মালগুডী জংশন

ভারতীয় ঔপন্যাসিক রসিপুরম কৃষ্ণসোয়ামি আয়ার নারায়ণস্বামী-এরজন্ম ১৯০৬ সালে মাদ্রাজে। নারায়ণ ইংরেজিতে লেখালেখি করেছেন। ঔপন্যাসিক গ্রাহাম গ্রিন এটি প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। গ্রাহাম গ্রিনের পরামর্শে তিনি নাম সংক্ষিপ্ত করে আর. কে. নারায়ণও করেছিলেন। আর. কে. নারায়ণের ১৫টি উপন্যাসের ১৪টিরই পটভূমি কাল্পনিক শহর মালগুডি।

নিখুঁত সৌন্দর্যমণ্ডিত,বুদ্ধিদীপ্ত, জীবনঘনিষ্ঠ ও উপলব্ধিজাত তাঁর লেখার বর্ণনা প্রায়শই দক্ষিণ ভারতের গ্রামজীবন ছুঁয়ে যায়। ২০০১ সালে মারা যান আর. কে. নারায়ণ। আর. কে. নারায়ণকে আমেরিকান ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। জুনের এক বিকেলে, যখন মালগুড়ির তাবৎ ছাত্রসমাজের মনে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার রেজাল্ট পাবার উত্তেজনা আলোড়ন তুলছিল, সেই সময়ে ঈশ্বরণ নির্বিকার এবং নির্লিপ্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

ঈশ্বরণ ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের সবার মধ্যে বয়োজেষ্ঠ্য হবার খ্যাতি অর্জন করেছিল। সে অ্যালবার্ট মিশন স্কুলে এসেছিল ঠোঁটের উপর অস্পষ্ট গোঁফের রেখা নিয়ে, একজন তেজী তরুণ হিসেবে। এখনও অবশ্য তাকে সেখানেই দেখা যাচ্ছিল। শুধু তার গঠন হয়ে উঠেছিল আরও বলিষ্ঠ ও পেশিবহুল এবং চিবুকও তামাটে আর দৃঢ় দেখাচ্ছিল। কেউ কেউ এমনকি এ কথাও বলে যে ঈশ্বরণের মাথায় নাকি সাদা চুল দেখা যায়। প্রথমবার সে যখন ফেল করল তখন তার পরিবারের সবাই তাকে সমবেদনা জানালো। দ্বিতীয়বারও সে তাদের সমবেদনা আদায় করে নিতে সক্ষম হল। কিন্তু ধীরে ধীরে তারাও ছিদ্রান্বেষী

আর নাছোড় হয়ে উঠল এবং এক সময় ঈশ্বরণের উপর্যুপরি অকৃতকার্যতায় তার পরীক্ষার উপর থেকে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। ওর বাবা-মা ওকে প্রায়ই বলতেন, “তুই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কাজের কাজ কিছু করতে পারিস না?” আর ঈশ্বরণও প্রতিবার মিনতি করে বলত, “আমাকে এই শেষবারের মত চেষ্টা করতে দাও।” সে গভীর অনুরাগ নিয়ে নাছোড়বান্দার মত বিশ্ববিদ্যালয়েরপড়ার পেছনে লেগে থাকত।

আর এখন পুরো শহর উত্তেজিত রেজাল্টের প্রতীক্ষায়। ছেলেরা দল বেঁধে রাস্তায় ঘুরতে লাগল; সরযুর তীরে ঝাঁক বেঁধে বসে ঘাবড়ে-যাওয়া হাসি হাসতে হাসতে নখ কাঁমড়াতে লাগল। অন্যরা সিনেট হাউসের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্নভাবে সেটার দেয়ালের দিকে–যার পেছনে কোনো মিটিং চলছিল–তাকিয়ে থাকল।
ছেলেদের চেয়ে বেশি না হলেও, বাবা-মায়েদের উত্তেজনা ছিল ছেলেদের মতই। অবশ্য ঈশ্বরণের বাবা- মা ছাড়া। তারা প্রতিবেশীদের মুখে তাদের ছেলের ভবিষ্যৎ ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন্তব্য করলেন, “ঈশ্বরণের জন্য তো আর চিন্তা করার কিছু নাই।

ওর ফলাফল তো বিখ্যাত আর সবারই আগাম জানা আছে।” ঈশ্বরণও ইয়ার্কি করে বলল, “আমি হয়ত এবার পাশ করেছি, বাবা। কে জানে! এইবার তো আমি বেশ ভালভাবেই পড়েছিলাম।” “এই মুহূর্তে গোটা ইন্ডিয়ার সবচেয়ে আশাবাদী মানুষটা তুই ই। এই একগুঁয়ে আশাটা না থাকলে নিশ্চয়ই তুই ফি বছর একই পরীক্ষা দিতি না।” “আমি তো গত বছর কেবল লজিকে ফেল করেছি, তাও অল্পের জন্য”, সে নিজের সাফাই গাইল।



একথায় তার পুরো পরিবার হেসে উঠল। “যাই হোক, তুই বাইরে গিয়ে অন্য ছেলেদের সাথে রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করছিস না কেন?” ওর মা জিজ্ঞেস করলেন। “কোনো দরকার নাই” ঈশ্বরণ বলল, “আমি যদি পাশ করি তাহলে সেই খবর ওরা ঘরেই নিয়ে আসবে। তোমার কি মনে হয়, আমি গত বছর আমার রেজাল্ট দেখেছিলাম? আমি সময় কাটাচ্ছিলাম একটা সিনেমায় বসে। পর পর দুইটা শো দেখেছিলাম আমি।”

বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হবার আগে সে গুন গুন করতে করতে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য ভেতরে গেল। সে খুব যত্ন নিয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল, কারণ সে জানত যে বারবার ফেল করার জন্য সবাই তাকে অনেকটা ব্রাত্য হিসেবেই গণ্য করে। সে জানত যে তার পিঠপিছে তার পুরো পরিবার এবং পুরো শহর তাকে উপহাস করছিল। তার মনে হল যেন সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল যে এই হাত-মুখ ধোয়া, চুল আঁচড়ানো কিংবা ইস্ত্রি করা জামা গায়ে দেয়া–এগুলো তার অবস্থার তুলনায় একটু বেশিই বিলাসবহুল। সে ব্যর্থ এবং এই বিলাসিতা উপভোগের কোনো অধিকার তার নেই।

তার সাথে সবাই এমনভাবে ব্যবহার করত যেন সে কোনো মোটা চামড়ার গাধা। সে কখনও এসব পাত্তা দিত না। বরং তাদের ব্যবহারের জবাবে এমনভাবে আচরণ করত যেন সেও একজন খুব হিংস্র দুর্বৃত্ত। কিন্তু এসব ছিল কেবলই মুখোশ। এর পেছনে ছিল এমন এক প্রাণী যে ব্যর্থতার ঘায়ে পুরোপুরি বিপর্যস্ত ছিল। যেদিন রেজাল্ট দেবার কথা, সেদিন ভেতরে ভেতরে সে উৎকণ্ঠায় কাঁপছিল। “মা”, সে বলল, “আজকে রাতে আমি বাসায় খাব না। আমি কোনো একটা হোটেলে কিছু খেয়ে নিব আর প্যালেস টকিস-এর দুটো শোই দেখব।

ঈশ্বরণ চার-আনা ক্লাসের পেছনের দিকের কোণার একটা সিটে বসল। সে চারিদিকে তাকাল: পুরো থিয়েটারে আর একটা ছাত্রও নেই। শহরের সব ছাত্ররা ছিল সিনেট হাউসের পাশে, রেজাল্টের জন্যে অপেক্ষারত। পুরো থিয়েটারে একমাত্র ছাত্র হওয়ায় ঈশ্বরণের খুব খারাপ লাগল। নিজের প্রতি রীতিমত বিতৃষ্ণা হতে লাগল তার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতি বন্ধ হয়ে গেল আর শো শুরু হল। চেনা সব দেবতাদের নিয়ে একটি তামিল ছবি। শীঘ্রই সে নিজেকে দেব-দেবীদের রাজনীতি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে হারিয়ে ফেলল। এক স্বর্গীয় জগতের দৃশ্য, যা কোনো পরিচালক দেখানোর জন্য বেছে নিয়েছিলেন, দেখে সে মোহাবিষ্ট হয়ে বসে রইল। অবশ্য এই বিস্মৃতির আনন্দ মাত্র আধঘণ্টা স্থায়ী হল। এর পরই ছবির নায়িকা স্বর্গের একটা গাছের নিচু এক ডালে উঠে বসলেন এবং সেই জায়গা থেকে আর সরার নামই নিলেন না। তিনি আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সেখানে বসে গান গাইতে লাগলেন। এই অংশটা ঈশ্বরণকে ক্লান্ত করে দিল। আর তখনই ফিরে এল তার পুরানো সব বেদনা ও হতাশা । “ওহ্, ভদ্রমহিলা,” ঈশ্বরণ আবেদন করল, “আমার দুঃখ-দুর্দশা আর না বাড়িয়ে দয়া করে সরে যান।”

ঈশ্বরণের অনুরোধ শুনেই যেন বা তিনি সরে গেলেন আর উজ্জ্বলতর ঘটনা তার অনুগামী হল। যুদ্ধ, মহাপ্লাবন, মেঘের দেশ থেকে একজন হঠকারীকে ফেলে দেওয়া, কারও সমুদ্র থেকে উঠে আসা, আগুনের বৃষ্টি, পুষ্পবৃষ্টি, মানুষের মৃত্যু, মানুষের কবর থেকে উঠে আসা–এমন অনেক কিছুই ঘটল। তামাকের ধোঁয়ার আচ্ছাদনের পেছনে থাকা সাদা পর্দায় এমন অনেক রোমাঞ্চকর দৃশ্যের অবতারণা হল। পর্দায় থেকে থেকে দেখানো লাগাতার বকবকানি, সঙ্গীত আর চিৎকার, সোডা বিক্রয়রত ফেরিওয়ালাদের হাঁক, দর্শকদের অসংযত মন্তব্য–এইসব হইচই আর উত্তেজনা কয়েক ঘণ্টার জন্য ঈশ্বরণকে সিনেট হাউস আর তার ছাত্রজীবনকে ভুলে থাকতে সাহায্য করল।

শো শেষ হল রাত দশটায়। রাতের শো-এর অপেক্ষায় অনেকেই গেটের সামনে ভিড় করে ছিল। ঈশ্বরণ প্যালেস টকিস-এর উল্টোদিকের একটা রেস্টুরেন্ট ’আনন্দ ভবন’-এর দিকে হাঁটতে লাগল। দোকানের মালিক বোম্বের অমায়িক ভদ্রলোকটি, যিনি কিনা ঈশ্বরণের বন্ধুও ছিলেন, হাঁক দিলেন, “ঈশ্বর সাহেব, রেজাল্ট তো আজকে জানানো হল।

ঈশ্বরণ আবার একটা টিকেট কিনল আর ছবি দেখতে গেল। আরেকবার তার সামনে দেবতাদের শত্র“তা, বিবাদ আর ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটল। সে আবার সেসবের মাঝে ডুবে গেল। যখন সে পর্দায় দেখল তার বয়েসী কিছু ছেলে দূরের কোনো স্বর্গের জলে গান গাইতে গাইতে খেলছে, সে বলল, “তোমরা তো এমন করতেই পারো। তোমরা যেখানে আছ সেখানে নিশ্চয়ই কোনো পরীক্ষা নেই…” আর সেই জগতের অংশ হবার আকাক্সক্ষা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
এরপর নায়িকা আবার গাছের ডালে বসে গান গাইতে শুরু করলেন আর ঈশ্বরণও ছবির উপর থেকে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।

প্রথমবারের মত সে চারিদিক দেখল। আধো-অন্ধকারেও সে লক্ষ্য করল, ছেলেদের বেশ কয়েকটা দল হলে আছে–আনন্দিত দল। সে জানত, ওরা সবাই নিশ্চয়ই নিজেদের রেজাল্ট দেখেছে আর এখন এসেছে নিজেদের সাফল্য উদযাপন করতে। সেখানে অন্তত পঞ্চাশজন ছেলে ছিল। সে জানত, ওরা সবই নিঃসন্দেহে খুব সুখি আর আনন্দিত, ঠোঁট লাল করে রেখেছে পান চিবিয়ে। সে জানত, আলো জ্বলে উঠবার সাথে সাথেই সে হবে ওদের সবার মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু।

ওরা সবই ওকে ওর রেজাল্ট নিয়ে জ্বালাতন করা শুরু করবে–আবার শুরু হবে সেই পুরানো একঘেয়ে ঠাট্টা আর ওর বেপরোয়া হবার ক্লান্তিকর অভিনয়। পুরো ব্যাপারটার উপরই সে বিরক্ত হয়ে উঠল। এই সফল মানুষগুলোর হাসিখুশি চেহারা আর তাদের কটাক্ষ–এসবের কিছুই আর সহ্য করার শক্তি নেই তার। সে নিশ্চিত ছিল যে তারা সবাই তার দিকে এমনভাবে তাকাবে যে এই দিনে ওর ছবির মাঝে আনন্দ খুঁজে বেড়ানোর কোনও কারণ নেই।

ঈশ্বরণ হলের আরও বেশি অন্ধকার একটা কোণের দিকে সরে আসল। সে পর্দার দিকে তাকাল–তাকে আনন্দ দেবার মত কিছুই সেখানে নেই: নায়িকা এখনও বসে আছে আর সে জানত যে নিঃসন্দেহে আগামী বিশ মিনিট ধরে সে সেখানেই বসে তার ‘মাস্টারপিস’টি গাইতে থাকবে… ঈশ্বরণ হতাশ হয়ে গেল। সে উঠে দাঁড়ালো, নিঃশব্দে একধার দিয়ে দরজার দিকে যেতে লাগল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসল। সেই কৃতকার্য ছেলেগুলোকে দেখে তার নিজের প্রতিই ঘৃণা জন্মালো। “আমি বাঁচার উপযুক্ত না। যে একটা পরীক্ষাও পাশ করতে পারে না…” হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল–তার সকল সমস্যার চমৎকার সমাধান–মারা যাওয়া এবং এমন এক জগতে যাওয়া যেখানের ছেলেরা পরীক্ষা থেকে মুক্ত, যারা স্বর্গোদ্যানেরপদ্মপুকুরে খেলে বেড়ায়।

কোনো ঝামেলা নাই, বছরের পর বছর নিরাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকার জন্য কোনো জঘন্য সিনেট হাউস নেই। এই সমাধান হঠাৎ তাকে কেমন এক মুক্তির অনুভূতি এনে দিল। তার নিজেকে খুব হালকা লাগছিল। সে হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। হোটেলের লোকটি তখন সব বন্ধ করে ঘুমাতে যাচ্ছিল। “শেঠজি”, ঈশ্বরণ বলল, “এই সময়ে আপনাকে জ্বালাতন করার জন্য মাফ করে দেন। আমাকে একটু কাগজ আর একটা পেন্সিল দিতে পারবেন? আমার জরুরি একটা জিনিস লিখতে হবে।” “এত রাতে…” লোকটি বলতে বলতে ওকে এক টুকরো কাগজ আর একটা ক্ষয়ে যাওয়া পেন্সিল এনে দিল। ঈশ্বরণ ওর বাবার জন্য একটা বার্তা লিখে খুব সতর্কভাবে কাগজটা ভাঁজ করে নিজের কোটের পকেটে রেখে দিল।

পেন্সিলটা ফেরত দিয়ে সে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলো। সে মাত্র রেসকোর্স রোডের নাগাল পেল, তারপর ডানে গেলেই আছে আঁকাবাঁকা মার্কেট রোড, তারপর আছে এলামেন স্ট্রিট আর তারপর সরযু। সরযু… যার কালো পাঁক-খাওয়া জল ওর সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটাবে। “আমাকে এই চিঠিটা কোটের পকেটে রাখতে হবে আর মনে করে কোটটা নদীর তীরে রেখে যেতে হবে”, সে নিজেকে বলল।

সে শীঘ্রই এলামেন স্ট্রিট পার হয়ে আসল। তার পা নদীতীরের বালি চষে বেড়াতে লাগল। নদীর পাশে ধাপগুলোর কাছে এসে সে চটপট তার কোটটা খুলে নেমে যেতে লাগল। “ঈশ্বর”, হাতজোড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করতে লাগল, “দশ বারের চেষ্টায়ও যদি আমি একটা পরীক্ষা পাশ না করতে পারি, তাহলে আমার এই পৃথিবীর অপমান বাড়িয়ে বেঁচে থাকার দরকার কী?” ওর পা তখন পানিতে ডোবানো ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে ইউনিভার্সিটির দালানগুলোর দিকে তাকাল। সিনেট হাউসের বারান্দায় তখনো আলো জ্বলছিল। প্রায় মাঝরাত হয়ে আসছে–এখান থেকে সেখানে হেঁটে যেতে মিনিট পনের লাগবে। এখন যেয়ে শেষবারের মত নোটিশবোর্ডটা দেখে আসলে কেমন হয়? সে তো মারাই যাচ্ছে। সে কেন বোর্ডটা এড়িয়ে যাবে আর কেনই বা সেটার সামনে যেতে ভয়ে কাঁপবে?

সে পানি থেকে বেরিয়ে ধাপ বেয়ে উঠতে লাগল। কোটটা পেছনে ফেলে রেখেই সে বালুর মধ্য দিয়ে হাঁটতে লাগল। মাথার উপর তারা জ্বলছিল। কোথাও ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দ, নদীর জলের অস্পষ্ট ঝির ঝির শব্দ আর তীরের ঝোপগুলো থেকে রাতে শুনতে পাওয়া যায় এমন নানান শব্দ ভেসে আসছিল। ঈশ্বরণের ভেজা, ধুলো-ঢাকা পা ছুঁয়ে বাতাস বয়ে গেল। দোদুল্যমান মন নিয়ে সে সিনেট হাউসের বারান্দায় এসে ঢুকল। “আমার এখানে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই”, সে অস্পষ্টস্বরে বলল। সিনেট হাউস তখন ছিল একেবারেই জনশূন্য, একটা শব্দও শোনা যাচ্ছিল না। পুরো দালানটাই ছিল অন্ধকার, কেবল নিচের সিঁড়িকোঠা ছাড়া–সেখানে বড় একটা বাতি জ্বলছিল। আর দেয়ালে ঝুলছিল নোটিশবোর্ড।

ওর বুক ধড়ফড় করছিল যখন ও পা টিপে টিপে রেজাল্ট দেখতে এগুচ্ছিল। বাল্বের আলোয় সে সতর্কভাবে নাম্বারগুলো দেখতে লাগল। ওর গলা শুকিয়ে আসছিল। থার্ডক্লাসে যারা পাশ করেছে সে তাদের রোল নাম্বারগুলো দেখল। ওর নাম্বার ছিল ৫০১। তার আগের নাম্বারগুলোর মধ্য থেকে পাশ করা একজনের নাম্বার ৪৯৮, আর পরেরগুলো থেকে ৭০৩। “তাহলে আমার দুপাশের বন্ধুরাই এখানে আছে”, অনেকটা জোর করেই সে গলায় উচ্ছ্বাস নিয়ে এলো।

সিনেট হাউসে আসবার সময় তার মনে এই আশা উঁকি দিচ্ছিল যে হয়ত তার নাম্বারটা কৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের সারিতে থাকবে। সে অনুমান করেছিল এরপর তার অনুভূতি কী হত… সে তক্ষুনি ছুটে বাড়ি যেত আর সবাইকে বলত তাদের টিটকারিগুলো ফিরিয়ে নিয়ে ক্ষমা চাইতে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ যাবত নোটিশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকবার পর তার উপর অকৃতকার্যতার কঠোর ছায়া নেমে আসল: তার নাম্বার কোথাও ছিল না। “সরযু…”, সে বলল।

তার নিজেকে এমন এক নিরুপায় আসামীর মত মনে হচ্ছিল যাকে অপ্রত্যাশিতভাবেমুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু ভুল করে। “সরযু”, ঈশ্বরণ বলল, “আমি যাচ্ছি সরযুতে” সে যেন নোটিশবোর্ডটাকেইএ কথা বলে কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল। “কয়জন অনার্স পেল তা তো দেখা হল না।” সে আবার নোটিশবোর্ড দেখতে গেল। সে উপরের দিকের কলামগুলোতে চোখ বুলাল। আশ্চর্যজনকভাবে এক নাম্বার রোলওয়ালা এক ছেলে ফার্স্টক্লাস পেয়েছে, সঙ্গে আরও ছয়জন। “কীভাবে যে এরা ফার্স্টক্লাস পেল কে জানে”, ঈশ্বরণ প্রশংসার সুরে বলে। ওর চোখ সেকেন্ড ক্লাসের দিকে গেল– ৯৮ দিয়ে শুরু করে দুই লাইনেই নাম্বারগুলো লেখা। প্রায় পনেরজনের নাম্বার ছিল। পরের নাম্বারটিতে যাবার আগে সে প্রতিটা নাম্বার মনযোগ দিয়ে দেখছিল। সে ৩৫০-এ এসে থামল। তারপর ৪০০, তারপর ৫০১ আর তারপর ৬০০।

“পাঁচ-শূন্য-এক সেকেন্ড ক্লাসে! এটাও কি সত্যি হতে পারে?” সে চিৎকার করে উঠল। সে বারবার নাম্বারটা দেখতে লাগল। হ্যাঁ, নাম্বারটা সেখানেই ছিল। ঈশ্বরণ সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে। “এটা যদি সত্যি হয় তাহলে সামনের মাসে আমি বি,এ ক্লাসে থাকব!” সে চেঁচিয়ে উঠল। নীরব দালানগুলোর মাঝে তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনি তুলল। “ছাল ছাড়িয়ে ফেলব তার এরপর থেকে যে আমাকে বোকা বলবে”, সে ঘোষণা করল। ওর মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। এত বছরের খাটুনি আর উৎকণ্ঠা হঠাৎ শিথিল হয়ে গেল। এই শৈথিল্যের চাপ সহ্য করতে ওর কষ্টই হচ্ছিল। ওর শিরা-উপশিরা দিয়ে রক্ত দ্রুতবেগে ছুটে এসে মাথায় যেন ধাক্কা দিয়ে যেতে লাগল। ও অনেকটা জোর করেই নিজেকে শান্ত করল। তারপর গুন গুন করে আপনমনেই একটা সুর ভাঁজতে লাগল।

ওর মনে হচ্ছিল যে ও পৃথিবীর একমাত্র বাসিন্দা, এবং এর একচ্ছত্র অধিপতি। ও বুক চাপড়ে নোটিশবোর্ডকে উদ্দেশ্য করে বলল, “জানো, আমি কে?” কোনো এক কাল্পনিক গোঁফে তা দিতে দিতে ও আপনমনে হেসে বলল, “ঘোড়া কি তৈরি হয়েছে, সহিস?”, সে নোটিশবোর্ডটার দিকে এমন এক বাঁকা চাহনি দিল যেন সেটা খুব তুচ্ছ আর তারপর রাজার মত গটগটিয়ে হেঁটে চলে গেল। বারান্দার শেষ সিঁড়িটাতে দাঁড়িয়ে সে তার ঘোড়াটাকে খুঁজতে লাগল।

সে মিনিটখানিক অপেক্ষা করেই কাউকে যেন হুকুম করল, “ঘোড়াটাকে কাছে আন, নির্বোধ। কথা কানে যায় না?” ঘোড়াটাকে কাছে আনা হল। সে এমন ভঙ্গি করল যেন সে ঘোড়ায় চড়ছে। তারপর সে রাগের চোটে ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারল। তার কণ্ঠ অন্ধকার নদীতীর জুড়ে প্রতিধ্বনি তুলল–সে শব্দ ঘোড়াকেও ছুটতে প্ররোচিত করল। সে হাত দুটো ছড়িয়ে তীর ধরে ছুটতে লাগল, যতটুকু সম্ভব নিজের গলা চড়িয়ে বলল, “সবাই সরে যাও, রাজা আসছেন। যে এই পথে আসবে তাকে পিষে ফেলা হবে…।”

“আমার পাঁচশ’ একটা ঘোড়া আছে”, সে যেন রাতকে উদ্দেশ্য করেই বলল। নাম্বারটা তার মনে গেঁথে ছিল আর বারবার উঠে আসতে লাগল। সে পুরো তীর ধরেই দৌড়ে বেড়াতে লাগল, বারবার। কিন্তু তাতেও তাকে সন্তুষ্ট মনে হল না। “প্রধানমন্ত্রী”, সে বলল, “এই ঘোড়াটা ভাল না। আমাকে আরও যে পাঁচশ’ একটা ঘোড়া আছে সেগুলো এনে দাও–সবগুলো সেকেন্ড ক্লাসে আছে।” সে যে ঘোড়াটায় চড়ছিল সেটাকে একটা লাথি দিয়ে নেমে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই তাকে আরেকটা ঘোড়া এনে দিল। সে গাম্ভীর্য নিয়ে কাল্পনিক সেই ঘোড়াটায় উঠে বসল আর বলল “এই ঘোড়াটা আরও ভাল।”

তারপর সে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেড়াতে লাগল। দৃশ্যটা ছিল খুবই অদ্ভুত। তারার ক্ষীণ আলোতে, এত রাতে একলা সে মুখ দিয়ে ঘোড়ার খুরের ট্যাপ-ট্যাপ শব্দ অনুকরণ করে যাচ্ছিল। এক হাত লাগাম টেনে ধরার মত ঝুলিয়ে রেখে অন্য হাত দিয়ে সে তার গোঁফে তা দিচ্ছিল। সে ঘোড়াটাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাগাদা দিচ্ছিল যতক্ষণ না সেটা ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করে। বাতাসের মাঝ দিয়ে ছুটে চলার সময় তার নিজেকে মনে হচ্ছিল দিগি¦জয়ী বীর।

কিছুক্ষণের মধ্যে সে পুরো বালুরাশি পার হয়ে আসল। জলের একদম কিনারে এসে সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল, তারপর তার ঘোড়াকে বলল, “তুমি কি পানি ভয় পাও নাকি? তোমাকে সাঁতরে পার হতেই হবে। নাহলে কক্ষণও আমি তোমার জন্য পাঁচশ’ এক রুপি খরচ করব না।” তখন তার মনে হল ঘোড়াটা যেন একটা লাফ দিল।

পরদিন দুপুরে নদীতীর থেকে সিকিমাইল দূরে ঈশ্বরণের দেহ ভেসে উঠল। ইতোমধ্যেই কয়েকজন মিলে তীরে ফেলে যাওয়া ওর কোটটা তুলে নিয়েছিল আর সেটার ভেতরের পকেটে এক টুকরো কাগজ আবিষ্কার করেছিল যাতে লেখা ছিল– “প্রিয় বাবা, তুমি যখন এই চিঠিটা পাবে ততক্ষণে আমি সরযুর তলায় থাকব। আমি বাঁচতে চাই না। আমাকে নিয়ে ভেবো না। তোমার তো আরও ছেলে আছে যারা আমার মত গর্দভ না…।”