জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নীলমণির তৃতীয় পুত্র। তিনি সঙ্গীতজ্ঞ না হলেও তাঁর আমল থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সঙ্গীত চর্চার সূত্রপাত হয়। “বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস”গ্রন্থে বসু বলেছেন, রামলোচনের সময়কাল থেকেই বাঈজি নাচ ও কালোয়াতি গান ভিন্ন অন্য মজলিশি আমোদ ছিল না। রামলোচন সব কবি, কালোয়াতি গান ও বাঈজি আহ্বান করে স্বীয় বাড়িতে মজলিশ করাতেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে শুনাতেন।

তৎকালীন সময়ে রামলোচন কলকাতার বৃহত্তর ধনীসমাজে বৈঠক- সঙ্গীতচর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দ্বারকানাথ পরবর্তীকালে তাঁর পারিবারিক উপযুক্ত উত্তরসূরি সঙ্গীতবাহক হয়েছিলেন। সব রকম উৎসবের অঙ্গ হিসেবে তিনি যে নৃত্য-গীতের আয়োজন করতেন তার বিবরণ পাওয়া যায়।

তবে রামলোচন ঠাকুরের নৃত্য-গীতের মজলিশ ছিল জোড়াসাঁকোর ভবনে আর দ্বারকানাথের সব উৎসব অনুষ্ঠানের স্থান ছিল প্রধানত তাঁর বেলগাছিয়া ভিলা বা বেলগাছিয়া রোডে অবস্থিত সুরুচিতে সুসজ্জিত বাগানবাড়ি। প্রচুর অর্থব্যয়ের সঙ্গে সৌন্দর্য বোধের পরিচায়ক এই সুপ্রশস্ত ভিলায় তিনি ইউরোপীয় ও এ দেশীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের পার্টি দিতেন। তাঁর ক্রমবর্ধমান ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধা ও শ্রীবৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এই ব্যয়বহুল উৎসব। ১৮৪০ সালে বেলগাছিয়া ভিলায় গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের ভগ্নি মিস ইডেন ও অন্যান্য সাহেবদের পার্টিতে বাঈ-নৃত্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৮১৭ খৃষ্টাব্দে গয়ানহাটার ডেভিড হেয়ার, গোরাচাঁদ বসাকের বাড়িতে প্রথম ইংরেজী স্কুল স্থাপন করেন, একই বছর তাঁদের ও জনসাধারণের সহযোগিতায় ২০শে জানুয়ারী কলেজ স্কয়ারে ‘হিন্দু কলেজ’ স্থাপিত হয়। সমগ্র ভারতবর্ষে ইংরেজী শিক্ষার সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা লগ্নে রাজা রামমোহন ও ডেভিড হেয়ার নামক এক স্কটিশ সাহেবকে দ্বারকানাথ সাহায্য করেছিলেন। ১৮২৫খৃষ্টাব্দে কলকাতায় ‘সংস্কৃত কলেজ’ স্থাপিত এবং ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে পাশ্চাত্য পর্যায়ে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার জন্য ‘কলকাতা মেডিকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বারকানাথ এ সব প্রতিষ্ঠানে নানা সহযোগিতা করেছিলেন।



দেবেন্দ্রনাথ, দ্বারকানাথের দ্বিতীয় পুত্র। জীবনের অধিকাংশ সময় প্রবাস বাসী হলেও পরিবারের শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে উৎসাহ ও উচ্চমানের লক্ষ্যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ১৮৪৯সালে জনড্রিঙ্ক ওয়াটারবীটন ও এ দেশীয় কয়েকজন পন্ডিতের সাহায্যে ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ স্থাপন করেন। অতঃপর প্রতিকূল অবস্থার সাথে যুদ্ধ করে রাজা দক্ষিনারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সুকিয়াস্ট্রীটের বাড়ির বৈঠকখানায় প্রথম স্কুল খোলা হয়। ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ খোলার সাথে সাথে শুরু হলো রক্ষণশীলদের প্রহসনমূলক প্রতিবাদী ছড়াঃ

একই সঙ্গে ছাপা হতো বিভিন্ন চমকপ্রদ চিত্তাকর্ষক খবরঃ “বালিকাগণকে বিদ্যালয়ে পাঠাইলে ব্যাভিচার সংঘটনের আশংকা আছে, কেননা বালিকাগণ কামাতুর পুরুষের দৃষ্টিপাতে পড়িলে অসৎ পুরুষেরা তাহাদিগকে বলাৎকার করিবে, অল্পবয়সী বলিয়া ছাড়িয়া দিবে না, কারণ খাদ্য-খাদক সম্পর্ক!”[সমাচার চন্দ্রিকা]।
নীলকণ্ঠ মজুমদারও বললেন, “প্রকৃত বিদ্যাশিক্ষা নারীর পক্ষে অমঙ্গলের কারণ, কেননা ইহার দ্বারা পুত্রপ্রসবেগ যোগিনীর শক্তিগুলির হ্রাস হয়। বিদুষী নারীর বক্ষদেশ সমতল হইয়া যায় এবং তাহাদের স্তনে প্রায়ই স্তন্যের সঞ্চার হয় না”।

সেই কুসংস্কারপূর্ণ অন্ধকার যুগে ঠাকুর পরিবারের অন্তঃপুরে পর্দা প্রথার কঠোরতা থাকলেও নারী শিক্ষার উন্নতির জন্য দেবেন্দ্রনাথের উৎসাহ ও সহযোগিতা ছিল। তিনি তাঁর অষ্টমবর্ষীয় জ্যেষ্ঠকন্যা সৌদামিনীকে ফিমেল স্কুলে পাঠিয়েছিলেন স্থায়ী শিক্ষার জন্য যতটা না তারচেয়েও বেশি দৃষ্টান্তের জন্য। বেথুন স্কুল খোলার লগ্নে তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু হরদেব চট্টোপাধ্যায় উচ্চবর্ণের ব্রাক্ষ্ণণ হওয়া সত্ত্বেও সর্বপ্রথম দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যা নীপময়ী ও প্রফুল্লময়ীকে বেথুন স্কুলে পাঠিয়ে। পরবর্তীকালে এই দুই কন্যার বিবাহ হয় মহর্ষির দুই পুত্র হেমেন্দ্রনাথ ও বীরেন্দ্রনাথের সাথে।