কলকাতা শহরের ট্রাম ইতিহাস

ট্রাম, নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কলকাতার রাস্তায় ধীরেধীরে চলা অলস এক গাড়ীর ছবি। সব গাড়ী চলে গেলেও তার কোন পরোয়া নেই। সে চলে নিজের মরজিমাফিক। এই শহরের সাথে ট্রামের নাড়িরটান। এশিয়ার প্রথম ট্রামগাড়ি কিন্তু আমাদের এই শহরেই প্রথম চলাচল শুরু করে। সে এক দীর্ঘ ইতিকথা। কলকাতার ট্রাম এক জীবন্ত কিংবদন্তী।

কলকাতা শহরে ট্রাম চালাবার বিষয় নিয়ে ভাবনা-চিন্তার সূত্রপাত হয় ১৮৬৭ সাল থেকেই। ১৮৭০ নাগাদ ভারত সরকার বেঙ্গল গভর্নমেন্টকে শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে পণ্য পরিবহনের উদ্দেশে ট্রাম চালাবার প্রস্তাব দিল। ভারত সরকারের প্রস্তাব অনুসারে বাংলার গভর্নমেন্ট শিয়ালদহ থেকে পশ্চিমে গঙ্গার তীরে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ট্রামের লাইন পাতবার জন্য এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করল। কারণ, এই আর্মেনিয়ান ঘাটের কাছ থেকেই তখনকার দিনে হাওড়া স্টেশনে যাওয়ার কাঠের খোলা ব্রিজে উঠতে হত। আর এখানেই ছিল ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলের কলকাতা স্টেশন বা টিকিটঘর।

অর্থাৎ এখান থেকে টিকিট কেটে নিয়ে ব্রিজে উঠে হুগলি নদী পেরিয়ে হাওড়ায় গিয়ে ট্রেন ধরতে হত। শিয়ালদহ থেকে হাওড়া পর্যন্ত ট্রাম চালাবার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল— গঙ্গার পূর্বপাড়ের গ্রামগুলি থেকে যে সব পণ্য শিয়ালদহে আসত, ট্রামে করে সেগুলিকে হাওড়া স্টেশনে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এক সুষম বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

যাই হোক, ১৮৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমে দেড় লক্ষ টাকা ব্যয়ে শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ট্রাম লাইন পাতার কাজ শেষ হল। ওই মাসেরই ২৪ তারিখে দুটি ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি দিয়ে যাত্রারম্ভ হল। প্রথম গাড়িটিতে ছিল একটি প্রথম শ্রেণী ও দুটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা। প্রত্যেক কামরার আগে দুটি করে মোট ৬টি ঘোড়া-সহ তিন কামরার ট্রাম। দ্বিতীয় গাড়িটিতে একটি প্রথম শ্রেণী ও একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা।

এতেও প্রত্যেক কামরার সঙ্গে দুটি করে মোট চারটি ঘোড়া। শুরু হল ভারতবর্ষে প্রথম ট্রাম যাত্রা। পণ্য পরিবহনের জন্যই ট্রাম চালাবার কথা ভাবা হলেও প্রথম থেকেই ট্রাম হয়ে উঠেছিল যাত্রী পরিবাহী যান। মানুষজনের উৎসাহ থাকলেও এই ট্রাম কিন্তু আর্থিক ভাবে লাভজনক হয়ে উঠতে পারল না। প্রায় ৯ মাস চলবার পর লোকসানের কারণে এটা বন্ধ করে দিতে হয়।



এই ঘটনার বছর পাঁচেক পরে কলকাতার কয়েকজন অগ্রণী ব্যবসায়ী বাণিজ্যিক ভাবে ট্রাম চালানোর উদ্দেশে গঠন করলেন ‘ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি’। এরপর ১৮৭৯ সালে কলকাতা কর্পোরেশন ও ওই ট্রাম কোম্পানির মধ্যে কলকাতার আটটি অঞ্চলে ট্রাম চালাবার জন্য এক চুক্তি সম্পাদিত হল। ১৮৮৪-র মধ্যে ওই অঞ্চলগুলিতে ট্রামের লাইন পাতবার কাজ সম্পূর্ণ হয়।

কলকাতায় বাণিজ্যিক ভাবে প্রথম ট্রাম চালু হয় ১৮৮০ সালের পয়লা নভেম্বর তারিখে, শিয়ালদহ থেকে বউবাজার হয়ে ডালহৌসি পর্যন্ত। এরপর একে একে চিৎপুর রোড, চৌরঙ্গি, ধর্মতলা ষ্ট্রিট, ষ্ট্র্যাণ্ড রোড, শ্যামবাজার, খিদিরপুর, ও ওয়েলেসলি ও অঞ্চলে ট্রাম চলাচল আরম্ভ হয়।

আগেই জেনেছি যে প্রথম দিকের এই সব ট্রাম টেনে নিয়ে যেত ঘোড়া। ১৮৮২ সালের মে মাসে চৌরঙ্গির ট্রাম-পথে প্রথম বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রাম চালানো হয় পরীক্ষা মূলক ভাবে। এরপর কিছু কিছু ট্রাম-পথে বাষ্পীয় ইঞ্জিন টানা ট্রামগাড়ির প্রবর্তন হয়।

আর, আজকের এই বিদ্যুৎচালিত ট্রামগাড়ি প্রথম চলে খিদিরপুর ট্রাম-পথে, ১৯০২ সালের মার্চের সাতাশ তারিখে। তারপর একে একে কালীঘাট, ওয়েলিংটন স্ট্রিট, ধর্মতলা স্ট্রিটে বিদ্যুৎ চালিত ট্রাম চালানো আরম্ভ হয়। ওই বছরের মধ্যেই কলকাতার অন্যান্য অংশের ট্রামপথেও বিদ্যুৎচালিত ট্রাম প্রবর্তিত হয়। আর হাওড়া শহরে আলাদা করে ট্রাম চালানো শুরু হয় ১৯০৫ থেকে।

তার পর কলকাতা-হাওড়া সংযোগকারী নতুন হাওড়া ব্রিজ (আজকের রবীন্দ্রসেতু) নির্মিত হবার পর, ১৯৪৩ থেকে কলকাতা-হাওড়া দুই শহরের ট্রামপথ জুড়ে দেওয়া হল। কিন্তু সে ব্যবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭০ নাগাদ হাওড়া শহরের ট্রামপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, শুধু কলকাতা থেকে হাওড়া স্টেশন যাওয়ার জন্য ট্রামপথটি রেথে। কিন্তু রবীন্দ্র সেতুর উপর চাপ কমাবার জন্য সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছুকাল আগে।

স্বাধীনোত্তর যুগেও বেশ কিছুকাল ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি ছিল ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৫১ থেকে প্রস্তুতি নিতে নিতে শেষে এক অর্ডিন্যান্স জারি করে, ১৯৬১-র ৮ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাম কোম্পানির ভার গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ট্রাম কোম্পানির ইতিহাস শুধুই লোকসানের ইতিহাস। লোকসান কমাতে ১৯৯২-এর ৪ নভেম্বর থেকে ট্রাম কোম্পানি বাস চালানো আরম্ভ করে। একটা সময়ে সারা কলকাতা জুড়ে প্রায় ৪৯ মাইল বা তার বেশি ট্রামপথ ছিল। এখন তা অনেকটাই কমে গিয়েছে।