কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজা

কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো নিয়ে অনেক প্রচলিত গল্প আছে। লক্ষ্মী দেবী ছিলেন ভৃগুর কন্যা, মায়ের নাম খ্যাতি। বৈদিক লক্ষ্মী কিন্তু শস্য-সম্পদের দেবী ছিলেন না।
কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো নিয়ে অনেক প্রচলিত গল্প আছে। লক্ষ্মী দেবী ছিলেন ভৃগুর কন্যা, মায়ের নাম খ্যাতি। বৈদিক লক্ষ্মী কিন্তু শস্য-সম্পদের দেবী ছিলেন না। বরং নদীরূপিনী সরস্বতী শস্যদাত্রী হিসেবে গণ্য হতেন। কেন? নদী পলি মাটি ভরাট করে উর্বর করত ভূ-তট। এর পরে তো বৈদিক আর্যরা চাষাবাদ শিখল নিম্নবর্গ এর কাছে। সম্পদ এলো আর্যদের হাতে। শাসক বা শোষক হলেন তারা। আবার লক্ষ্মীর স্বামী একটা কাঁচা কাজ করে ফেললেন। কেমন কাঁচা? বেদম কাঁচা।

দুর্বাসা মুনি, যিনি শুধু অভিশাপ দেওয়ার জন্যই বিখ্যাত, তার অন্য কোনও গুণের কথা বিশেষ জানা যায় না, তিনি এক দিন একটা পারিজাত ফুলের মালা উপহার দিলেন ইন্দ্রকে। এরপর ইন্দ্র যখন রম্ভা-সম্ভোগে মত্ত, ওই মালা নিজের বাহন ঐরাবতের গলায় ছুড়ে দেন। বিষ্ণু মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা ফেলে দিল মাটিতে।

তারপর পা দিয়ে চেপ্টে দিল। ব্যস! রগচটা স্বভাবের ঋষি অমনি জ্বলে উঠে উচ্চারণ করলেন অভিশাপ। অদ্ভুত সেই অভিশাপ। তিনি বললেন, কী! আমার দেওয়া মালা মাটিতে ফেলে দিলে, তাই তোমার ত্রিলোক এখন লক্ষ্মী ছাড়া হবে। অর্থাৎ লক্ষ্মীর নির্বাসন। অভিশাপে ইন্দ্রের ইন্দ্রপুরী হলো শ্রীহীন। তার রূপে-গুণে আকৃষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত ছলে বলে বিষ্ণু তাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন।

আসলে লক্ষ্মী হলো লৈকিক দেবী। আগে আমাদের সমাজে বিশেষ করে গ্রামে দুর্গাপূজা নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না। বরং কোজাগরী লক্ষ্মীপূজাই ছিল বড় উৎসব। কোজাগরীর রকমফের ছিল দেখার মতো। ছড়া কেটেই মা লক্ষ্মীকে আবাহন করত গৃহস্থ। করজোড়ে বাড়ির নারীরা একসঙ্গে বলতেন, ‘আঁকিলাম পদ দু’টি, তাই মাগো নিই লুটি। দিবারাত পা দু’টি ধরি, বন্দনা করি। আঁকি মাগো আল্পনা, এই পূজা এই বন্দনা।’ সব ছড়ার মধ্যেই থাকে বাসনা, অভিমান এবং আকাঙ্ক্ষা। পেঁচা, কড়ি, ধানের গোলা আঁকার সঙ্গে সঙ্গে তাই ছড়া কাটা হতো।

এই বাংলায় কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর চল কেন হয়েছিল, তার একটি গল্প একটু বলা যাক। অনেক বছর আগে, বাংলার এক রাজা নাকি ঘোষণা করে ছিলেনযে, লক্ষ্মী পুজোর সময়েকোনও শিল্পীর তৈরি মুর্তি অবিক্রিত থাকলেরাজা স্বয়ং সেগুলি কিনে নেবেন। তখন লক্ষ্মী পুজো হত অমাবস্যায়।আর সে দিনই নাকি দেওয়ালি পালন করা হত। সেই সময়, এক শিল্পী, দারিদ্রের প্রতীক, অলক্ষ্মীর একটি প্রতিমা তৈরি করলেন।

সেটিই একমাত্র বিক্রি হল না। রাজা সেই প্রতিমাটি কথামতো কিনে নিয়ে এলেন। লক্ষ্মীর পাশে মন্দিরে সেটিকে প্রতিষ্ঠা করেন। যে ঘরে অলক্ষ্মী থাকেন, সেখানে লক্ষ্মী থাকেন না। রাজা নিজে যখন অলক্ষ্মীকে নিয়ে এসেছেন, লক্ষ্মী চলে গেলেন রাজ্য ছেড়ে। রাজার রাজ্যপাট যেতে বসল।

রাজা তখন ধর্মের শরণাপন্ন হলেন। ধর্ম রাজাকে বললেন, আশ্বিনের পুর্ণিমায় কোজাগরী পুর্ণিমা লক্ষ্মী ব্রত পালন করে লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে আনতে।রাজা সেই মতো ব্রত পালন করে লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে আনলেন।আর অলক্ষ্মীকে ভেঙে রাজ্যের বাইরে ফেলে দিয়ে এলেন। রাজ্য আবার সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা হয়ে উঠল। আর কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর চল ঘরে ঘরে শুরু হল।

লক্ষ্মী পুজোর সময় সরায় আঁকা লক্ষ্মী প্রতিমা আর মা লক্ষ্মীর একটি মৃন্ময়ী মুর্তি কে যেমন ঘরে আনা হয়, তেমনি আনা হয় নানা প্রতীক। কলা গাছের ছাল দিয়ে তৈরি নৌকা, পুরো কলাগাছ দিয়ে তৈরি একটি নারী, ধানের ছড়া, বেতের কুনকে ভর্তি ধান,আরও অনেক কিছু।

লোক সংস্কৃতির গবেষকও গুরুসদয় মিউজিয়ামের কিউরেটর বিজন কুমার মণ্ডল বলেন, “কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর সময় কলাগাছকে উর্বরতার প্রতীক ও নারী হিসাবে ভাবা হয়।ধান আমাদের প্রধান শস্য,তাই ধানকে শস্য শ্যামলার প্রতীক মনে করা হয়। আর সরাকে পৃথিবী হিসাবে কল্পনা করে তাতে নৌকার মত বাঁকা একটি রেখার ওপর ছয় রকমের লক্ষ্মী পট আঁকা হয়। এটা সারা পৃথিবীতে বাণিজ্যের প্রতীক হিসাবে লক্ষী পুজোর সময় ব্যবহার করা হয়, আবার কলা গাছের ছাল দিয়ে তৈরি নৌকাকেও ভাবা হয় বাণিজ্যের প্রতীক।

Kojagari Lakshmi Puja lokkhi

আমাদের রাজ্যের অন্যতম বড় লক্ষ্মী মুর্তি বিক্রির বাজার বসে বেহালায়। গত বছর প্রায় আঠাশ হাজার মুর্তি বিক্রি হয়েছে এখান থেকে। বেহালার পাঠক পাড়ার কাছ থেকে ট্রাম ডিপোর মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে বিক্রেতার সংখ্যা ৬০০ থেকে ৭০০ জন। এ বারে বিক্রেতাদের আশা ঠাকুর বিক্রি ত্রিশ হাজার ছাড়াবে। ব্যবসায়ি সমিতির সম্পাদক অরুন ঘোষ বলেন, “মুর্তির বাজার দর খুব একটা না বাড়লেওতৈরির খরচ বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।”

ঠাকুরের দাম শুরু ৭৫ টাকা থেকে। ছোট থেকে যত বড়র দিকে যাবেন দাম ততই বাড়বে। ছাঁচের ঠাকুরের সর্ব নিম্ন দাম ৭৫ টাকা (৫ ইঞ্চি সাধারণ সাজ), সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকা (কৃষ্ণ নগরের দেড় ফুট মুর্তি)। যদি পিতলের ঠাকুর কিনতে চান, দাম শুরু ২৫০ টাকা থেকে।সর্বোচ্চ দাম সাড়ে আট হাজার টাকা। নতুন ধানের শীষ ও ছড়া শুরু ৬ টাকা থেকে। ডিজাইন অনুযায়ী দামের পরিবর্তন হয়। কলার ছালের নৌকা ১০১ টাকা থেকে শুরু। কলাগাছের বউশুরু ৭৫ টাকা থেকে। পটে আঁকা লক্ষ্মীসরার দাম ১৫০ থেকে শুরু। তবে লক্ষ্মীর আল্পনার পাতার দাম কিন্তু এবার যথেষ্টই বেশি।

মুর্তির দাম কম থেকে বেশি হয় জায়গা বিশেষের তৈরি প্রতিমায়। কম থেকে বেশি- টালিগঞ্জ, কালীঘাট, বেলেঘাটা, বারাসাত, কুমারটুলিও কৃষ্ণনগরের প্রতিমা। সবচেয়ে বেশি চাহিদা কৃষ্ণনগরের ঠাকুরের।এরপর কুমোরটুলিরএবংকালীঘাটের। ঠাকুর নেওয়ার সময় ঠাকুরের চোখটা শুধু দেখুন। এটাই ঠাকুর কেনার মোক্ষম টিপস। খড় মাটির তৈরি প্রতিমা স্থানীয় ভাবে তৈরি হয়। তবে দাম এবারে একটু বেড়েছে। বড় ঠাকুর ৩০০ টাকা।

নাড়ু বা মোয়ার দাম তেমন বাড়েনি, কিন্তু মাপে কমেছে। বাকি সব কিছুতে গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ দাম বেড়েছে। অনেকের এই পুজোতে ইলিশের দরকার হয়। ৫০০ গ্রামের একটু বড় সাইজের ইলিশের দাম ৫৫০ টাকা প্রতি কেজি।

সবজির দাম বেশ চড়া। একটা ছোট ফুল কপি ৩০ টাকা, জলপাই ৭০ টাকা, নতুন আলু ৫০ টাকা থেকে শুরু। ফলের ও ফুলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। সব শেষে আসি পুরোহিতের কথায়। এবছর থেকে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় চালু হয়েছে পুরোহিতদের প্যাকেজ। তবে ব্রাহ্মণ নিয়ে আর চিন্তা নেই।

লক্ষ্মী পুজোর ইভেন্টের পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছেন ওনারা। ঠাকুর থেকে আল্পনা সব প্যাকেজে। আগের দিন সব পৌঁছে যাবে। আর সঠিক সময়ে পুরোহিত হাজির।
মা লক্ষ্মীর আরাধনা করতেই হবে। তাই অত কিছু না ভেবে বাজারে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেই হল। ধান দিয়েছেন যিনি, ধনও দেবেন তিনি। তিনি যে মা ধন লক্ষ্মীও।
Kalyan Panja is a photographer and a travel writer sharing stories and experiences through photographs and words
NextGen Digital... Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...