বাঙালির চা পান

বৌদ্ধ পুরাণে কথিত আছে, একদা গৌতম বুদ্ধ মঠে বসে ধ্যান করছিলেন কিন্তু ধ্যানে পূর্ণ মনোসংযোগ স্থাপন কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিলো না। বারবার চোখ বুজে আসছিল, ঘুমে ঢুলে পড়ছিলেন তিনি। অগত্যা আর যাতে কখনোই চোখ বুজে না আসে সে জন্য নিজের চোখজোড়ার পাতা স্বহস্তে ছিঁড়ে নিয়ে মাটিতে নিক্ষেপ করেন তিনি। চোখের পাতা দুটি যেখানে পড়েছিল, সেখান থেকেই নাকি তখন পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো জন্ম নেয় একটি চা গাছ, যার পাতা চিবিয়ে বা পানিতে ভিজিয়ে খেলে চোখ থেকে ঘুম ঘুম ভাব দূর হবেই!

এ তো গেল প্রাচীন পুরাণের কথা, চায়ের উৎপত্তিস্থল যে চিন দেশ

আমরা তো ছোটবেলায় ব্যাকরণ বইতেও বারবার করে পড়েছি: চা শব্দটি চৈনিক, চিনদেশ হতে আগত, সেখানকার আদ্যিকালের কিংবদন্তী-কাহিনি থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে চিনের মহামহিম দিগ্বিজয়ী সম্রাট শেন্ নাং এই বলে এক বিচিত্র আইন জারি করেছিলেন যে সবাইকে জল পান করার আগে তা অবশ্যই ঠিকমতো ফুটিয়ে নিতে হবে।

তো একদিন সম্রাটের খাওয়ার জন্য জল পাত্রে ফোটাতে দেওয়া হয়েছে, কোত্থকে যেন কিছু চা বৃক্ষের পাতা উড়ে এসে তাতে পড়লো। ব্যাস, জলের রঙ পাল্টে গিয়ে এমন এক পানীয় তৈরি হলো যা তখনকার দিনে ছিল অভূতপূর্ব। আর এরপরেই নাকি গরম পানিতে পাতা ভিজিয়ে তৈরি করে চা পানের রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে গোটা চিনদেশে, তারপর সেখান থেকে তো পুরো দুনিয়াতেই।

পুরাণ বা কিংবদন্তীর বিবরণ ছাড়িয়ে এখন আসা যাক লিখিত ইতিহাসের বাস্তব বর্ণনায়। এই ভারতীয় উপমহাদেশ তথা অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে কী করে চায়ের আবির্ভাব হলো ও বাঙালির চা-প্রীতি কী করে অতীত থেকে আজকের দিন অব্দি বিবর্তিত ও বর্ধিত হয়েছে― তা নিয়েই এই নিবন্ধে আলাপ করবো। বিষয়টা ভাবানোর মতো যে ভারতীয় উপমহাদেশ বা বাংলা মুলুকে চায়ের প্রচলন করবার মূল নায়ক চিনদেশি বণিক বা রাষ্ট্রদূতেরা নন― যদিও অনেক চিনা পর্যটক ও ধর্মপ্রচারক এই অঞ্চলে প্রাচীন যুগ হতেই বহুবার এসেছিলেন।

সেই ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দেও বঙ্গদেশ ঘুরে গেছেন ফা হিয়েন, ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন হিউয়েন ৎসাঙ কিন্তু তাঁদের লিখে যাওয়া ভ্রমণ-বৃত্তান্তের কোথাও চায়ের নামগন্ধটুকুও নেই। এমনকি পঞ্চদশ শতকে চিন থেকে যে ছয়জন দূত বিভিন্ন সময়ে বঙ্গদেশে এসেছিলেন, তাঁদের পাঠানো সরকারি রিপোর্টে এই অঞ্চলে চা-পানের কোনো কথা নেই। চায়ের নাম নেই দুই দেশের তখনকার পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আদান-প্রদানের জন্য উপযোগী পণ্যের তালিকাতেও। মোগল আমলে নবাব আলিবর্দী খাঁ-র খাদ্য তালিকায় কফির বাধ্যতামূলক উপস্থিতি থাকলেও চায়ের হদিশ সেখানে মেলে না।

তবে ১৫৯৮ সালে আসাম ঘুরে যাওয়া ওলন্দাজ পর্যটক জন হিউগেন তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার সময় লিখেছিলেন, আসাম অঞ্চলের আদিবাসীরা এক ধরনের বন্য চা গাছের পাতা তরকারি হিসেবে রসুন ও তেল দিয়ে রান্না করে খেয়ে থাকে। এমনকি তাঁরা পানীয় হিসেবেও তা পান করে, কিন্তু সেই পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া আদতে কীরকম বা নিদেনপক্ষে তা প্রচলিত চায়ের ধরনেরই কোনো পানীয় কিনা―সেসব তথ্য আর ওই পর্যটক জানাতে পারেননি।

সুতরাং বাঙালিকে চা ধরানোর পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে ইংরেজ বণিকরাই― এ নিয়ে সংশয় নেই। কিন্তু ইংরেজ বণিকেরা কোত্থকে চায়ের সন্ধান পেল তা নিয়ে আপাতত দুই রকমের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন যে আরব বণিকেরা প্রথম চায়ের সন্ধান পায় চিনাদের থেকে। তাঁরা দেখে-শুনে সেটাকে অবসরে মন-প্রাণ চাঙ্গা করার উপযোগী পানীয় হিসেবে লুফে নেয়। পরে তাঁদের বাণিজ্য জাহাজে চা-পানের আয়োজন দেখে ইংরেজ বণিকেরা চায়ের কথা জানতে পারে। তবে এই মতের সপক্ষে বিশেষ তথ্য-প্রমাণ নেই।

আর ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে তুলনামূলকভাবে পোক্ত মতটি হলো, সপ্তদশ শতকে সরাসরি চিন থেকে আমদানিকৃত চা ব্রিটেনে কফির দোকানগুলোতে প্রাথমিকভাবে প্রচলিত হলেও প্রথমদিকে বিশেষ জনাদর পায়নি। তবুও ১৬৫৭ সালে লন্ডনে প্রথমবারের মতো একটি চায়ের দোকান স্থাপিত হয়। ওদিকে ১৬৬০ সালে ব্রিটেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সাথে বিয়ে হয় পর্তুগালের রাজকন্যার। উল্লেখ্য, পর্তুগিজরা চায়ের খোঁজ পেয়েছিল চিন-ফেরত একদল ধর্মযাজকের মাধ্যমে, তাও আবার এক শতাব্দী আগেই।

নতুন রাণী তখন প্রথমবারের মতো ইংরেজ রাজপরিবারের অন্দরমহলে তাঁর স্বদেশ হতে পাওয়া চা-পানের অভ্যাস আমদানি করতে সক্ষম হন। এভাবে আস্তে ধীরে রাজপরিবারের অন্দর থেকে সাধারণ ইংরেজ জনগণের মধ্যেও চা-পান ও চা সম্পর্কে কৌতুহল তৈরি হতে থাকে। এর কিছুদিন পরেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনের ক্যান্টন শহরের (এখন এই শহরের নাম গোয়াঙঝু) বাণিজ্যিক বন্দর থেকে রুপোর বিনিময়ে কোহঙ নামের এক চিনা ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে ব্রিটেনে চা আমদানি শুরু করে।

তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেক রকমের পণ্যই আমদানি করতো, কিন্তু চা আমদানি শুরু করবার পর তা অভাবনীয় বাণিজ্যিক লাভের মুখ দেখে। প্রথমদিকে শরীর সুস্থ রাখবার “টনিক” হিসেবে চা-কে ইংরেজ সমাজে উপস্থাপন করা হলেও সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে তা সবার জন্যে সমান উপভোগ্য এক পানীয় হিসেবেই চূড়ান্ত জনপ্রিয় বলে গণ্য হতে থাকে ।

প্রাথমিকভাবে কেবল ব্রিটেনের অভিজাত পরিবারগুলোতে চায়ের প্রচলন ঘটলেও পরবর্তীকালে ক্রমান্বয়ে তা সেখানকার প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষের নিকট আদরণীয় হয়ে ওঠে । এবং বছরখানেকের মধ্যে চা শীতপ্রধান বিলাতের নাগরিকদের ক্লান্তিকর জীবনকে চাঙ্গা ও উপভোগ্য করে তোলার জন্য দৈনন্দিনের অপরিহার্য উষ্ণ পানীয়রূপে প্রতিষ্ঠা পায়।

উপমহাদেশে ইংরেজের আগমণ ও চা চাষের প্রচলন

স্বদেশে চায়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চিন থেকে চা আমদানির পরিমাণও সঙ্গত কারণেই বাড়াতে হয়। তবে এদের তাতে তেমন সমস্যাও তৈরি হয়নি। আর্থিক লাভ ভালোই হচ্ছিল, উপরন্ত চিনের বাজারে তাদের দাপট ও প্রভাবও নেহাত কম ছিল না। বঙ্গদেশে যেসব ইংরেজ এসেছিলেন, তাঁরা তখন সেখানে থেকেও নিয়মিত চা খেতেন, এবং তা নির্ঘাত চিন থেকেই আনা হতো । এই ধারণার সপক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধানে পাই, ১৭৯৩ সালে আপজন প্রকাশিত ইংরেজি-বাংলা অভিধানে চা শব্দটির দেখা মেলে, আছে “চা-পানি” শব্দটিও।

এছাড়া ১৭৯৭ সালে প্রকাশিত জন মিলারের “সিক্ষ্যাগুরু” বইতে সংকলিত জনৈক সাহেবের দেওয়ান এবং চাকরের মধ্যে একটি সংলাপেও সাহেবের চা-পানের অভ্যাসের উল্লেখ মেলে। কিন্ত একটা বড় গোলমাল বাঁধে ১৮৩৩ সালে আফিম যুদ্ধের সময়। ব্রিটেন ও চিনের মধ্যেকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে ফাটল ধরার প্রভাব পড়ে চায়ের বাজারেও। শিল্প-গবেষক অরিন্দম মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, চা আমদানির খরচ তখন হঠাই বেড়ে দাঁড়ায় বছরে নয় মিলিয়ন পাউন্ড। অতএব প্রকৃতপক্ষে পয়সা বাঁচানোর লক্ষ্য থেকেই সদ্য দখলীকৃত ভারতের জমিতে চা চাষের কথা তাদের ভাবতে হয়।

যদিও এর আগে ১৭৭৪ সালে চিন থেকে চা-বীজ এনে ভূটানে চাষ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সে যাত্রা উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়― আবার এর চৌদ্দ বছর পর আরেকবার কলকাতার শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনেও চা গাছ রোপণ করে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাও ফলপ্রসূ হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩৪ সালে চা সমিতি তৈরি করেন, যাদের কাজ ছিল ভারতে চা চাষ ও চা শিল্প স্থাপনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা। সমিতির সদস্য ছিলেন মোট বারোজন, যাঁদের মধ্যে দেশীয় দুই সদস্যই জাতে ছিলেন বাঙালি― রাধাকান্ত দেব ও রামকমল সেন।

এই সমিতি ১৮৩৫ সালে চা গাছ ও চায়ের বীজ সংগ্রহের জন্য চিন সফর করে। কিন্তু আফিম যুদ্ধের আগেই ১৮১৫ সালে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা কারলেন লেটারের আসাম থেকে প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে আসামের “সিংকো” জাতিসত্তার আদিবাসীরা এক ধরনের বন্য পাতা দিয়ে পানীয় তৈরি করে পান করে থাকে(পূর্বে উল্লেখিত ওলন্দাজ পর্যটক জন হিউগেনের বিবরণের সঙ্গে সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়)।

এই প্রতিবেদন লেখার বছর কয়েক বাদে, ১৮২৩ সালে আসামে মেজর চার্লস রবার্ট ব্রুস এক ধরণের ব্যতিক্রমী চা গাছ আবিস্কার করতে সমর্থ হন, যার পাতাকেই সম্ভবত কারলেন লেটার “বন্য পাতা” বলে চিহ্নিত করেছিলেন। যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোটানিস্ট একে “এক জাতের বন্য ক্যামেলিয়া” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

অবশ্য চা সমিতির চিন সফরের পর মেজর ব্রুসের খুঁজে পাওয়া গাছটিকে ইংরেজ উদ্ভিদতত্ত্ববিদরা বহু গবেষণা করে অবশেষে এক জাতের দেশীয় চা বলে স্বীকৃতি দেন। এরপর ১৮৩৭ সালে অবশেষে প্রথমবারের মতো আসামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরীক্ষামূলকভাবে চায়ের আবাদ শুরু করে। ভারতে সংগঠিত চা উৎপাদন শিল্পেরও গোড়াপত্তন হয়। আর দেশীয় জাতের সেই চা গাছ আবিস্কারের স্বীকৃতি হিসেবে রবার্ট ব্রুসকে আসামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চা উৎপাদন ক্ষেত্রের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

১৮৩৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরীক্ষামূলক তকমা ঝেড়ে ফেলে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের জন্য কাজ শুরু করে। বাণিজ্যিক চা বাগান স্থাপনের প্রস্তাব অতঃপর লন্ডন ও ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়। ১৮৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চা চাষের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে লন্ডনের তিনটি ও কলকাতার একটি কোম্পানি। এই স্বতন্ত্র কোম্পানিগুলোকে একত্র করে “আসাম কোম্পানি” নামের একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি গঠিত হয়। তবে ইংরেজদের পাশপাশি একজন উদ্যোগি অথচ অধুনা বিস্মৃত বাঙালিও চা শিল্প স্থাপনের উদ্যোগে মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না, তিনি দ্বারকানাথ ঠাকুর। তিনিই তখন উদ্যোগ নিয়ে স্থাপন করেন “দ্য বেঙ্গল টি অ্যাসোসিয়েশন” নামের আরেকটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি।

আসাম কোম্পানির মূলধন ছিল ৫০ লক্ষ টাকা, তাঁর কোম্পানির মূলধন ছিল ১০ লক্ষের কাছাকাছি। দ্বারকানাথের এই উদ্যোগের বিষয়ে অবগত হয়ে আসাম কোম্পানির কলকাতা-ভিত্তিক অংশীদার “কোকেরেল অ্যান্ড কোম্পানি” তাঁর সাথে যোগাযোগ করে বেঙ্গল টি অ্যাসোসিয়েশনকেও তাঁদের কোম্পানির সাথে যুক্ত করে নেয়। এভাবে আসামে কোম্পানির চা বাগান স্থাপনের অভিযান বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হতে থাকে। ১৮৫৩ সালের হিসেবে তাঁদের অধীনে থাকা চা বাগানগুলোর মোট আকার ছিল ২,০০০ একর। ১৮৯৬-৯৭ সালে তা পাঁচগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায় ১০,০০৯ একরে।

প্রথমদিকে কোম্পানি ভেবেছিল আসামে চা বাগান তৈরি করা হবে চিনের মডেল অনুযায়ী। ১৮৪০ সালের দিকে সে অনুযায়ী চিন থেকে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ছাড়াও অভিজ্ঞ চিনা শ্রমিক নিয়ে আসারও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক পেনাং ও সিঙ্গাপুর থেকে তিনশ জন শ্রমিক সংগ্রহ করে তাঁদের আসামে নিয়ে আসা হয়। কাকতালীয়ভাবে ১৮৪০ সালেই ইংরেজ রাজকর্মচারী কর্নেল ডেভিডসন তাঁর সেই সময়ের ঢাকা ভ্রমণের স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, একদিন ঘোড়ায় চড়ে ঢাকার রাস্তায় বেড়াতে গিয়ে তিনি প্রায় ডজনখানেক চিনদেশি ব্যক্তিকে দেখতে পান।

অবাক হয়ে তাঁদের চিনা ভাষায় সম্বোধন করলে তাঁরা প্রথমে অবাক হয়, পরে আনন্দসহযোগে চিৎকার করে জানায় যে তাঁরা সবাই চা উৎপাদক। আসামের দিকে যাত্রা করছে। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো, সেখানকার স্থানীয় চা কোম্পানিতে কর্মরত দেশীয় শ্রমিকদের উত্তম চা উৎপাদন কৌশল শেখানো। ডেভিডসন যেসব চিনদেশি চা শ্রমিকদের ঢাকার রাস্তায় দেখেছিলেন তাঁরাই নিশ্চয়ই পরে আসাম কোম্পানির চা বাগানে গিয়ে যোগ দিয়েছিল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এইসব চিনদেশি চা শ্রমিকদের শেষমেশ এদেশের অভিজ্ঞতা তেমন বিশেষ সুখকর হয়নি ।

যেসব আড়কাঠি এই চা শ্রমিকদের এ দেশে নিয়ে এসেছিল, তারা কেউই কোনো শ্রমিককে প্রতিশ্রুত পরিমাণে পারিশ্রমিক দিতে সমর্থ হয়নি। এই নিয়ে কলকাতা ও পাবনায় দাঙ্গাও বেঁধেছিল তখন। আবার কোনো কোনো শ্রমিক দুই মাস জাহাজে ভ্রমণ করে ভারতে আসার পর ফের প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে তিন মাস বেকার বসে থাকতে রাজি ছিলেন না। ফলে অনেক চিনদেশি শ্রমিককেই কোম্পানি বাড়তি পয়সা খরচ করে তাঁদের আপন দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়। এবং এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা বারবার হবার ফলে কোম্পানি চিনদেশি শ্রমিক আমদানি বন্ধ করে দিয়ে স্রেফ স্থানীয় বাঙালি ও আদিবাসী শ্রমিকদের চা বাগানের কাজে নিয়োগ দিতে শুরু করে।



স্টেশনের কর্নেল সাহেব

আসাম কোম্পানি গঠন হওয়ার কয়েক বছর পরে দার্জিলিঙে চা বাগান স্থাপনের উদ্যোগ নেন একজন ব্রিটিশ সার্জন, ডা. ক্যাম্পবেল। চিনদেশ থেকে আনা চা-বীজ তিনি রোপণ করে একটি ছোট্ট নার্সারি গড়েছিলেন ১৮৪৫ সালে। এর দুই বছর পরে ব্রিটিশ কোম্পানির উদ্যোগে আরো কয়েকটি চা-নার্সারি স্থাপিত হয়। দার্জিলিঙে ১৮৫৩ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে বাগান তৈরি করে চা উৎপাদন আরম্ভ হয়। ১৮৭৪ সালের দিকে বাগানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩টি ও স্থানীয় চা-শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় কুড়ি হাজারেরও অধিক। তৎকালীন পূর্ববাংলার সীমানার মধ্যে চা চাষের প্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয় চট্টগ্রামে।

১৮৪০ সালে চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিক কালেক্টর মি. স্কন্স সর্বপ্রথম চা আবাদের প্রচেষ্টা চালান অসমীয়া চা-বীজ ও চিন থেকে আনা চা-বীজের সাহায্যে। প্রায় একই সময়ে জনৈক মি. হুগো কর্ণফুলী নদীর তীরে কোদালা এলাকায় চা বাগান তৈরি করতে উদ্যোগী হন। ১৮৪৩ সালে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। এরপরের চল্লিশ বছরে যথাক্রমে এখনকার বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ব্রিটিশদের প্রচেষ্টায় উপযুক্ত জায়গা-জমি খুঁজে বের করে চা বাগান স্থাপন ও চা উৎপাদন শুরু হয়।

মূলত ফিনলে কোম্পানির উদ্যোগে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে চা শিল্পের দ্রুত বিস্তার ঘটে। প্রসঙ্গত চা বাগানকে ঘিরে একজন ইংরেজ সিভিলিয়ানের লেখা একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেত পারে। বিবরণটুকু লভ্য সিভিলিয়ান আর্থুর ড্যাশের স্মৃতিকথায়, যিনি ১৯১০ সালে চট্টগ্রামে শহরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে এসেছিলেন। ড্যাশ জানাচ্ছেন, ফিনলে টি কোম্পানির কর্মকর্তারা তাঁর কাছে দাবী করেন যে তাদের তৈরি শিপিং লাইনই(যার নাম ছিল “দ্য ক্ল্যান লাইন”) চট্টগ্রাম বন্দরকে পঞ্চাশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে নৈমিত্তিক ব্যবহারের ফলে।

আর টি কোম্পানির আমদানি-রপ্তানির সুবিধার জন্যই মূলত বেঙ্গল রেলের কর্মকর্তাবৃন্দ এখানে রেললাইন ও স্টেশন স্থাপন করতে উদ্যোগী হন। আর্থুর ড্যাশের স্মৃতিকথার এই অংশ থেকে তখনকার দিনে ব্যবসা-বান্ধব ব্রিটিশ-রাজের কাছে চা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর গুরুত্ব কীরকম ছিল তা কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়। আর এই উপমহাদেশে আসার পরও ইংরেজ সাহেবদের চা-পানের অভ্যাস যে বহাল তবিয়তে অটুট ছিল তা বোঝা যায় ইংরেজ সিভিলিয়ান জর্জ অ্যাটকিনসনের আঁকা ১৮৬০ সালে প্রকাশিত তাঁর কারি অ্যান্ড রাইস শীর্ষক একটি চিত্র-অ্যালবামের তৃতীয় সংস্করণে ছবিটি আছে।

আগের সংস্করণগুলো দেখার সুযোগ ঘটেনি। তাই সেসব সংস্করণে এই ছবিটি ছিল নাকি সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। একটি এনগ্রেভিং দেখলে। যার শিরোনাম স্টেশনের কর্নেল সাহেব। ছবিটিতে দেখা যায়, আরামকেদারায় আয়েশ করে বসে কর্নেল সাহেব, প্রায় পাশেই এক খাসনামা দাঁড়িয়ে আছেন হাতের ট্রে-তে চায়ের কাপ নিয়ে। একটু দূরে আরেক দেশীয় কর্মচারীকে দেখা যাচ্ছে জলন্ত উনুনে একটি জলধারী কেটলি চাপিয়ে হাতে এক টুকরো কাগজ নিয়ে বসে থাকতে ছবিটি দেখে আমাদের মনে হতে পারে, সম্ভবত ওই কেটলির ফুটন্ত পানি দিয়েই তখন চা তৈরি করে সাহেবকে পরিবেশন করা হচ্ছিলো।

বাঙালির চা-প্রীতির বিচিত্র দিক

ব্রিটিশ বেনিয়ারা প্রধানত তৎকালীন অবিভক্ত বঙ্গদেশের বিস্তৃত ব্যাপক অঞ্চল জুড়েই তাঁদের চা চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, চা চাষের প্রাথমিক উদ্যোগের সাথে বাঙালি শিল্পপতিদের জড়িত থাকার কথাও আমরা জেনেছি। কিন্তু বাঙালি উনিশ শতকের শেষার্ধে এসেও ঠিক সেভাবে চায়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেনি, উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে এসে বলা চলে বাঙালি চায়ে আস্তে-ধীরে মজতে শুরু করে। স্বামী বিকেকানন্দর ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত নিজের ছোটবেলার স্মৃতি থেকে লিখেছেন ঔষধ হিসেবে চা পানের কথা। তাঁর কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা বইতে তিনি লিখেছেন:

আমরা যখন খুব শিশু তখন একরকম জিনিস শোনা গেল চা। সেটা নিরেট কি পাতলা কখনও দেখা হয়নি। আমাদের বাড়িতে তখন আমার কাকীর প্রসব হইলে তাঁহাকে একদিন ঔষধ হিসাবে চা খাওয়ান হইল। একটা কালো কেটলী মুখে একটা নল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভিতর কুঁচো পাতার মতন কি দিলে, গরম জল দিলে, তারপর ঢাললে, একটু দুধ চিনি দিয়ে খেলে। আমরা তো দেখে আশ্চর্য, যা হোক দেখা গেল, কিন্তু আস্বাদনটা তখনও জানিনি। আর লোকের কাছে গল্প, যে একটা আশ্চর্য জিনিস দেখেছি, এই হল প্রথম দর্শন। তখন চীন থেকে চা আসত, ভারতবর্ষে তখনও চা হয়নি।

অবশ্য মহেন্দ্রনাথ হয়তো খেয়াল না করেই শেষ লাইনে একটা ভুল তথ্য দিয়েছিলেন, তাঁর জন্মেরও (১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ) বেশ কয়েক বছর আগে তখনকার ভারতবর্ষে চা উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে। যাই হোক, তাঁর এই বিবরণ থেকে এটা বোঝা যায় যে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে নিত্যদিনের পানীয় বা নিছক বিলাসী পানীয় হিসেবেও চা পান তখন শুরু হয়নি।

তবে শুধু লিকার চা-ই নয়, দুধ-চিনি মিশিয়ে চা খাওয়ার ব্যাপারটিও বাঙালি সমাজের অজানা ছিল না, মহেন্দ্রনাথের ভাষ্য থেকে এও টের পাওয়া যায়। ধারণা করা যায়, উনিশ শতকের শেষার্ধে এসে চা শহুরে শিক্ষিত ও অভিজাত ধনশালী ব্যক্তিদের শখের পানীয়রূপে পরিচিতি পেতে শুরু করে, পরে তা ক্রমান্বয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের রোজকার পান-অভ্যাসের গণ্ডীতেও এসে পড়ে। এবং বিশ শতকে এসে চা পানের অভ্যাস চূড়ান্তভাবে ব্যাপক আকার গ্রহণ করে।

ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র স্বামী বিবেকানন্দের চা প্রীতির একটি বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর লেখায়, তা থেকে বোঝা যায়, নিছক সন্ন্যাসীপনার বশে চা-পানের তৃপ্তিকে তিনি দূরে সরিয়ে রাখতে চাননি:

“ক্ষমতা ও লোকনিন্দার থোড়াই কেয়ার করতেন বিবেকানন্দ, তাই ১৮৮৬ সালেই ঠাকুরকে [শ্রীরামকৃষ্ণ] পোড়ানোর রাতেই দরমা জ্বালিয়ে কেটলি করে চা খেয়েই তিনি ও তার গুরুভাইরা রাত কাবার করেছেন। দারুণ অভাবেও বরাহনগরের মঠে স্বামীজি চা ছাড়েননি, অন্যদেরও ধরিয়েছেন। জেলা কোর্টে দাঁড়িয়ে হলফ করে চা খাওয়ার পক্ষে সওয়ালও করেছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের যেমন চায়ের প্রতি টান ছিল দারুণভাবে, তেমনি তাঁরই প্রায় সমবয়সী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন চা ও চা-পানের বিষয়ে ভীষণ আগ্রহী।

শান্তিনিকেতনে চা-চক্র বা চা-এ পরিপূর্ণ আড্ডার নাম তিনি দিয়েছিলেন “চাক্র”। এমনকি এই চা-চক্র বা চাক্রের প্রবর্তনের দিনে লিখেছিলেন একটি গানও, যা পরে লিপটন টি কোম্পানির বিজ্ঞাপনেও সাদরে ব্যবহৃত হয়েছিল: হায় হায় হায়/ দিন চলি যায়।/চা-স্পৃহ চঞ্চল/ চাতকদল চল/ চল, চল হে!/ টগবগ-উচ্ছল/ কাথলিতল-জল/ কল কল হে!/এল চীনগগন হতে/পূর্বপবনস্রোতে/ শ্যামল রসধরপুঞ্জ,/শ্রাবণবাসরে/রস ঝরঝর ঝরে/ভুঞ্জ হে ভুঞ্জ/ দলবল হে! গানের এর পরের অংশটি আরো মজাদার।

সেখানে রবীন্দ্রনাথ পুঁথিবিশারদ, গণিতবিদ, কাব্যরসিক, চিত্রকর, বাউণ্ডুলে থেকে শুরু করে এমনকি শশব্যস্ত হিসাবরক্ষকদেরকেও কর্মজীবনের গ্লানি চটপট ভুলবার জন্যে চা-পানের আহ্বান জানিয়েছেন। আগ্রহী পাঠকেরা চাইলে গানটির পূর্ণপাঠ “প্রহাসিনী” গ্রন্থে দেখে নিতে পারেন।

কাজী নজরুল ইসলামের চায়ের প্রতি টান তো ছিল রীতিমতো কিংবদন্তীতুল্য। কিছুক্ষণ পর পর চা না পেলে তাঁর চলতই না। কথিত আছে যে যথাযোগ্য পরিমাণ চা ও পান দিয়ে তাঁকে একটা ঘরে আটকে রেখে বহু গান লিখিয়ে এবং সুর করিয়ে নিয়েছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তারা। কবি নজরুলের চা-প্রীতি প্রসঙ্গে জসীম উদ্‌দীনের “যাঁদের দেখেছি” স্মৃতিকথা থেকে একটা বিশেষ অংশ দীর্ঘ হলেও কেবল এর অভিনবত্ব ও ঘটনার চমৎকারিত্বের জন্য উদ্ধার করে এখানে রাখা যেতে পারে। তখন নজরুল বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় সমিতির আমন্ত্রণে ফরিদপুরে গিয়েছেন, রাতে জসীম উদ্‌দীনের বাড়িতে রয়েছেন। বসেছে গানের আসর, এমন সময়:

রাত্রিবেলা এক মুস্কিলে পড়া গেল। চা না পাইয়া কবি অস্থির হইয়া উঠিলেন। এই পাড়াগাঁয়ে চা কোথায় পাইব? নদীর ওপারে গিয়া যে চা লইয়া আসিব, তাহারও উপায় নাই। রাত্রিবেলা কে সাহস করিয়া এত বড় পদ্মা-নদী পাড়ি দিবে? তখন তিন-চার গ্রামে লোক পাঠান হইল চায়ের অনুসন্ধানে। অনেক খোঁজাখুজির পর আলিম মাতব্বরের বাড়ি হইতে কয়েকটা চায়ের পাতা বাহির হইল। তিনি একবার কলিকাতা গিয়া চা খাওয়া শিখিয়া আসিয়াছিলেন। গ্রামের লোকদের চা খাওয়াইয়া তাজ্জব বানাইয়া দিবার জন্য কলিকাতা হইতে তিনি কিছু চা-পাতা লইয়া আসিয়াছিলেন।

গ্রামের লোকদের খাওয়াইয়া চা-পাতা যখন কম হইয়া আসিত, তখন তাহার সহিত কিছু শুকনা ঘাসপাতা মিশাইয়া চায়ের ভাঁড়ার তিনি অফুরন্ত রাখিতেন। তিনি অতি গর্বের সহিত তাঁহার কলিকাতা-ভ্রমণের আশ্চর্য কাহিনী বলিতে বলিতে সেই চা-পাতা আনিয়া কবিকে উপঢৌকন দিলেন। চা-পাতা দেখিয়া কবির তখন কী আনন্দ! এই মহামূল্যবান চা এখন কে জ্বাল দিবে? এ-বাড়ির বড়বৌ, ও বাড়ির ছোটবৌ―সকলে মিলিয়া পরামর্শ করিয়া যাহার যত রন্ধনবিদ্যা জানা ছিল সমস্ত উজাড় করিয়া সেই অপূর্ব চায়ের রন্ধন-পর্ব সমাধা করিল। অবশেষে চা বদনায় ভর্তি হইয়া বৈঠকখানায় আগমন করিল।

কবির সঙ্গে আমরাও তাহার কিঞ্চিত প্রসাদ পাইলাম। কবি তো মহাপুরুষ। চা পান করিতে করিতে চায়ের রাঁধুনীদের অজস্র প্রশংসা করিতেছিলেন। আমরাও কবির সঙ্গে ধূয়া ধরিলাম। গ্রাম্য-চাষীর বাড়িতে যত রকমের তরকারী রান্না হইয়া থাকে, সেই চায়ের মধ্যে তাহার সবগুলিরই প্রসাদ মিশ্রিত ছিল। কমিউনিস্ট কর্মী আবদুল হালিম বড় সমালোচনা-প্রবণ। তাঁহার সমালোচনা মতে সেই চা-রামায়ণের রচয়িত্রীরা নাকি লঙ্কাকাণ্ডের উপর বেশী জোর দিয়াছিলেন। আমাদের মতে চা-পর্বে সকল ভোজনরসের সবগুলিকেই সমমর্যাদা দেওয়া হইয়াছিল। পরবর্তীকাল বহু গুণীজনের কাছে এই চা খাওয়ার বর্ণনা পরিবেশন করিয়া কবি আনন্দ করিতেন।

আরেক কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নাকি এক জমিদারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে চা খায় কিনা। না-বোধক উত্তর আসায় তাঁর মন্তব্য ছিল, “কিন্তু তোমাকে তো ভদ্রলোকের মতোই দেখায়”! অবশ্য যে দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন “বিভব সম্পদ কিছু নাহি চাই, শুধু বিধি যেন প্রাতে উঠে পাই ভাল এক পেয়ালা চা”, তাঁর পক্ষে চা-প্রীতির ক্ষেত্রে এমন কট্টরপন্থী হওয়াটাই স্বাভাবিক। গৌতম ভদ্রের লেখায় পাই, একইভাবে ভদ্রতার সাথে চা-পানের অভ্যাসকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম। তিনি নাকি বলতেন: এক জনের বাড়িতে গেলাম, আর এক কাপ চায়ের দেখা পেলাম না, এই রকম কারও কাছে কোনও ভদ্রলোকের যাওয়া উচিত নয়।

ঢাকার নবাব আবদুল গনিও নাকি প্রায় প্রত্যেক সকালেই তাঁর বাড়িতে চায়ের আসর বসাতেন। তিনি নিজেও প্রতিদিন চা খেতে ভালোবাসতেন। এখনকার ঢাকার বেগুনবাড়ি এলাকায় তিরিশ বিঘা জমি কিনে সাফসুতরো করে নাকি তিনিও চা চাষের চেষ্টা চালিয়েছিলেন (এই ফাঁকে জানিয়ে রাখা যায়, উনিশ শতকের ঢাকা শহরে অবশ্য ইংরেজদের পাশাপাশি আর্মেনিয়ান বণিকরাও চা বিপণনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৮৭০ সালে শাঁখারীবাজারে আর্মেনিয়ানরা প্রতিষ্ঠা করেন শহরের সবচেয়ে আধুনিক ও অভিজাত চায়ের দোকান। নবাবপুরের ক্যাপিটাল রেস্তোরাঁও তখন চমৎকার চা পরিবেশনের জন্য দারুণ বিখ্যাত হয়ে ওঠে)।

বাঙালির চা-প্রীতির প্রসঙ্গে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম চা সংক্রান্ত পুস্তকের সংবাদ না জানানোটা উচিত হবে না। ১৯০০ সালে কলকাতার ৪ নং উইলিয়মস লেনের দাস মুদ্রণযন্ত্রে জনৈক অমৃতলাল ঘোষের দ্বারা “চা প্রস্তুত প্রণালী শিক্ষা” নামের একটি অভিনব বই মুদ্রিত হয়েছিল। ১১২ পৃষ্ঠার বইটির লেখকের নাম গিরীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বইটি থেকে জানা যায়, লেখক কাছাড়ের জিরিঘাট চা-বাগানে টি-মেকার হিসেবে কাজ করেন। বইটিতে চা সংক্রান্ত নানা খুঁটিনাটি তথ্য সংকলিত হয়েছিল, যেমন চায়ের প্রকারভেদ, চা তৈরির কায়দা-কানুন, চাষের পরিবেশ, চায়ের মোড়কীকরণ ইত্যাদি।

লেখক ভূমিকাতে লিখেছিলেন চা প্রস্তুত সম্পর্কে বঙ্গভাষায় কোনো গ্রন্থ নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। আজকাল চা ব্যবসায়ে বহু সংখ্যক দেশীয় লোক লিপ্ত হইয়া জীবিকা নির্ব্বাহের সোপান করিতেছেন। এ সম্বন্ধে যা কিছু বিজ্ঞান আছে, সকলই ইংরেজী ভাষায়। সর্ব্বসাধারণের দন্তস্ফূট জন্যও উহা উপযোগী নহে। আমি সেই অভাব দূরীকরণের জন্য অনেকানেক ইংরেজী ভাষার চা বিজ্ঞান সমালোচনায় নিজের দীর্ঘকাল চা সম্বন্ধে জ্ঞানের যোজনা করিয়া অত্র গ্রন্থ লিখিলাম।

চা-বিরোধী দ্রোহ : ব্রাহ্মসমাজ থেকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র

চায়ের প্রতি একদল বাঙালির আগ্রহ যেমন জন্মাচ্ছিল, তেমন এর বিরুদ্ধে আরেকদল বাঙালিই বিভিন্ন সময়ে প্রকান্ড বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসেছিলেন। একেকসময় নানাবিধ কারণে চা-বিরোধীতায় নেমেছেন অনেক বিখ্যাত বাঙালি ব্যক্তিত্বও। সেইসব কারণ কখনো নির্মিত হয়েছে স্বাস্থ্যগত কারণ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতাকে মিশিয়ে, কখনোবা চা বাগানের শ্রমিকদের অধিকারের প্রসঙ্গটিকে ঘিরে।

ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যরা উনিশ শতকের শেষার্ধে চা-বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বেশ সোচ্চার হয়েছিলেন । চা-বাগানের শ্রমিকদের ওপর মালিকপক্ষের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁরা বেশ জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন তখন। ব্রাহ্ম সমাজ থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতেও এ নিয়ে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য রামকুমার বিদ্যারতœ আসাম অঞ্চলে ব্রাহ্মধর্মের প্রচার করতে গিয়ে চা-শ্রমিকদের দুর্দশার সাথে সরেজমিনে পরিচয় লাভ করেছিলেন।

এ নিয়ে পরে তিনি “কুলি কাহিনী” নামের একটি আবেগঘন উপন্যাস লেখেন ও ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র সঞ্জীবনী পত্রিকাতেও এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন রচনা করেন। এরপর ব্রাহ্ম সমাজের আরেকজন সংগঠক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীও সরেজমিনে আসামের প্রায় সব চা বাগানে ঘুরে আসার পর চা শ্রমিকদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও নির্মম নির্যাতনের বিবরণ নিয়ে বহু প্রবন্ধ লেখেন।

তাঁরা রাজনীতির ময়দানেও এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন শুরু করেন। ফলে ১৯০১ সালের দিকে ব্রিটিশ-রাজ চা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় শ্রম আইন যথাযোগ্যভাবে সংশোধন করে। ঠিক এমনভাবেই চা বাগানে শ্রমিক নির্যাতনের হেতু অনেক সচেতন বাঙালিই তখন চা ও চা-শিল্পের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একে তাই নিছক যুক্তিহীন উপেক্ষা বা ক্রোধ বলা যাবে না।

বাবুদের বৈঠকখানায় চা-পানের আসর, প্রিয়গোপাল দাশের করা কাঠখোদাই-চিত্র

এছাড়া কেউ কেউ তুমুল স্বদেশীয়ানার আমলে ইংরেজের তৈরি পানীয় গ্রহণ করাটা গর্হিত অপরাধ―এরকম ধারণার কারণেও চা ছুঁতে চাননি। “নেটিভ”-দের ভয়াবহভাবে শোষণ করে সাদা চামড়ার শাসকের ভাঁড়ার ভরবার আয়োজন (ভাঁড়ার ভরেওছিল বৈকি, উনিশ শতকের শেষে বাংলা অঞ্চলে উৎপাদিত চা তো ইউরোপে পরম দাপটে চিনদেশি চায়ের বাজার ধ্বসিয়ে ছেড়েছিল) সফল করবার উদ্দেশ্যে বানানো পানীয় গ্রহণ করাটাও নিশ্চয় স্বাধীনতার স্বাদ পেতে চাওয়া দ্রোহী বাঙালিদের দৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো কর্ম ছিল না।

নব স্বদেশী-আদর্শে উদ্বুদ্ধ শিক্ষিত সমাজের বেশিরভাগ সদস্যই এমন মত পোষণ করতেন। অবশ্য তাঁদের আদর্শিক দিক থেকে দেখলে এতে আপত্তি জানানোর তেমন কিছু তখন ছিল না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “পরিণীতা” উপন্যাসের নায়িকা ললিতা তাই প্রেমিক শেখরের ইচ্ছা অনুসারে চা খায় না, কারণ শেখর আপাদমস্তক কট্টর স্বদেশী― এজন্য চা কিংবা চা-পান, এ দুই-ই তাঁর নিকট বিকটরূপে অসহ্য। মদ্যপানের পাশাপাশি চা-পানও হয়ে ওঠে এলিট সমাজের কারো কারো কাছে বাবুয়ানার উপযুক্ত প্রতীক। বিংশ শতকের শুরুতে শিল্পী প্রিয়গোপাল দাশ তাঁর তৈরি করা একটি অনবদ্য কাঠখোদাই চিত্রেও ধরে রেখেছিলেন কলকাতার বাবুদের বৈঠকখানায় বসে চা-পানের বিলাসী আয়োজন ও খাসনামার চা পরিবেশনের দৃশ্য ।

হরিপদ রায়ের আঁকা ব্যঙ্গচিত্র, পাক্কা চা-খোর

এরপর আসে বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রচণ্ড চা বিরোধী বিদ্রোহের পালা। লর্ড কার্জনের বক্তৃতায় চা পানের সপক্ষে প্রচারের কথা দেখে তিনি স্বভাবতই চায়ের মধ্যে দেখতে পান সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের নয়া কূটকৌশলের ছায়ারেখা। বাংলার সর্বস্তরে চায়ের জনপ্রিয়তাকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বাঙালিকে অলস ও নেশাতুর করার পথে ইংরেজের সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করেন উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালের ৭ই ডিসেম্বর দেশ পত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ “চা-এর প্রচার ও দেশের সর্বনাশ”-এ। চা-পানে বাঙালিকে উৎসাহিত করার জন্য ইংরেজদের গৃহীত বহুমুখী অদ্ভুত কূটনীতি ও চোখ-ধাঁধানো কৌশলই ছিল সে লেখায় তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য।

চা চাষের ফলে বাংলার অর্থনীতি কীরকম দুর্বল হয়ে পড়ছে তা নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন। শেষে চা কীরকম স্বাস্থ্যগত ক্ষতি করে তারও বর্ণনা দিয়েছেন। তবে আচার্যের এই প্রবন্ধের প্রধান ভাবগত ঝোঁকটা চা-পানের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও আত্মিক ক্ষতির রুক্ষ বিবরণের দিকেই বলে মনে হয় । নিতান্ত অসচেতন উদাসী আয়েশী মনোভাব ও লাগামছেঁড়া-মাত্রাছাড়া বিলাসিতার কারণেই বাঙালি যে “ইংরেজের কথায়” চা-পানের অভ্যাসে ক্রমেই নিমজ্জিত হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদী শোষকের বিজ্ঞাপনে প্রলুদ্ধ হয়ে চা পান করছে― এ সিদ্ধান্তে তিনি আগাগোড়া নিঃসন্দেহ ছিলেন বোঝা যায়।

আমরা ধারণা করতে পারি, হয়তোবা তাঁর ভেতরে গভীর ক্ষোভ নিহিত ছিল আসলে বাঙালির এই আয়েশী মনোভঙ্গিকে কেন্দ্র করেই। এবং এই প্রবন্ধের পরও তিনি চায়ের বিরুদ্ধে আরো দুটি প্রবন্ধ রচনা করেন যথাক্রমে বাংলা ও ইংরেজিতে: চা-পান ও দেশের সর্বনাশ এবং Evils of Tea Drinking। শুধু কলমের লেখায় নয়, তুলির রেখাতেও এক শিল্পী চেয়েছিলেন চা-পান ও চা-সেবনকারীদের পরোক্ষভাবে খানিক ব্যঙ্গ করতে। প্রফুল্লচন্দ্রের আন্দোলন চলবার সময়ই “বসুমতী” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সে সময়ের পরিচিত অঙ্কণশিল্পী হরিপদ রায়ের আঁকা এক ব্যঙ্গচিত্র, শিরোনাম পাক্কা চা-খোর।

ছবিতে দৃশ্যমান সেই চা-খোরের স্বাস্থ্য ভঙ্গুর, গাল তোবড়ানো, খালি পা, চোখজোড়া কোটরাবদ্ধ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথার চুল উশকো-খুশকো ও হাতে অমোঘ নিয়মেই একটি চায়ের কাপ। একটি টেবিলে সে বিশাল বড় এক চায়ের কেটলি ও একখানা পিরিচ সামনে রেখে চেয়ারে উপবিষ্ট। মাটিতে পড়ে আছে অগুণতি নিঃশেষিত সিগারেটের দগ্ধ ফিল্টার। টেবিলের ওপরও দেখা যায় একটি জলন্ত সিগারেট ― সিগারেটের খোলা প্যাকেট ও দেশলাই-বাক্সও চোখে পড়ে।

কার্যত চা সেবনকারীমাত্রেই যে ভয়ানক বাজে স্বাস্থ্যের অধিকারী ও দৃশ্যত অর্ধোন্মাদ গোছের ― হরিপদ রায় তাঁর আঁকা এই কার্টুনের মাধ্যমে শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মানসপটে এহেন একটি নেতিবাচক ধারণা জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠা করতেই ইচ্ছুক ছিলেন কি? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অবশ্য সহজ নয়।

চায়ের প্রচার ও ইংরেজের বিপণন কৌশল

পূর্বে উল্লেখিত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের “চা-এর প্রচার ও দেশের সর্বনাশ” প্রবন্ধ থেকেই একটি কৌতুহলোদ্দীপক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি জানাচ্ছেন, ইংরেজরা চা পানের দিকে বাঙালিদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য কলকাতার দুই বড় চৌরাস্তা, বৌবাজার ও ঠনঠনিয়ার মোড়ে চায়ের দোকান স্থাপন করেছিল, যেখান থেকে বিনামূল্যে সবাইকে চা তৈরি করে খাওয়ানো হতো― বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ক্ষুদ্র মোড়কে এক পয়সার চা পাতাও বিনা পয়সায় বিলি করা হতো ।

দেশভাগের পর, ১৯৫১ সালেও বরিশাল শহরে এমন কার্যক্রম চলতে দেখা যেত। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন নদীপথে চা পানের সপক্ষে প্রচার করে বেড়াতো টি অ্যাসোসিয়েশনের নৌবহর। বিশাল এক কেটলিশোভিত মোটরগাড়ি চায়ের সপক্ষে সুনিপুণ প্রচার চালিয়ে বেড়াতো বাংলার বিভিন্ন মফস্বল শহরেও।

ইংরেজ আমলে বিভিন্ন রেলস্টেশনে স্থাপিত চা সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ড

কার্যত এসবই ছিল ইংরেজদের উর্বর মস্তিস্কপ্রসূত বিপণন কৌশল। ইউরোপে তখন চায়ের বাজারে মন্দা ধরেছিল বলে কেউ কেউ ধারণা করেন, সেজন্যই নাকি বাঙালি জাতের মধ্যে বাজার ধরবার জন্য এইসব নাছোড়বান্দা কিন্তু রোমাঞ্চকর চেষ্টা। “ন্যায়-অন্যায় জানিনে”, তবে শুধু এটুকুই বলবো রাস্তাঘাটে বিনা পয়সায় চা খাওয়ানো বা চা পাতা বিলি করার অভিনব ঘটনার মতোই বঙ্গদেশে চা কোম্পানির বিজ্ঞাপনী কৌশলও ছিল দারুণ ব্যতিক্রমি, ভীষণ চমকপ্রদ এবং বেশ মজাদারও কখনোসখনো।

তখনকার দিনে ভারতবর্ষের বড় বড় রেল স্টেশনে টি বোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছিল চা সংক্রান্ত নানারকমের রঙিন ও চিত্তকর্ষক বিজ্ঞাপনী ফলক। অবিভক্ত ভারতবর্ষের জনগণের মধ্যে প্রচলিত প্রায় সব প্রধান ভাষাতেই এসব ফলক লেখা হয়েছিল। বাংলাদেশের রংপুর জেলার কাউনিয়া ও পাবনার ঈশ্বরদি স্টেশনে গেলে এখনও নজরে পড়তে পারে এরকম কিছু সেকালের সাইনবোর্ড।

তারপর যে অঞ্চলে যে ভাষা চালু, সেখানে ঠিকঠিক সেই ভাষায় বক্তব্য লিখে বসিয়ে দেওয়া হতো ফলকগুলো। ফলকের নকশা বা ছবি অবশ্য সবখানেই একরকম থাকতো। যেমন, একটি সাইনবোর্ডে দেখা যায় সাদা কুর্তা ও লালরঙা ফেজটুপি পরিহিত এক যুবকের ছবি, যথারীতি হাতে চায়ের কাপ, নিচে লেখা: থাকলে মায়ের, বাপের আশীর্ব্বাদ/ ভাল চা আর কাপড় যায় না বাদ।

আবার কোনো ফলকে মেলে চায়ের নানাবিধ গুণগান, কোনোটিতে আবার সগর্বে ঘোষণা― চা-ই হলো “একমাত্র গ্রীষ্মের শীতল পানীয়”। হলুদ রঙের আরেকটি ফলকে নজরে পড়ে ওপরপানে সাদা হরফে বড় করে লেখা গরম চা, সাথে ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে ঘোমটা টানা এক বাঙালি বধূর সাদামাটা প্রতিকৃতি, একটু নিচেই তুলনামূলক ক্ষুদ্র অক্ষরে চা সম্পর্কে দুই লাইনের পদ্য: যাহাতে নাহিক মাদকতা দোষ/কিন্তু পানে করে চিত্ত পরিতোষ। এখানে খুব সম্ভবত ইংরেজ কবি উইলিয়াম কুপারের The cups that cheer, but not inebriate লাইনটিরই চমৎকার ভাবানুবাদ করে সাইনবোর্ডে বসিয়ে দিয়েছিলেন টি বোর্ডের কোনো দক্ষ বিপণন পরিকল্পনাকারী ।

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার বক্তব্য নিয়ে পূর্বাশা পত্রিকায় প্রকাশিত সেন্ট্রাল টি বোর্ডের বিজ্ঞাপন

তখনকার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত চায়ের বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গে আসা যাক এবার। পূর্বাশা পত্রিকায় প্রকাশিত ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল টি বোর্ডের একটি বিজ্ঞাপনের কথাই প্রথম বলি। এখানে “মডেল” হয়েছেন বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, তাঁর নামের ওপরেই দেখা যাচ্ছে এক আপাত সরল ঘোষণা : “আমি রোজ চা খাই, দিনে অন্তত দু’বার করে। চা পানে স্বাস্থ্যহানি হয় বলে আমি জানিনে। বরং বরাবর দেখেছি সকাল বেলা এক কাপ চা খাওয়ার পর দেহ-মনের জড়তা দূর হয়ে যায় এবং কাজে বেশ উৎসাহ আসে।

নিছকই সাদামাটা বিবৃতি, কিন্তু বিজ্ঞাপনের বিন্যাস ও ভাবনার চোরাস্রোতের দিকে একটু খেয়াল করে তাকালে এর ভেতরের উচ্চাভিলাষী উদ্দেশ্যটা নজরে পড়তেও পারে। এই বিজ্ঞাপন ছাপা হবার বছর কয়েক আগে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের চা-বিরোধী কঠোর বিদ্রোহ ঢেউ তুলে দিয়েছে শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোজগতের মধ্যে। আচার্যের ওই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমতও হয়েছিলেন অনেকে। তাই টি বোর্ডের দরকার পড়লো প্রফুল্লচন্দ্রের মতোই আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীকে, যিনি কিনা চায়ের সমাদর করে চা শিল্পের অনুকূলে বক্তব্য রাখতে পারবেন।

এভাবেই টি বোর্ড তাদের জ্ঞাতসারে বা অজান্তেই চা-শিল্পকে ঘিরে মুখোমুখি করিয়ে দিয়েছিল বাংলার দুই বিজ্ঞান-সাধককে । শুধু কি এই বিজ্ঞাপন? সমসাময়িক অনুষঙ্গ নিয়ে নানামুখি বিজ্ঞাপনের কারিশমা দেখাতে ভারতীয় চায়ের ব্যবসায়ীদের জুড়ি ছিল না। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী উত্তাপময় সময়ে “প্রবাসী” পত্রিকায় প্রকাশিত ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশান বোর্ডের একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায় এমন বাণীও: অশান্তি-উদ্বেগের গ্লানি চা-ই দূর করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশান বোর্ডের বিজ্ঞাপন, প্রবাসী পত্রিকায়

রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে আরম্ভ করে বাড়ির গৃহিণীদের আকৃষ্ট করে লেখা আবেগঘন কথকতা ― কোনো কিছুই চায়ের বিজ্ঞাপনে অধরা থাকেনি। কোনো বিজ্ঞাপনে ভারতের সর্বধর্মের প্রিয় পানীয় চা এমন বার্তা তো আরেক বিজ্ঞাপনে চায়ের রোগ সারানোর নানাবিধ গুণের বর্ণনা। চায়ের উৎপাদন প্রক্রিয়া, চা ব্যবসার সাফল্য― এসব নিয়ে তো বিজ্ঞাপন রয়েছেই। বিভিন্ন ভারতীয় উৎসবের সাথে মিলিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়াটাও তখন একটা রেওয়াজ হিসেবে ছিল চা কোম্পানিগুলোর ভেতরে। তবে চায়ের বিজ্ঞাপনে সবচেয়ে অভিনবত্ব এনেছিলেন কবি অজিত দত্ত, তখন তিনি সেন্ট্রাল টি বোর্ডের উপদেষ্টা হয়ে আসেন।

তিনি নিজে থেকেই সেখানে ডেকে আনেন চিত্রশিল্পী অন্নদা মুন্সীকে। তাঁর দেশীয় লোকছড়ার আঙ্গিকে লেখা বিজ্ঞাপনী বার্তার সাথে মিলিয়ে অসাধারণ সব ছবি এঁকে লাগসই সঙ্গত করতে থাকেন অন্নদা মুন্সী। একটি উদাহরণ: “ঘুমপাড়ানী মাসি পিসী ঘুম দিয়ে যেও/বাটি ভরে চা দেবো হাসি মুখে খেও/ঘুমপাড়ানী মাসি পিসী ঘুম দিয়ে যা/ খোকার বাপ ঘরে আসবে করতে হবে চা।” অতীব মনোহর ছন্দময় বার্তার সাথে বাংলার গ্রামীণ পটচিত্রের নিখুঁত অণুকরণে আঁকা শিশুকে কোলে করে মায়ের ঘুম পাড়ানোর চিত্রের সমন্বয়ে নির্মিত এই বিজ্ঞাপন যে কাউকে অন্তর থেকে মুগ্ধ করতে সক্ষম, এতে কোনোই সন্দেহ নেই।

তবু এক কাপ চা

চা-পান নিয়ে বাঙালির নানাকরম চাপান-উতোর সেই উনিশ শতক থেকেই চলছে। এই তর্ক থামবার নয় বটে। তবে ভাবাবার মতো অবশ্যই । ঔপনিবেশিক বাংলায় চায়ের প্রচলন ও সেখান থেকে জনপ্রিয় পানীয় হিসেবে এর উত্তরণের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আজও লেখা হয়নি। আশা করি ভবিষ্যতে ইতিহাস বিশারদ কোনো যোগ্য গবেষক আমাদের জীবনে কী করে এই বিদেশি পানীয়টি প্রায় স্বদেশী দ্রব্যের মতোই রীতিমতো অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়লো―তার বিশদ বিবরণ সুচারুভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন। আর চা-পানের অভ্যাস তো আর নিছক উগ্র নেশা নয়, বাঙালির কাছে এ এক সহজিয়া বিলাসিতা।