কুমারী পূজার ইতিহাস

মাতৃপূজার প্রচলন পৃথিবীর বিভিন্নভাবে দেখা গেলেও ভারতবর্ষের মতো শক্তির সাধনা আর কোথাও দেখা যায়না। এখানে বহুরূপে শতনামে শক্তির আরাধনা হয়। দুর্গাপূজার সময় কিছু কিছু পূজামণ্ডপে দেবীর কুমারী রূপের পূজার আয়োজন করা হয়। মহাশক্তির বরেণ্য সাধক-সন্তান শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরীজী তাঁর শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা গ্রন্থে নানাভাবে দর্শন করেছেন নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের প্রসূতী ব্রহ্মবিদ্যারূপিণী আদ্যাশক্তি মা’কে।

তাঁর দৃষ্টিতে এই মা ব্রহ্মশক্তি ব্রহ্মময়ী, নির্গুণ ব্রহ্মের অচিন্ত্যগুণ প্রকাশিনী আদ্যাশক্তি সনাতনী, সমগ্র জীব-জগতের আশ্রয় স্বরূপ। নিষ্কলা হয়েও পরমাকলা-পরম ঐশ্বর্য্যময়ী। তাঁর বাণী- আকাশে আকাশবরণী নিত্য প্রকাশ ইনি যে দুহিতর্দিবঃ।। মাগো তুমি যে আকাশেরই মেয়ে! তুমি আকাশ ক্রোড়ে আকাশরাণী।

মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবী মাহাত্ম্য শ্রীশ্রী চণ্ডী নারায়ণীস্ততির পঞ্চদশ শ্লোকে রয়েছে- কোমারী রূপ সংস্থানে নারায়ণী নমোহস্তুুতে।। কুমারী কে? অপাপবিদ্ধা নিত্যশুদ্ধা সৃজনকারিণী ব্রহ্মশক্তি। কুমারী ব্রহ্মরূপিণী স্ত্রীশক্তি। এটির ইংরেজী প্রতিশব্দ নিষ্কল পবিত্র ও অসঙ্গা।

তন্ত্রসারে এক থেকে ষোল বছর পর্যন্ত নারীকে কুমারী বলা হয়েছে। বয়স অনুসারে কুমারীর নামকরণও করা হয়েছে। প্রথম বর্ষের কুমারী সন্ধ্যা, দু’বছরের কন্যার নাম সরস্বতী, তৃতীয় বর্ষে তিনি ত্রিধামূর্তি, চতুর্থ বর্ষে কালিকা, পঞ্চম বর্ষে সুভগা, ষষ্ঠা বর্ষে উমা, সপ্তম বর্ষে মালিনী, আট বছরের মেয়ে কুব্জিকা, নয় বছরে কালসর্ন্দভ‍া, দশম বর্ষে অপরাজিতা, একাদশে রুদ্রাণী, দ্বাদশ বর্ষে ভৈরবী, তের বছরের কুমারী মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছরে পীঠনায়িকা, পনের বছরে তাঁর নাম ক্ষেত্রজা। আর ষোড়শ বর্ষে অম্বিকা। কিন্তু শাস্তের স্পষ্ট নির্দেশ দশ বৎসর বয়স পর্যন্ত কুমারীর পূজা করা উচিত। তার উদ্র্ধে নয়। ‘অত ঊর্ধ্বং ন কর্তব্যং সর্বকার্য্য বিগর্হিতা।’



দেবী ভগবতে কুমারীর নামকরণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে এক বছরের কন্যা পূজার যোগ্য নয়। দু’বছর থেকে দশ বছর পর্যন্ত কুমারীর পূজা হবে। কুমারী প্রসন্ন‍া হলে সাধকদের অভীষ্ট প্রদান করেন। এখ‍ানে বয়স অনুসারে নামকরণও পৃথক। দুই বৎসরের কন্যার নাম কুমারিকা, তিন বছরে ত্রিমূর্তি, চতুর্থ বর্ষীয়া কন্যা কল্যাণী, পঞ্চম বর্ষে রোহিণী, ছয় বছরে কালিকা, সপ্তম বর্ষে চণ্ডিকা, আট বছরের কন্যা সুভদ্রা, নয় বছর পর্যন্ত বয়সের কুমারী পূজার ফলও পৃথক পৃ্থক।

দু’বছরের কুমারীর পূজা দ্বারা দুঃখদারিদ্র ও শত্রুনাশ এবং আয়ু বৃদ্ধি হয়। ধনসম্পদ, ধান্যাগম, ও বংশবৃদ্ধি হয়। কল্যাণীর পূজা সাধককে বিদ্বান, সুখী এবং বিজয়ী করে। রোহিণীর পূজায় ধনেশ্বর্য লাভ। ষষ্ঠ বর্ষীয়া শঙ্করী, দুর্গা বা কালিকার অর্চনায় শত্রুরা মোহিত হয়, দারিদ্র ও শত্রু বিনষ্ট হয়। অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য সুভদ্রার পূজা বিধেয়। তন্ত্রে যে কোন বর্ণ ও জাতির কুমারীকে দেবী জ্ঞানে পূজার কথা বলা হয়েছে। জগৎজননীর অনন্য প্রকাশ এই কুমারীর মধ্যে। মাতৃ্শক্তি ছাড়া এই জগতে কোন প্রাণের সৃষ্টি কী সম্ভব!

প্রণাম করি সেই মহাভয় বিনাশিনীকে, যিনি নিদারুণ দুঃখ থেকে পরিত্রাণ করেন। তিনি পরম করুণাময়ী, যাঁর স্বরূপ ব্রহ্মাদি দেবতারাও জানেন না, যাঁর কোন অন্ত খুজেঁ পাওয়া যায় না। তাই তিনি জন্মরহিতা হলেও জগতের কল্যাণে আত্মপ্রকাশ করেন। সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে তিনিই আছেন। তাই তিনি অদ্বিতীয়া-একা।

লক্ষ্য করার বিষয় যে দুর্গাপূজার জন্য শরৎ ও বসন্ত ঋতুই নির্ধারিত। শরৎকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা শারদীয়া এবং বসন্তকালে দেবী দুর্গাার নাম বাসন্তী পূজা। পুরাণে কথিত আছে যে সূর্যের উত্তরায়ণ দেবতাগণের দিবা এবং দক্ষিণায়নে দেবতাগণের রাত্রি। দক্ষিণায়নে দেবতারা নিদ্রিত থাকেন। শরৎকালে পড়ে দক্ষিণায়নে। এসময় দেবতার জাগরণের জন্য শারদীয়া পূজায় দেবীর বোধন ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করা হয়। বোধণ অর্থ জাগরণ বা নিদ্রা থেকে জাগ্রত করা। অকালে অর্থাৎ নিদ্রাকালে দেবীকে জাগিয়ে তোলা হয় বলে শারদীয়া পূজার নাম অকাল বোধন। বসন্তকালে দেবতারা জাগ্রত থাকেন বলে দেবীর বোধন করতে হয় না।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
sr7themes.eu.org