জুতার ইতিহাস

আমাদের নিত্য ব্যবহার্য একটি বিশেষ উপকরণ হচ্ছে জুতা। ক্ষতিকারক জিনিস হতে পাকে নিরাপদ রাখতে আমরা জুতা ব্যবহার করি। জুতা ব্যবহারের ইতিহাস খুব বেশি নতুন নয়। একসময় মানুষ জুতা ব্যবহার করত না। খালি পায়ে হাঁটাচলা করত। মানুষের প্রয়োজনে আবিষ্কার হলেও বর্তমানে জুতা একটি ফ্যাশন। কালের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমানে হরেক রকম জুতা দেখতে পাওয়া যায়। জুতাকে বিভিন্ন নামে ডাকাও হয়।

যেমন- স্যান্ডেল, চটি, স্যু, চপ্পল, ফুটওয়ার, ফুটকেয়ার ইত্যাদি। জুতার আগমন কিভাবে ঘটেছে আমরা হয়তো অনেকেই তা জানি না। ১৭০০ শতকের দিকে কাঠের তৈরি খড়ম ভারতীয় উপমহাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতায় কল্পনা মিশিয়ে ‘জুতা আবিষ্কার’ কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন পথ হাঁটতে গিয়ে ধুলার অত্যাচারে রাজা হবুচন্দ্র ভীষণ অস্থির।

একদিন মন্ত্রী গবুকে ডেকে বললেন, তোমরা এমন এক উপায় বের কর, যাতে হাঁটতে গিয়ে পায়ে আর ধুলা না লাগে। এ কথা শুনে মন্ত্রী, পণ্ডিত সবাই অস্থির। অবশেষে এক চর্মকার চামড়া দিয়ে রাজার পাদুকা তৈরি করে মন্ত্রী, পণ্ডিতসহ পারিষদবর্গকে রক্ষা করল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ কল্পনায় মজার হলেও জুতা আবিষ্কারের প্রকৃত কাহিনী নয়। জুতার ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি আবিষ্কারের ইতিহাস অত্যন্ত লম্বা।

প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগেই মানুষ পথঘাট পাড়ি দেয়ার জন্য জুতার ব্যবহার শুরু করেছিল। তবে প্রথমে কী কারণে জুতা তৈরি হয়েছিল তা এখনো উদ্ধার করতে পারেননি গবেষকরা। পূর্ণাঙ্গ জুতা ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া গেছে বছর খানেক আগে। জুতা গবেষকরা জানিয়েছেন, ৫ হাজার ৫০০ খ্রিস্টপূর্বে পূর্ণাঙ্গ জুতা তৈরি হয়। আর্মেনিয়ার এরিনিয়া-১ নামক গুহায় ইতিহাসখ্যাত ওই জুতার সন্ধান পাওয়া গেছে। জুতা আবিষ্কারের প্রথম দিকে দুই পায়ের জুতা এবং নারী-পুরুষের জুতা একই ধরনের ছিল।



এই জুতা তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৬ থেকে ১২ শতকের দিকে। ধারণা করা হয় বিশ্বের প্রথম জুতা তৈরি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। গবেষকদের কেউ কেউ বলেছেন, প্রথম জুতা তৈরি হয় ইরানের সীমান্ত এলাকায়। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের যাতায়াত সুবিধার জন্য প্রথম জুতা তৈরি করা হয়েছিল। ভারতবর্ষে জুতার ব্যবহার যে প্রাচীনকালেই শুরু হয়েছিল তার প্রমাণ প্রাচীন সূর্যমূর্তি কিংবা কার্তিকের জুতা পরিধান দেখে বোঝা যায়।

রামায়ণে উল্লেখ আছে, রামের অনুপস্থিতিতে ভরত যখন সিংহাসনে আসীন হন তখন বড় ভাইয়ের পাদুকা-যুগল সিংহাসনে রেখেই তিনি রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। মহাকবি কালিদাসও তার ‘কাদম্বরী’ গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি পাদুকা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। সভ্যতা যত বিকশিত হয়েছে জুতাও তত আধুনিকতা লাভ করেছে। জুতার আধুনিকায়ন শুরু হয় আজ থেকে ৪০০ বছর আগে এবং এ ধারা আজও চলছে।

আধুনিকায়নের সময়ে একেক ধরনের কাঠের জুতা তৈরি করে তার নতুন নতুন নামকরণ করা হয়েছিল। পাদুকার প্রথম আধুনিকায়নে হাত দিয়েছিল ইউরোপীয়রা। ক্রমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশও এতে অংশগ্রহণ করে। ১৮০০ শতকের দিকে জাপানিরা কাঠ দিয়ে তৈরি করে ‘ওকোবো’ নামে এক ধরনের জুতা, যার পরিমাপ ছিল ১৪ সেন্টিমিটার। সাধারণত বৃষ্টির দিনে কাদা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ জুতা পায়ে দিত জাপানের নারীরা। জুতাটির ফিতা ছিল লাল। নারী-পুরুষ উভয়ের কথা মাথায় রেখেই ১৭০০ শতকের দিকে ইউরোপীয়রা তৈরি করে এক ধরনের উঁচু জুতা, যা ‘হাই হিল’ নামে পরিচিত ছিল।

এ জুতা প্রথম ব্যবহার শুরু করেন ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত লেবানিজরা ব্যবহার করত ‘কাবকাবস’ নামে এক ধরনের কাঠের জুতা। মূলত এই জুতাগুলো মধ্যযুগে ব্যবহৃত জুতা দেখে নকশা করা হয়েছিল। এই জুতাগুলো বেশ উঁচু হওয়ার কারণে কাদা-পানি লাগার আশংকা খুবই কম ছিল। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফিনল্যান্ড গাছের ছাল দিয়ে তৈরি করে এক ধরনের জুতা। বৃষ্টি, কাদা ও বরফ আচ্ছাদিত পথ পাড়ি দেয়ার জন্যই মূলত এ জুতা তৈরি করা হয়েছিল। পরে নরওয়ে, সুইডেন ও রাশিয়া এই জুতার আধুনিকায়ন করে। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে ইতালিও কাঠ দিয়ে তৈরি করে ‘চোপিনস’ নামে এক ধরনের ক্ষুদ্রাকৃতির জুতা।

নারীদের ব্যবহারের জন্য এ জুতার পরিমাপ ছিল ৫ ইঞ্চি। ভারতবর্ষে ১৭০০ শতকের দিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল কাঠের খড়ম। উনিশ শতকের দিকে ফ্রান্সে একবার কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল বিয়ের জুতা। তারা এ জুতার ধারণা পেয়েছিল নবম শতকের দিকে প্রাচীন আফ্রিকার মরিসাসের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের ব্যবহৃত জুতা দেখে। ফ্রান্সের পুরুষরা তখন এই বিশেষ বিয়ের জুতা পরে বিয়ে করতে যেত। আজকের দিনে প্রচলিত বাম ও ডান পায়ের জন্য আলাদা জুতা তৈরির ইতিহাস খুব বেশি পুরাতন নয়। ডান ও বাম পায়ের জন্য আলাদা জুতা তৈরি হয়েছে মাত্র এক হাজার ৮৫০ বছর আগে। বর্তমানে জুতা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছর বছর বিভিন্ন ডিজাইন ও আঙ্গিকে জুতা আসছে বাজারে।