প্রজাপতি প্রজাপতি

প্রজাপতি লেপিডোপ্টেরা বর্গের অন্তর্গত এক ধরণের কীট। এদের শরীর উজ্জ্বল রঙের এবং এরা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রজাপতির বেশিরভাগ প্রজাতিই দিবাচর বলে এরা সহজেই নজর কাড়ে। এদের মাথায় প্রায় গোলাকার পুঞ্জাক্ষী রয়েছে যা আমরা শুঁড় নামে বলে থাকি। প্রজাপতির ১০ খন্ডে গঠিত দেহ আকৃতিতে অনেকটা বেলনের মত, শেষের ২-৩টি খন্ড যৌনাঙ্গে পরিণত হয়েছে ।

রংবেরংয়ের ফুল, লতাপাতায়, ঝোপঝাড়ে বিচিত্র বর্ণের নানা প্রজাপতি যখন উড়ে বেড়ায তখন মন জুড়িযে যায় । রংধনুর সব রং যেন প্রজাপতির পাখায় উঁকি দেয় । মৌমাছিল মতো প্রজাপতিও ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়, মধু খায়, পানা মেলে ফুলের সঙ্গে ভাব জমায় । স্যাঁতসেঁতে আলো আঁধারী, ঝরণা, পাহাড়ি অরণ্যে প্রজাপতির মেলা বসে । আমাদের দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশীর ভাগ জঙ্গলে পুষ্পবৃষ্টির মতো প্রজাপতির ঝাঁক উড়ে বেড়ায় । বিশেষ করে রাঙ্গামাটির নির্জন জঙ্গলে দেখতে পাওয়া যায় প্রজাপতির হাট । প্রকৃতির কি বিচিত্র খেলা ফুটে উঠে সেই হাটে ।

নানা রংয়ের প্রজাপতি ছুটে বেড়ায় গাছের বিভিন্ন শাখায় । শিল্প - সাহিত্য – সংস্কৃতি লোকগাথা সমাজের নান দর্পণে প্রজাপতির উল্লেখ আছে । পৃথিবীতে প্রায় ১৮ হাজার প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে । ভারতবর্ষে এ প্রজাতির সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার । এ অবধি বাংলাদেশে প্রজাপ্রতির প্রায় ২০০ টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, প্লেইন টাইগার, কমন ক্রো, প্লাম জুডি, ডিঙ্গি বুশব্রাউন, কমন ডাফার, এপফ্লাই, পি ব্লু, টাইনি গ্রাস ব্লু, ওক ব্লু, কমন সেইলর, কম রোজ, ব্লু মরমন , স্ট্রাইপড অ্যালব্যাট্রস, মটিলড ইমিগ্রান্ট, কমন গ্রাস ইয়েলো, স্ট্রাইপড পাইরট, মানকি পাজল, ব্লু প্যানসি ও পেইন্টেড লেডি ।

প্রজাপতির জন্ম – বৃত্তান্ত বড় বিচিত্র । প্রথম অবস্থায় এদের চেহারা শুঁয়োপোকার মতো দেখতে লাগলে । তখন কেবল খাই খাই ভাব করে :p । ধীরে ধীরে রূপান্তরের মাধ্যমে খোলস পাল্টে প্রজাপতির আকার নেয় । এদের রংয়ের বৈচিত্র্য তার পাখায় । শুঁড়ের সাহায্যে এরা গন্ধ নেয় । শ্রবণ , স্বাদ ক্ষমতাও যথেষ্ট । মিষ্টি ফুলের রস এদের প্রিয় খাদ্য । উচ্চতা, জলবায়ু, অরণ্যের পরিবেশ প্রজাপতির ওপর নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলে । ভারতের সিকিম রাজ্যকে বল হয় প্রজাপতির দেশ । ভারতের পুরনো ইম্পিরিয়াল গেজেটে উল্লেখ হয়েছে সিকিমে ৬০০ এরও বেশী প্রজাপতি রয়েছে । বিশ্বের নানা অঞ্চল থেকে প্রজাপতি প্রেমিক – গবেষক সিকিম আসেন এদের খোঁজে ।

পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় প্রজাপতির আয়ু ৩-৬ সপ্তাহ । আবার কখনো ৩ থেকে কয়েক মাসও হতে পারে । এদের শত্রু অনেক । পাখি , টিকটিকি , মাকড়সা . গিরগিটি এবং বিভিন্ন পোকামাকড় প্রজাপতির প্রধান শত্রু । যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া , ফ্লোরিডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রজাপতির বিশাল দল ঝাঁকে ঝাঁকে দেখতে পাওয়া যায় । প্রজাপতি ৩ হাজার মাইল পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে । পেইনটেড লেডিস প্রজাপতি একটানা উড়ার ব্যাপারে সবাইকে টেক্কা দেয় ।



সাধারণত প্রজাপতিকে পরিবর্তন, আনন্দ, ভালোবাসা এবং রূপান্তরের প্রতীক বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এদের সম্পর্কে ভয়ানক সব মিথ প্রচলিত আছে । যাই হোক চলুন জেনে নেয়া যাক মিথগুলো। গ্রিক মিথঃ প্রাচীন গ্রীক শব্দে psyche হলো প্রজাপতি। আর psyche অর্থ হলো 'আত্মা' অথবা মন। গ্রীকরা বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি মথ প্রজাপতি থেকে বের হয়ে আসার সাথে সাথে মানুষের আত্মার জন্ম হয়। জাপানী মিথঃ যার ঘরে প্রজাপতি প্রবেশ করে, সবচেয়ে পছন্দের ব্যাক্তিটি তাকে দেখতে আসে।

চাইনিজ মিথঃ দুটি প্রজাপতি একত্রে উড়া কে চাইনিজরা ভালোবাসার প্রতীক হিসাবে দেখে। ফিলিপাইনের মিথঃ ফিলিপাইনে মনে করা হয়, কোন ঘরে যদি কালো প্রজাপতি প্রবেশ করে অথবা এর মথ আনা হয় বা জন্ম হয়, তবে ঐ পরিবারের কেউ মারা গেছে বা শীগ্রই মারা যাবে। ইউরোপের মিথঃ প্রাচীন ইউরোপীয়ানরা মনে করতো মানুষের আত্মা নেয়া হয় প্রজাপতির রূপে, তাই তারা প্রজাপতিকে খুবই শ্রদ্ধার সাথে এবং ভয়ের সাথেই দেখতো।

আইরিশ মিথঃ আইরিশরা বিশ্বাস করে, মৃত ব্যাক্তিদের আত্মা স্বর্গে প্রবেশের আগ পর্যন্ত প্রজাপতি হয়ে থাকে। মক্সিকো মিথঃ মেক্সিকোর কিছু কিছু আদিবাসী বিশ্বাস করে যে প্রজাপতি হলো পৃথিবীর উর্বরতার প্রতীক। মায়া মিথঃ মায়ারা মনে করে মৃত যোদ্ধাদের আত্মা প্রজাপতির রূপে পৃথিবীতে বিচরণ করে।

আসামের নাগাস অঞ্চলের লোকদের বিশ্বাস যে আত্মা পৃথিবীতে এর রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হচ্ছে। এর সর্বশেষ ধাপে প্রজাপতি হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই প্রজাপতির মৃত্যূর সাথে সাথে আত্মার রূপান্তর ও শেষ হয়। কারো গায়ে প্রজাপতি বসাও সৌভাগ্যের লক্ষণ বলে মনে করা হয়। আমাদের দেশে কারো গায়ে (অবিবাহিত প্রাপ্ত বয়স্ক) প্রজাপতি বসলে তার বিয়ের ফুল ফুটলো বলে ধরে নেয়া হয় । সাদা প্রজাপতিকেও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে এবং কালো প্রজাপতি মৃত্যূর লক্ষণ বিবেচনা করা হয় । অবশ্য আমাদের দেশে সাদা আর কালো প্রজাপতিকে আলাদা করে বিবেচনা করা হয় না।