বাসন্তী পূজার ইতিহাস

মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে বাসন্তী পূজার দুর্গাদেবী দুর্গাপূজার আখ্যায়িকাটি নিম্নরূপ— সত্য যুগে দ্বিতীয় মনু স্বরোচিষের অধিকারকালে সুরথ চন্দ্রবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সসাগরা পৃথিবীর রাজা হয়েছিলেন। কিন্তু কাল বশে তিনি শত্রুগণ কর্তৃক পরাজিত হয়ে রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে মনের দুঃখে এক গভীর বনে প্রবেশ করে বিপ্র শ্রেষ্ঠ মেধস মুনির আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।

আশ্রমে থেকে মুকুটহীন রাজা সুরথ মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন, তাঁর কুচক্রী কর্মচারীরা তাঁর পরিত্যক্ত রাজপুরী ধর্মানুসারে পালন করছে কি? তাঁর অতুল ধনভান্ডার ইতিমধ্যে নিঃশেষ করে ফেলেছে কি না—এ রকম চিন্তা রাজা সুরথকে নিয়তই দহন করতে লাগল। এ রকম চিন্তা সম্পর্কে হিতোপদেশে বলা আছে:

‘চিন্তা চিতয়ো তুভেদ: বিন্দু মাত্রিণ বিদ্যতে চিতা দহতি নির্জীবং চিন্তা দহতে জীবিতম।’ চিন্তাপীড়িত রাজা সুরথ একদিন বনাঞ্চলে পথ চলতে চলতে সমাধি নামের এক বৈশ্যের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। সেই বৈশ্যও অসাধু ছেলে ও আত্মীয়দের চক্রান্তে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন।

কিন্তু সেই বৈশ্য সর্বদা কুলাঙ্গার ছেলে ও আত্মীয়দের কুশল জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। রাজা সুরথ বৈশ্যকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘যে পুত্র ও আত্মীয়গণ ধনলোভে আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল, তাদের প্রতি আপনার চিত্ত স্নেহপরায়ণ হচ্ছে কেন?’ বৈশ্য উত্তরে বলেন, ‘হে রাজন, আমি বুঝেও বুঝি না, কেন বিমুখ পুত্র ও আত্মীয়গণের প্রতি আমার মন স্নেহাসক্ত হচ্ছে।’

সমাধি বৈশ্যের জিজ্ঞাসায় রাজা সুরথ একই মনোভাব ব্যক্ত করেন। অতঃপর রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি উভয়েই শান্তি লাভের আশায় মেধস মুনির কাছে এসে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করেন: ‘আমি ও বৈশ্য উভয়েই ধনলোভী নিষ্ঠুর স্বজনগণ ও ভৃত্যগণ কর্তৃক বিতাড়িত হয়েও আমাদের মন তাদের প্রতি স্নেহাসক্ত হচ্ছে কেন? বিষয়ে দোষ দেখেও সেই বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আমরা দুজনেই অত্যন্ত দুঃখ পাচ্ছি। হে মুনিশ্রেষ্ঠ! এর হেতু কী? আমাদের শক্তি লাভের পথ কী?’

আর্ত ও জিজ্ঞাসু রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধিকে সান্ত্বনা দিয়ে মেধস মুনি তাঁদের কাছে জগতের সব বিষয়ের অসারতা সম্বন্ধে উপদেশ দেন এবং দেবী আদ্যাশক্তির মহিমা কীর্তন করে বলেন, ‘তামুপৈছি মহারাজ শরণং পরমেশ্বরীম।

হে মহারাজ, তুমি সেই পরমেশ্বরীর শরণাপন্ন হও। তাঁকে ভক্তিপূর্বক আরাধনা করলে তিনিই ইহলোকে অভ্যুদয় এবং পরলোকে স্বর্গসুখ ও মুক্তি প্রদান করবেন।



মেধস মুনির উপদেশে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি শ্রীশ্রীচণ্ডীস্বরূপা দুর্গাদেবীকে দর্শন এবং সকল প্রকার ভোগান্তি থেকে মুক্ত হতে বন মধ্যস্থিত নদীর তীরে দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ে তিন বছরকাল উপবাস থেকে তন্মস্ক হয়ে ফুল-ফল, ধূপ-দীপ ও অগ্নি (হোম) দিয়ে দেবীর পূজা সাঙ্গ করলে দেবী দুর্গা-চণ্ডীকা সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের বর প্রদান করেন।

‘হে নরপতি, অতি অল্পদিনের মধ্যেই তুমি শত্রু নাশ করে নিজ রাজ্য পুনরায় লাভ করবে এবং মৃত্যুর পর তুমি পুনরায় সূর্যপত্নী সবর্ণার গর্ভে জন্মলাভ করে পৃথিবীতে সাবনি নামে অষ্টম মনু হবে। হে বৈশ্য শ্রেষ্ঠ, তুমি মুক্তিপ্রদ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করবে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদী তীরবর্তী মেধসাশ্রমে শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা সমাপন করে দেবী প্রতিমা নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এখানে প্রশ্ন, বন মধ্যস্থিত মেধস মুনির আশ্রমটি কোন দেশের কোন স্থানে?

মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১ থেকে ৯৩ অধ্যায় পর্যন্ত ত্রয়োদশ অধ্যায়ের নামই চণ্ডী। চণ্ডীশাস্ত্রকে তন্ত্রশাস্ত্রের মধ্যমণি বলা হয়েছে। শক্তি মঙ্গল তন্ত্রানুসারে সুদূর অতীতে বিন্ধ্যাচল থেকে বাংলাদেশের চট্টলভূমি পর্যন্ত প্রদেশ বিষ্ণুক্রান্তা নামে বিখ্যাত ছিল। এই ক্রান্তায় সর্বমোট ৬৪ খানি তন্ত্র প্রচলিত ছিল। পাল রাজাদের সময়ে সমগ্র বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) তন্ত্রের বিপুল প্রভাব ছিল। তন্ত্রে উল্লেখ আছে, ‘গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা’ গৌড়ে তন্ত্রবিদ্যায় উদ্ভব হয়।

পরে এই তন্ত্রবিদ্যা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ‘গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা’ এ বাক্যটিই ইঙ্গিত করে, শ্রীশ্রীচণ্ডীর উৎপত্তি স্থান আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে। আবার দেখা যায়, দেবীর একান্ন পীঠের অধিকসংখ্যক পীঠ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে পড়েছে। সংখ্যার দিক দিয়ে মোট আটটি দেবীপীঠ বাংলাদেশে অবস্থিত। তন্মধ্যে দুটি পীঠ চট্টলভূমিতে।

অতীতে বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূভাগ দীর্ঘকাল জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। এসব জঙ্গলের আদিম অধিবাসীদের ‘কিরাত’ বা শবর বলা হতো। কাদম্বরী, হরিবংশ, দশ কুমার চরিত, ভবিষোত্তর পুরাণ, কালিকা পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থের অভিমত এই যে শ্রীশ্রীচণ্ডী বর্ণিত দেবী দুর্গা ‘কিরাত’ বা শবরগণেরই উপাস্য দেবী ছিলেন। সুতরাং কিরাত দেশ তথা বাংলাদেশেই চণ্ডী দুর্গার আবির্ভাবস্থলরূপে বিবেচিত হয়।

উল্লিখিত মতের অনুকূলে আরেকটি যুক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে, শ্রীশ্রীচণ্ডীর ত্রয়োদশ অধ্যায়ের দশম শ্লোকে বলা আছে:

‘সচ বৈশ্যস্তপস্তেপে দেবী সূক্তং পরং জপন। তৌতস্মিন পুলিনে দেব্যাঃ কৃত্তা মূর্তিং মহীময়ীম্।’

রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য জন্মাতর সম্যক দর্শন মানসে নদীতীরে অবস্থানপূর্বক শ্রীশ্রীদুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যাদি দ্বারা দেবীর পূজা করলেন।

‘মহীময়ী’ মূর্তির মাধ্যমে পূজার প্রচলন বাংলাদেশেই আছে। ভারতের অন্য কোনো প্রদেশে মৃন্ময়ী প্রতিমায় দুর্গাপূজার প্রচলন নেই। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের মতে, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদীর তীরবর্তী মেধসাশ্রমে শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা সমাপনান্তে দেবী প্রতিমা নদী (বেতসা) গর্ভে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এই বিধি মতে, বাংলাদেশের সর্বত্র দশমীর দিনে বিজয়া উৎসব পালনের মাধ্যমে ঘটা করে শ্রীশ্রীদুর্গা প্রতিমা নদীতে বা কোনো জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। আবার কামাখ্যাতন্ত্রের ৩৫তম পটলে মেধসাশ্রমের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে বলা আছে, ‘কর্ণফুলীং সমারভ্য যাবদ্ধক্ষিণে সাগরম। পুণ্যক্ষেত্রামিদং প্রোক্তং মুনিগণ সেবিতম। তত্রাস্তি বেতসানাম্রী দিব্যাপুণ্য তোয়ানদী। তত্রেবামীন্মুনি শ্রেষ্ঠ মেধসঃ ঋষিরাশ্রম।’