন্যাসন্তানের সুখ কিনতে চাওয়া। এ কথা জামাই ও তার বাড়ির লোকও বিলক্ষণ বোঝেন।

হ্যাংলা জামাই যদিও চক্ষুলজ্জার খাতিরে এমন নির্লিপ্ত ভাব করে খেতে বসে, যাতে সকলে তাকে আর একটু খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে! ওই যে একটা ঠাট্টার কথা আছে না? ‘একবার সাধিলেই খাইব’! তেমনই আর কী। তবে এখনকার শাশুড়িরা আসন পেতে, সুদৃশ্য হাতপাখা নেড়ে, কাঁসার থালা-বাটিতে বত্রিশ রকম পদ সাজিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে, শাঁখ বাজিয়ে, উলু দিয়ে ঘটা করে আর করেন না। কর্পোরেট অফিসে চাকরি করা জামাই এ সব সেকেলে রকম- সকম মোটেও পছন্দ করবে না।

তবু মায়ের মন চায় নিজে রান্না করে মেয়ে-জামাইকে খাওয়াতে। গালভরা কিছু রেসিপি শিখে ডাইনিং টেবিলে গুছিয়ে খেতে দিলেন। জামাই যখন ওই নানান পদ দেখে ‘কোনটা খাব আর কোনটা রাখব’ করছে—তখন তাকে আরও একটু প্রশ্রয়ের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে, গলায় খানিক আর্তি রেখে শাশুড়ি মা গর্ব করে হয়তো বলবেন, ‘আজ কিন্তু সব কিছু খেয়ে নেবে বাবা। আজ আর তোমার কোনও অজুহাতই ধোপে টিকবে না, বলে দিলাম! তোমার শ্বশুরমশাই দেখেশুনে পছন্দ করে সব বাজার করে এনেছেন। গলদা চিংড়িগুলো এত ফ্রেশ ছিল যে..এ দিকে রেওয়াজি খাসির মাংস কিনতেই পাক্কা চল্লিশ মিনিট লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। তার ওপর গাঙ্গুরামের মিষ্টির দোকানেও আজ যা ভিড় ছিল!’

দুপুরে না হয় একপ্রস্ত চর্ব-চোষ্য হল। দুপুরে হালকা ভাতঘুম দিয়েই বিকেলে মাল্টিপ্লেক্সে সবাইকে নিয়ে একটা ভাল মুভি দেখানোর ফিনান্সের দায়িত্ব কিন্তু জামাইয়ের। নামী রেস্তোরাঁয় আগে থেকেই ডিনার টেবিল বুক করে রাখা। সেও জামাইয়ের দায়িত্ব। মুড বুঝে বাঙালি খানা, নয় তো কন্টিনেন্টাল। ধোঁয়া ওঠা পুরোদস্তুর বাঙালি বনেদি মেনু।

আহা, দু’পক্ষই আজ খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে অন্তত দরাজ। খেয়ে, খাইয়ে পরিতৃপ্তির সঙ্গে আলাদা একটা আদেখলেপনাও। দেখনদারি। একটা বিনিময়প্রথা। এখনও কি আর সেই দিনকাল আছে, যখন কোনও যৌথ পরিবারের এ-তরফ বা ও-তরফের কোনও জামাই হঠাৎ করে বিনা নেমন্তন্নেই শ্বশুরবাড়ি এসে পড়েছেন আর বাড়ির কোনও উদয়াস্ত রান্নাঘরে পড়ে-থাকা গিন্নি গাইছেন—

‘বলি ও ননদি, আর দু’মুঠো
চাল ফেলে দে হাঁড়িতে
ঠাকুরজামাই এল বাড়িতে!’

জামাইদের নিয়ে আস্ত একটা দিন সেলিব্রেট করার মধ্য থেকেই শাশুড়ি ও জামাইয়ের মধ্যেকার নির্মল একটা সাবেক পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন টের পাওয়া যায়। এলাহি খাতির সে দিন। জামাইকে কাছে বসিয়ে পাত পেড়ে খাওয়ানো!’ অবশ্য এখনকার একটু আধুনিক শাশুড়ি মা হলে মেয়ে-জামাইকে তিনি নিয়ে যেতেন আধুনিক কোনও রেস্তোরাঁয়। নিজেই মেনু কার্ডে চোখ বুলিয়ে আমিষ নিরামিষ নানান পদের অর্ডার করে দিতেন। ষষ্ঠীর দিনের জামাই আদর সেই পছন্দসই মেনুতেই দিব্যি হয়ে যায়।

রেস্তোরাঁগুলোও অপেক্ষা করে থাকে, শাশুড়ি-জামাইয়ের পাতে ভেটকি পাতুরি, কষা মাংস, চিতল, ইলিশ, ডাব চিংড়ি অথবা চিংড়ি মালাইকারি, মোচার ঘণ্ট, লুচি, বেগুনভাজা, কাতলা মাছের মাথা দেওয়া মুগডাল, আমপানা থেকে ভাপা দই আর বেকড রসগোল্লা তুলে দেওয়ার জন্য—যা খেয়ে সুখ যেমন, খাইয়েও সুখ! গতিশীল যুগেও সে নব্যই হোক বা পুরনো, জামাইরাও এখন দিব্যি অনলাইনের বাজারে ফ্লিপকার্ড বা অ্যামাজন বা স্ন্যাপডিলেই শ্বশুর-শাশুড়ির উপহারটাও চুপিচুপি বুক করে দিচ্ছেন।

আসলে শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোর চাওয়া-পাওয়ারও তো কদর দিতে হয়। ওঁরাও তো এই বিশেষ দিনটায় জামাইকে নানা আদর-যত্ন ও উপহারে ভরিয়ে দিতে ত্রুটি রাখেন না। অনলাইনে বুক করা উপহার সামগ্রীও এখন জামাই নিজে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছনোরও ঢের আগেই পৌঁছে যায় শ্বশুরবাড়িতে। নিন্দুকেরা হয়তো মুখ বাঁকাবেন।

তাঁরা বলবেন, এই নব্যযুগে যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব। এককালে জামাই বাবাজিরা সস্ত্রীক এই জামাইষষ্ঠীর দিনটায় শ্বশুরবাড়ি যেতেন রীতিমত মাঞ্জা দিয়ে। কখনও সোনার চেন আঁটা সোনার বোতাম-সহ সিল্কের পাঞ্জাবি, কিংবা গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। আর খানিকটা অবধারিত ভাবেই হাতে থাকত পেল্লায় সাইজের মিষ্টি দইয়ের হাঁড়ি, বড় বাক্স ভর্তি নকুড়ের সন্দেশ, আড়াই-তিন কেজির ইলিশ, না হয় কাতলা বা রুই। আর তামাম শ্বশুরকুলের প্রণম্যদের জন্য শাড়ি-জামাকাপড়-সহ অন্যান্য উপহার।

কিন্তু দিনকাল বদলেছে। এখন জামাইবাবুরা একটা কিছু জমকালো অথচ বেশ এথনিক গিফট দিতে চান শাশুড়ি মা ও শ্বশুর মশাইকে। ওই প্যানপ্যানানি সন্দেশ-মিষ্টি, দইয়ের হাঁড়ি আর মাছ এখনকার দিনে ফেড আউট। কেমন এক ভেতো বাঙালি টাইপ আদিখ্যেতা হয়ে যায়। তা ছাড়া এখন নাগালে প্রচুর সুবিধা-সুযোগ, মোবাইলের কি-প্যাডে আঙুলের কারসাজিতে চটজলদি অনলাইনে কেনাকাটার হরেক অফার। তার চেয়ে স্ত্রীকে খানিক উসকে দিয়ে তার মায়ের জন্য নামী দোকানের হালকা

সোনার দুল বা পেনডেন্ট। দারুণ ফ্যাশনেবল হবে ব্যাপারটা। তবে এও জামাই বাবাজি ঠারেঠোরে জানে যে, মেয়ে মাকে ওই গয়না বেশি দিন পরতেই দেবে না! কিছু দিন বাদেই নিজের বিয়েতে উপহার পাওয়া একটা অপছন্দের ডিজাইনের দুলের সঙ্গে বদলে নেবে। দিলদার জামাইরা তো আজকাল শ্বশুরবাড়িতে উপহার দিতে বিশেষ হিসেবনিকেশও করেন না।

কখনও শৌখিন ব্যাগ, কিচেন গ্যাজেট, ডিনার সেট, বসার ঘরের পুরনো কুশন বা পর্দা পাল্টে একদম নতুন সেট, শ্বশুরমশাইকে বিদেশি শ্যাম্পেন, অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল, আইপ়ড, ডিভিডি—কত কিছুই তো দেওয়া যায়। কিছু শৌখিন জামাই আবার উপহার দেওয়ার ব্যাপারে আরও দড়। হয়তো শ্বশুর-শাশুড়িকে চার দিন তিন রাত ট্র্যাভেল প্যাকেজে পাঠিয়ে দিলেন বনভয়েজ-এ। জামাইকেও তো একটু ঠাটবাট, একটু ‘হাটকে পসন্দ’ দেখাতে হবে। তাই না? ছিদ্রান্বেষী নিন্দুকেরা চোখ টাটাল তো ভারী বয়েই গেল! উপহার বিনিময়ে জামাই খুশ। মেয়েও আহ্লাদে গদগদ। শ্বশুর-শাশুড়িরও অপার তৃপ্তি ও ভাল লাগা।

দিন বদলেছে। দু’পক্ষই এখন দু’পক্ষকে দিতে কী বৈভবে, কী দেখনদারিতে টেক্কা দিতে চায়। জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে শপিং মল, দোকানপাট, রেস্তোরাঁয় আহ্লাদের রমরমা। কেনাকাটা, গিফট, রিটার্ন গিফট—কত দেদার আয়োজন! বাড়ির মেয়েটা যেন একটু সুখে-আহ্লাদে থাকে, আরামে থাকে, আনন্দে থাকে, তাই তার ‘কেয়ার অব’ হাজব্যান্ডকে তোয়াজে রাখা আর কী। বচ্ছরকার এই দিনটিতে আমাদের গেরস্তপোষ মননে জামাইদের কিছুটা খাতিরদারি করে, সারা বছরের জন্য মেয়ের ভাল থাকাটা ফের ‘রিনিউ’ করে নেও।

Sunday, May 21, 2017

সল্ট লেকের কাছাকাছি স্থান

Salt Lake city images সল্ট লেক

বিধাননগর বা সল্ট লেক কলকাতার একটি পরিকল্পিত উপনগরী । সল্ট লেক এখন অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সম্প্রসারণের একটি জনপ্রিয় কেন্দ্র এবং আই টি কেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় এই উপগ্রহ এলাকা নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

1756 সালের 17 জুন বঙ্গের নবাব সিরাজ উদ-দৌলাহ এই স্থানে তৎকালীন ফোর্ট উইলিয়ামে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আক্রমণের কৌশল বের করে এনেছিলেন। এই লবণ হ্রদের অধিকার এবং শিরোনামটি মীর জাফর ও তার বংশধরদের সাথে স্থায়ী হয়, যারা এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে কোম্পানির সমর্থন লাভ করে । ধীরে ধীরে, হ্রদের অধিকার স্থানীয় জমিদারদের কাছে গিয়েছিল এবং এলাকায় মৎস্যচাষের সূচনা হয়েছিল।

সল্ট লেক বেশ কিছু সুবিধা প্রদান করে যা সাধারণত অন্যান্য পুরোনো ভারতীয় শহরগুলিতে পাওয়া যায় না। বিধাননগরে পরিষ্কার এবং পরিচালিত সড়ক, বৃক্ষবিশিষ্ট কাঠামো, অপেক্ষাকৃত দূষণমুক্ত পরিবেশ, সুইমিং পুল, বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ভারতের বৃহত্তম ক্রীড়াস্তম্ভ এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়াম রয়েছে ।

সিটি সেন্টার, আইএনএক্স মাল্টিপ্লেক্স, নিকো পার্ক, নেতাজি সুভাষ স্পোর্টস ইনস্টিটিউট, হোটেল এবং বিশাল সরকারী দপ্তরগুলি যেগুলি শুধুমাত্র স্থানীয় শহরে নয় বরং কলকাতার সম্পূর্ণ শহরকে পূরণ করে। মূলত, বৃহত্তর কলকাতার সমগ্র প্রশাসনিক কাঠামো অধিষ্ঠিত করার জন্য বিধাননগর ডিজাইন করা হয়েছিল, তবে এই ধারণাটি পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে বাদ দেওয়া হয়েছিল ।

নিকো পার্ক, পূর্ব ভারতে প্রথম চিত্তবিনোদন পার্ক এবং নালবান বোটিং কমপ্লেক্স, সেক্টর IV চত্বরের মধ্যে অবস্থিত । কলকাতা শহরের সবচেয়ে বড় শপিং মলের মধ্যে একটি, সিটি সেন্টার এখানে অবস্থিত । বিধাননগরে কয়েকটি ভালো ইনফরমেশন টেকনোলজি কোম্পানি, সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যেমন এএমআরআই, কলকাতা হার্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, টিসিএস, আইবিএম ইত্যাদি।

ময়দানের পর কলকাতা নগর এলাকার বৃহত্তম সেন্ট্রাল পার্ক এখানে অবস্থিত ।

Wednesday, May 10, 2017

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নীলমণির তৃতীয় পুত্র। তিনি সঙ্গীতজ্ঞ না হলেও তাঁর আমল থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সঙ্গীতচর্চার সূত্রপাত হয়। “বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস”গ্রন্থে বসু বলেছেন, রামলোচনের সময়কাল থেকেই বাঈজি নাচ ও কালোয়াতি গান ভিন্ন অন্য মজলিশি আমোদ ছিল না। রামলোচন সব কবি, কালোয়াতি গান ও বাঈজি আহ্বান করে স্বীয় বাড়িতে মজলিশ করাতেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে শুনাতেন।

তৎকালীন সময়ে রামলোচন কলকাতার বৃহত্তর ধনীসমাজে বৈঠক- সঙ্গীতচর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দ্বারকানাথ পরবর্তীকালে তাঁর পারিবারিক উপযুক্ত উত্তরসূরি সঙ্গীতবাহক হয়েছিলেন।(সঙ্গীতকোষ—করুণাময় গোস্বামী)। সব রকম উৎসবের অঙ্গ হিসেবে তিনি যে নৃত্য-গীতের আয়োজন করতেন তার বিবরণ পাওয়া যায়।

তবে রামলোচন ঠাকুরের নৃত্য-গীতের মজলিশ ছিল জোড়াসাঁকোর ভবনে আর দ্বারকানাথের সব উৎসব অনুষ্ঠানের স্থান ছিল প্রধানত তাঁর বেলগাছিয়া ভিলা বা বেলগাছিয়া রোডে অবস্থিত সুরুচিতে সুসজ্জিত বাগানবাড়ি। প্রচুর অর্থব্যয়ের সঙ্গে সৌন্দর্য বোধের পরিচায়ক এই সুপ্রশস্ত ভিলায় তিনি ইউরোপীয় ও এ দেশীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের পার্টি দিতেন। তাঁর ক্রমবর্ধমান ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধা ও শ্রীবৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এই ব্যয়বহুল উৎসব। ১৮৪০সালে বেলগাছিয়া ভিলায় গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের ভগ্নি মিস ইডেন ও অন্যান্য সাহেবদের পার্টিতে বাঈ-নৃত্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৮১৭ খৃষ্টাব্দে গয়ানহাটার ডেভিড হেয়ার, গোরাচাঁদ বসাকের বাড়িতে প্রথম ইংরেজী স্কুল স্থাপন করেন, একই বছর তাঁদের ও জনসাধারণের সহযোগিতায় ২০শে জানুয়ারী কলেজ স্কয়ারে ‘হিন্দু কলেজ’ স্থাপিত হয়। সমগ্র ভারতবর্ষে ইংরেজী শিক্ষার সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা লগ্নে রাজা রামমোহন ও ডেভিড হেয়ার নামক এক স্কটিশ সাহেবকে দ্বারকানাথ সাহায্য করেছিলেন। ১৮২৫খৃষ্টাব্দে কলকাতায় ‘সংস্কৃত কলেজ’ স্থাপিত এবং ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে পাশ্চাত্য পর্যায়ে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার জন্য ‘কলকাতা মেডিকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বারকানাথ এ সব প্রতিষ্ঠানে নানা সহযোগিতা করেছিলেন।

Jorasanko Thakurbari images

দেবেন্দ্রনাথ, দ্বারকানাথের দ্বিতীয় পুত্র। জীবনের অধিকাংশ সময় প্রবাস বাসী হলেও পরিবারের শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে উৎসাহ ও উচ্চমানের লক্ষ্যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ১৮৪৯সালে জনড্রিঙ্ক ওয়াটারবীটন ও এ দেশীয় কয়েকজন পন্ডিতের সাহায্যে ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ স্থাপন করেন। অতঃপর প্রতিকূল অবস্থার সাথে যুদ্ধ করে রাজা দক্ষিনারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সুকিয়াস্ট্রীটের বাড়ির বৈঠকখানায় প্রথম স্কুল খোলা হয়। ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ খোলার সাথে সাথে শুরু হলো রক্ষণশীলদের প্রহসনমূলক প্রতিবাদী ছড়াঃ

একই সঙ্গে ছাপা হতো বিভিন্ন চমকপ্রদ চিত্তাকর্ষক খবরঃ “বালিকাগণকে বিদ্যালয়ে পাঠাইলে ব্যাভিচার সংঘটনের আশংকা আছে, কেননা বালিকাগণ কামাতুর পুরুষের দৃষ্টিপাতে পড়িলে অসৎ পুরুষেরা তাহাদিগকে বলাৎকার করিবে, অল্পবয়সী বলিয়া ছাড়িয়া দিবে না, কারণ খাদ্য-খাদক সম্পর্ক!”[সমাচার চন্দ্রিকা]।
নীলকণ্ঠ মজুমদারও বললেন, “প্রকৃত বিদ্যাশিক্ষা নারীর পক্ষে অমঙ্গলের কারণ, কেননা ইহার দ্বারা পুত্রপ্রসবেগ যোগিনীর শক্তিগুলির হ্রাস হয়। বিদুষী নারীর বক্ষদেশ সমতল হইয়া যায় এবং তাহাদের স্তনে প্রায়ই স্তন্যের সঞ্চার হয় না”।

সেই কুসংস্কারপূর্ণ অন্ধকার যুগে ঠাকুর পরিবারের অন্তঃপুরে পর্দা প্রথার কঠোরতা থাকলেও নারী শিক্ষার উন্নতির জন্য দেবেন্দ্রনাথের উৎসাহ ও সহযোগিতা ছিল। তিনি তাঁর অষ্টমবর্ষীয় জ্যেষ্ঠকন্যা সৌদামিনীকে ‘ফিমেলস্কুলে’ পাঠিয়েছিলেন স্থায়ী শিক্ষার জন্য যতটা না তারচেয়েও বেশি দৃষ্টান্তের জন্য। ‘বেথুনস্কুল’ খোলার লগ্নে তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু হরদেব চট্টোপাধ্যায় উচ্চবর্ণের ব্রাক্ষ্ণণ হওয়া সত্ত্বেও সর্বপ্রথম দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যা নীপময়ী ও প্রফুল্লময়ীকে বেথুন স্কুলে পাঠিয়ে। পরবর্তীকালে এই দুই কন্যার বিবাহ হয় মহর্ষির দুই পুত্র হেমেন্দ্রনাথ ও বীরেন্দ্রনাথের সাথে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী

rabindranath tagore wallpaper images

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। তিনি বাড়িতে শিক্ষিত ছিলেন এবং সতেরো বছরে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে স্কুলে যাওয়ার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি তার পড়াশোনা শেষ করেননি। প্রাপ্তবয়স্ক বছরগুলিতে, তার বহুবিশিষ্ট সাহিত্যিক কার্যক্রম ছাড়াও, তিনি পারিবারিক এস্টেটে পরিচালনা করেন, একটি প্রকল্প যা তাকে সাধারণ মানবতার সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মধ্যে নিয়ে আসে এবং সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তার আগ্রহ বৃদ্ধি করে।

তিনি শান্তিনিকেতনে একটি পরীক্ষামূলক স্কুল শুরু করেন যেখানে তিনি তাঁর উপনিষদ শিক্ষার আদর্শের চেষ্টা করেন। সময়ে সময়ে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশ নেন, যদিও তার নিজের অনুভূতিহীন এবং স্বপ্নদর্শী উপায়ে এবং আধুনিক ভারতে রাজনৈতিক পিতা গান্ধী ছিলেন তাঁর অনুগত বন্ধু।

1915 সালে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নাইটহুড পান, তবে কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ভারতে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে পদত্যাগ করেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি বাংলায় লেখক হিসেবে সাফল্য লাভ করেন। তাঁর কিছু কবিতা এবং অনুবাদের মাধ্যমে তিনি দ্রুত পশ্চিমে পরিচিত হন । আসলে তার খ্যাতি একটি উজ্জ্বল উচ্চতা অর্জন করে । বিশ্বের জন্য তিনি ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন এবং ভারতের জন্য, বিশেষত বাংলার জন্য, তিনি একটি মহান জীবিত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন ।

যদিও রবীন্দ্রনাথ সব সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সফলভাবে সফল ছিলেন, তবে তিনি সর্বপ্রথম কবি ছিলেন। তাঁর পঞ্চাশ ও অদ্ভুত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সোনার তরি (1894), গীতাঞ্জলি (1910) এবং বালাকা (1916) সব থেকে বেশি সাফল্য পায় । গীতাঞ্জলি, তাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রশংসিত । তিনি কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কাহিনী এবং কয়েকটি উপন্যাস লেখেন । এর পাশাপাশি তিনি 1941 সালে তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে দুটি আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ অনেক ছবি ও গানও লিখেছিলেন যা রবীন্দ্র সঙ্গীত হিসেবে পরিচিতি পায় ।

Biography of Rabindranath Tagore

Rabindranath Tagore images

Rabindranath Tagore was born into a wealthy family and lived his childhood and youth in a privileged cultural environment. He was the last of the fourteen children of a family consecrated to the spiritual renewal of Bengal. He received education through tutors and in several schools. He wrote his first poem at the age of eight years and got published at seventeen.

In 1878 he was sent to Great Britain, where he studied literature and music in University College, London. He married a sixteen-year-old girl in 1883, when he was known for his poems and songs, and in 1890, he went on to manage the assets of his wife's family in present-day Bangladesh, continuing his literary work.

In 1901, he moved to Santiniketan, where he founded a school, in which he structured a pedagogical system that defended the intellectual freedom of the human being, which at the end of 1921 became an international university under the name of Visva Bharati, and was declared a state university in 1951. He traveled to England, Japan and the United States, continuing his work at his school, and raising funds for this purpose. In time he would travel to Peru and Argentina and later to Southeast Asia. The last years of his life was also dedicated to painting.

Politically, Tagore was an advocate of Indian independence and was against the partition of the Indian subcontinent. From 1912 he received numerous invitations to speak in Europe, USA and some Asian countries, which served to increase his prestige. In 1913, he won the Nobel Prize for Literature, in recognition of his entire career and his political and social involvement.

Tagore was the author of stories, short stories, essays, travel books, theater and especially poems, for which he is best known, and to which he often put music. He wrote in Bengali that he himself translated into English. He is the most prestigious Indian writer of the early twentieth century. He published in the literary newspaper Bharati, founded by two of his brothers in 1876.

Friday, April 14, 2017

পহেলা বৈশাখ : স্বাগত বাংলা নববর্ষ

রাত পোহালেই ১৪ এপ্রিল। মানে বাংলা সনের প্রথম দিবস। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। কালের যাত্রায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যুগে ক্ষণ গণনার প্রথা চালু করা হয়। এর মধ্যে ইসায়ী বা ইংরেজী সনের হিসাব দুনিয়া ব্যাপী প্রচলিত। অঞ্চল এবং ভাষা ভেদেও ক্ষণ গণনার প্রথা চালূ রয়েছে। আরবী সন বা হিজরী সালের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী। ফার্সিদেরও পৃথক সন রয়েছে। কালের আবর্তে বাংলায় ক্ষণ গণনার প্রথাও চালু হয়।

এটা নিশ্চয়ই বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের জন্য গর্বের বিষয়। বাংলা যাদের মুখের ভাষা, জন্মভুমির ভাষা তারা এ নিয়ে গর্ব করবেন। সুতরাং এই ভাষার ক্ষণ গণনার হিসাবের প্রথম দিন নিয়ে কিছুটা আবেগ থাকতেই পারে।

বাংলা সন কোন মুসলমান নাকি কোন হিন্দু, মোগল, পাঠান বা ফার্সিয়ানরা আবিস্কার করেছেন, সেটা নিয়ে আমার কোন আপত্তি নাই। যারা বা যিনি এই সন আবিস্কার করেছেন বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পেতে পারেন। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। অন্তত এটা বলা যায় বাংলা ভাষার প্রচলন এই অঞ্চলে এরও বহু আগে শুরু হয়েছিল। যে কারনে এই ভাষার সাথে সঙ্গতি রেখে ক্ষণ গণনা করার একটি পদ্ধতিও চালু করা হয়।

Nababarsha Poila Baisakh images

যদিও বাংলা সন চালুর বয়স ৫০০ বছর হয়েছে। কারন হিজর‍ী সানের সাথে সঙ্গতি রেখে এটার হিসাব শুরু করা হয়েছিল। তখন এই অঞ্চলে মুসলমানদের আধিপত্য ছিল। এই ক্ষণ গণনাকে এ অঞ্চলের বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সকলেই আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন। কারন বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানই বেশি। কাজেই এই ক্ষণ গণনা পদ্ধতিটির পৃথক কোন ধর্মীয় আবেগ বা আবহ তৈরির কোন সুযোগ থাকতে পারে না। এটা নিয়ে বারাবারিও কিছু নেই।

পহেলা বৈশাখ নামটি উচ্চারিত হবার সাথে সাথে দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে মহা উৎসবের একটি চিত্র। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নারীদের শাড়ি ও ছেলেদের পায়জামা পাঞ্জাবি পোশাকে সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে। এদিনে তাদের পূজা এ আরাধনার পবিত্র রং লাল সাদা রঙ্গের কাপড় পরে দলে দলে শোভাযাত্রা বের করে দুঃখকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার লক্ষ্যে । বিভিন্ন কনসার্ট ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখে যোগ করে নতুন মাত্রা । কালক্রমে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখ পূজার সকল আসর অনুষ্ঠান বর্তমানে পহেলা বৈশাখে রুপ নিয়েছে । এদিনে নতুন বস্ত্র পরিধান করে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে,প্রদীপ জ্বালিয়ে রাতে গানের আসর বসায় যাতে গানে গানে সব রোগ শোক দূরীভূত হয় ।

Tuesday, January 31, 2017

সরস্বতী পূজা

সরস্বতী পূজা সম্পর্কে যেহেতু এই লেখা, দেবী সরস্বতী আসলে কে? সরস্বতীকে ছোটো দেবী হিসেবে এতদিন মনে করে এলেও সরস্বতী মোটেই কোনো ছোটো দেবী নয় । দেবী সরস্বতীর গায়ের রং হয় সব সময় সাদা বা শ্বেত-শুভ্র জাতীয়, খেয়াল করে দেখবেন সরস্বতীর মূর্তিতে লাল কালো বা অন্য কোনো রং ব্যবহার করা হয় না। দেবী সরস্বতীর শুভ্রমূর্তি আসলে নিষ্কলুষ চরিত্রের প্রতীক ।

এটা এই শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক ছেলে মেয়েকে হতে হবে নিষ্কলুষ নির্মল চরিত্রের অধিকারী । যে ছেলে মেয়ে বাল্যকাল থেকে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার চেষ্টা করবে, সে যে সারাজীবন তার সকল কর্ম ও চিন্তায় নিজেকে নিষ্কলুষ রাখতে পারবে, তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই ।

সরস্বতী পূজায় আর একটি অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে দেবী সরস্বতীর সাথে থাকা রাজহাঁস। রাজহাঁসকে প্রায় সবাই সরস্বতীর বাহন বলে মনে করে । কিন্তু দেব-দেবীর বাহন বলে কিছু হয় না। বাহন বলতে আমরা বুঝি যে বহন করে। কিন্তু দেব-দেবীরা এমনিতেই প্রত্যেকে সুপার পাওয়ারের শক্তি সম্পন্ন, কোথাও যেতে হলে তাদেরকে কারো বা কোনো কিছুর উপর ভরসা করতে হয় না ।

দেব-দেবীর বাহন বলা মানেই সেই দেব-দেবীর ক্ষমতাকে ছোটো করা। দেব-দেবীর বাহন তত্ত্বকে স্বীকার করলেই এই প্রশ্ন উঠবে যে, যে দেব-দেবী নিজেই কোথাও যেতে পারে না, সেই দেব-দেবীর আর কী ক্ষমতা আছে, আর তাদেরকে পূজা করেই বা কী লাভ ? তাই দেব-দেবীদের বাহন বলে কিছু নেই । তাহলে দেব-দেবীর বাহন বলতে আমরা এতদিন যা জেনে এসেছি এবং দেব-দেবীদের সাথে আর অন্য যা কিছু থাকে সেগুলো আসলে কিসের জন্য থাকে আর এগুলো থাকার কারণই বা কী?

Saraswati Puja

মূর্তি পূজা এক ধরণের প্রতীকী পূজা এবং প্রকৃত সত্য হচ্ছে, কোনো মূর্তিরই ক্ষমতা নেই আপনাকে কিছু দেওয়ার; কিন্তু প্রতিটি মূর্তির সাথে যে বিষয়গুলো জড়িত থাকে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু তথ্য বা শিক্ষা, আপনি যদি সেই বিষয়গুলোর প্রকৃত ব্যাখ্যা জানেন বা জানতে পারেন, তাহলেই কেবল সফল বা সার্থক হতে পারে আপনার পূজা এবং তা থেকে আপনি কিছু না কিছু ফল লাভ করতে পারেন ।

রাজহাসেঁর মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে যে, এক পাত্রে থাকা জল মিশ্রিত দুধের থেকে সে শুধুমাত্র দুধ শুষে নিতে পারে।সরস্বতী যেহেতু শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট পূজা, সেই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যেতে পারে যে, রাজহাসেঁর এই তথ্য শিক্ষার্থীদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, সমাজে ভালো মন্দ সব কিছুই থাকবে, তার মধ্যে থেকে তোমাদেরকে শুধু ভালোটুকু শুষে নিতে হবে। অধিকাংশ হিন্দু ছেলে-মেয়েরা যে মেধাবী এবং চরিত্রবান বা চরিত্রবতী, সরস্বতী পূজা এবং তার রাজহাঁসজনিত এই শিক্ষাই তার কারণ।

সরস্বতীর হাতে থাকে বীণা । এর কারণ হচ্ছে-হিন্দু ধর্ম হলো নাচ, গান সমৃদ্ধ শিল্পকলার ধর্ম; যা সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে সাপোর্ট করে। কারণ, প্রত্যেক ছেলে মেয়েই কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহন করে । সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে কেউ তার সেই প্রতিভাকে বিকাশ করতে পারে, কেউ পারে না, সেটা অন্য ব্যাপার ।

কিন্তু প্রকৃতির ধর্ম হিসেবে হিন্দু ধর্ম এই সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে, এই কারণেই দেবী সরস্বতীর হাতের বীণা হচ্ছে সেই শিল্পকলার প্রতীক। আর এটা সুধীজন স্বীকৃত যে, যারা- নাচ, গান, কবিতা লেখা বা নাট্যচর্চার মতো শিল্পকলার সাথে জড়িত, তারা সাধারণত কখনো মিথ্যাও বলে না; চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ তো দূরের ব্যাপার। সাধারণভাবে সকল হিন্দুই যে সৎ প্রকৃতির এবং প্রত্যেক হিন্দু ছেলে মেয়েই যে শিল্পকলার কিছু না কিছু না জানে, এটাই তার অন্যতম কারণ ।

সরসস্বতীর হাতে থাকে পুস্তক এবং সরস্বতী পূজাতেও বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক দিতে হয়। পুস্তক যে জ্ঞানের আশ্রয়, এটা তো আর নতুন কোনো কথা নয়; একারণেই হিন্দুরা একটি জ্ঞান পিপাসু এবং জ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি। এখনও যেকোনো স্কুলে যে কয়জন হিন্দু ছাত্র ছাত্রী পাবেন, দেখবেন তাদের মধ্যে ৯০% ই জিনিয়াস।
বর্তমানে দেবী সরস্বতীকে দুই হাত বিশিষ্ট দেখা গেলেও দেবী সরস্বতীর মূল মূর্তি আসলে চার হাত বিশিষ্ট, এরকম ছবি আপনারা অনেকে জায়গায় দেখতে পেতে পারেন, সরস্বতীর মূল থিমের সাথে এই চার হাত ই মানানসই ।

কারণ হলো পড়াশুনার পাশাপাশি কেউ যদি নাচ গান বা অন্য যে কোনো শিল্পকলায় এক্সপার্ট হতে চায়, তাকে দুই হাতের শক্তি ও ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করলে চলবে না, তাকে চার হাতের শক্তি ও ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করত হবে; বাস্তবে পড়াশুনার পাশাপাশি যারা বিভিন্ন শিল্পকলায় দক্ষ হয়ে ওঠে, তাদের জীবন এইরকম ব্যস্ততাতেই ভরা; একটু খোঁজ নিলেই আমার এই কথার সত্যতা বুঝতে পারবেন ।

অনেক কাঠামোতে দেখা যায়, সরস্বতী দেবী হাঁসের উপর বসে আছে আবার কোনো কাঠামোয় দেখা যায় পদ্মফুলের উপর; পদ্মফুলের উপ সরস্বতীর আসন ই সঠিক আসন। এর কারণ পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মফুল হলো সফল ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক । এই কারণেই লেখা হয়েছে- “ফুলের মতো গড়বো মোরা মোদের এই জীবন” এই ধরণের কবিতা । এককথায় ফুলের বিকাশের সাথে মানুষের জীবনের বিকাশকে তুলনা করা হয়েছে । পূর্ণ বিকশিত একটি পদ্মফুলের উপর সরস্বতীর বসে থাকার মানে হলো সরস্বতীর আদর্শকে লালন করে নিজের জীবনকে বিকশিত করতে পারলে সেই জীবনও ফুলের মতোই পবিত্র, সুন্দর, বিকশিত ও সমৃদ্ধ হবে ।

স্বয়ং ঈশ্বর হলেও সরস্বতী নারী মূর্তি অর্থাৎ মাতৃমূর্তি, এর কারণ হলো- পিতার চেয়ে মায়ের কাছে কোনো কথা বলা সহজ বা কোনো কিচু চাওয়া সহজ। সরস্বতীর পূজারীরা যেহেতু সাধারণভাবে শিশু বা বালক-বালিকা অর্থাৎ শিক্ষার্থী, তাই তারা যাতে সহজে নিজের মনের কথা নিজের মনের আকুতি, দেবী মায়ের কাছে জানাতে পারে, এজন্যই সরস্বতীকে কল্পনা করা হয়েছে মাতৃরূপে।

Thursday, January 26, 2017

Kolkata Weather

Kolkata Winter Temperature

Winter weather is the time of year including the three coldest months, largely overlapped with the astronomical winter. In this sense the onset of winter weather vary depending, mainly, to the latitude. During the winter, people with allergies, may develop hypersensitivity to pollens, dusts and powders, you spend much time at home, and also some chemical components of some cleaning products can cause allergic crisis.

Kolkata has a semi arid climate with high variation between summer and winter. Summers are long, from early April to October, characterized by the monsoon season. Winters are characterized by the presence of a thick fog. Extreme temperatures range from 6 ° C to 42 ° C. The average annual temperature is 25 ° C; monthly average temperatures range from 14 ° C to 33 ° C.

Sunday, January 22, 2017

Kolkata Book Fair

Kolkata Book Fair

The International Book Fair in Kolkata, internationally known by its name of the Calcutta Book Fair is the most prestigious book fair in Asia and takes place every year in January. Access to the exhibition is reserved for professionals, publishers, literary agents, major distributors. Each of the pavilions of the Fair, some of which are organized into two or three superimposed floors is dedicated to a geographic area or commodity specific.

It was founded in 1976 by the association of booksellers Kolkata Publishers' and Booksellers' Guild and is one of the largest book fairs in the world. The city also has a centuries old tradition of book fairs. Hosts 2 million visitors to over 9,000 exhibitors the first figure represents a world record. Each year focuses in particular the production and culture of a country.

The lounge is open to professionals and to the public and the exhibitors large and small publishers and representatives of the publishing industry. As part of the Fair were presented popular books, informative, educational, academic, photographic books, on art , civilization. The event is also relevant because the publishing houses in Calcutta alone produce about three-fifths of the books in the Bengali language printed in the world.

There are stands of private publishing houses and government agencies around the world, and retailers of books, videos, and other media, and in the course of about three weeks that comprise the exhibition there held lectures, readings and other public events, both in Bengali and in English, as well as in other languages.

The stated target of the fair is the average Indian, and the material is subject to the mainstream in the frame of the exhibition there are outdoor activities and performances, such as fireworks.

Over the years, the show has gradually expanded view of their initiatives is chosen for each edition a theme for conferences, meetings and publications are invited editors and writers of a host country every year there are hundreds of conferences, meetings with prominent protagonists of the world of culture, presentations of new publications, educational activities that allow children to approach reading with animations, workshops and theatrical performances.

Friday, January 20, 2017

নলেন গুড়

শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে বাঙালির নলেন গুড়। স্বাদে, গন্ধে মন মাতানো ওই গুড় উৎপাদনের সঙ্গে বংশ পরম্পরায় যুক্ত রয়েছে কয়েকটি পরিবার। প্রাচীনকাল থেকে গুড় উৎপাদনে একই নিয়ম অনুসরণ করে আসছে তারা । খেজুরের গুড় আমাদের গ্রাম বাংলার এক ঐতিহ্য। এখন তা প্রায় হারিয়ে যাবার পথে।
বর্তমানে শহরের বাজারে যে গুড় পাওয়া যায় তা যে একেবারে খাঁটি তা মোটেও নয়। কারন খেজুরের গুড় উতপাদনে বেশ কয়েকটি ধাপ অনুসরন করতে হিয় ।

Nolen Gur Jaggery