রেলওয়ের ইতিহাস

রেলওয়ে উনিশ শতকে প্রবর্তিত হয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিপ্লবের সূচনা করে। জর্জ স্টিফেনসনের যুগান্তকারী প্রচেষ্টায় ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বের প্রথম রেলওয়ে ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ২৬ কিমি দূরবর্তী ডার্লিংটন পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উদ্বোধন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেলওয়ের প্রথম উদ্বোধন হয় মোহাওয়াক থেকে হাডসন পর্যন্ত ১৮৩৩ সালে। জার্মানিতে এর প্রথম উদ্বোধন হয় ১৮৩৫ সালে নুরেমবার্গ থেকে ফুর্থ পর্যন্ত, ইতালিতে হয় ১৮৩৯ সালে, ফ্রান্সে ১৮৪৪ সালে, স্পেনে ১৮৪৮ সালে এবং সুইডেনে ১৮৫৬ সালে। রেলওয়ের প্রবর্তনে ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলাও পিছিয়ে ছিল না।

রেলপথ বিকাশের ইতিহাস উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় উপনিবেশিক বাংলায় রেলওয়ে স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে ইংল্যান্ডে চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা হতে থাকে। এরূপ পরিকল্পনার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধাদিসহ বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা।
ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডালহৌসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক পর্ষদের কাছে ভারতবর্ষে রেলওয়ে স্থাপন কাজ শুরু করার জন্য অনেকগুলি প্রস্তাব পাঠান। ১৮৪৪ সালে আর.এম স্টিফেনসন কলকাতার সন্নিকটে হাওড়া থেকে পশ্চিম বাংলার কয়লাখনি সমৃদ্ধ রানীগঞ্জ শহর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি গঠন করেন।

তবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে ও সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। ইতোমধ্যে, ১৮৫০ সালে গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়ে নামক কোম্পানি মুম্বাই থেকে থানা পর্যন্ত ৩৩ কিমি দীর্ঘ রেললাইন স্থাপন করতে থাকে। লাইনটি উদ্বোধন করা হয় ১৬ এপ্রিল ১৮৫৩ সালে। এটিই ছিল ব্রিটিশ ভারতে রেলওয়ের প্রথম যাত্রা। ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিমি রেললাইনের উদ্বোধন হয় ১৮৫৪ সালে এবং এর মাধ্যমে চালু হয় বাংলার প্রথম রেললাইন।

বর্তমান বাংলার ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ব্রিটিশ আমলেই বিবেচনা করা হয়েছিল। ১৮৫২ সালে কর্নেল জে.পি কেনেডি গঙ্গা নদীর পূর্বতীর ধরে সুন্দরবন হয়ে ঢাকা পর্যন্ত রেললাইন বসানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু এর মধ্যেই ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ সরকার বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) দখল করে। বার্মাকে সরাসরি ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করার রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণেই কলকাতা ও বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের প্রশ্নটি প্রকট হয়। ১৮৫৫ সালে বাংলায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরের মেজর অ্যাবার ক্রমবি মাঠ পর্যায়ে জরিপ করে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এতে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নামে একটি কোম্পানি গঠনের সম্ভাব্যতা উলে­খ করা হয়। পরবর্তী দুই বছরে প্রবীণ রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার পুর্ডন-এর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার রূপ নেয়।



১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত রেলপথ উদ্বোধন করে। ১৮৭৪ সাল থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে নর্থ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নামে ব্রিটিশ সরকার একটি নতুন ২৫০ কিমি দীর্ঘ মিটারগেজ (১,০০০ মিমি) রেললাইন স্থাপন করে। লাইনটি পদ্মার বামতীর ঘেঁষে সারা থেকে চিলাহাটি হয়ে হিমালয়ের পাদদেশস্থ ভারতের শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই লাইন পূর্বে পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া এবং পশ্চিমে পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত দীর্ঘ।

একই সময়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে সারা-র উল্টোদিকে পদ্মার ডান পাশে অবস্থিত দামুকদিয়া থেকে পোড়াদহ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন সংযোজন করে। এতে রেলওয়ে নিয়ন্ত্রিত স্টিমারের পক্ষে ফেরিতে পদ্মা নদী পারাপারে সুবিধা হয়। মাঝপথে একমাত্র পদ্মা নদীর এই প্রতিবন্ধকতা ছাড়া কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাত্রা ছিল সরাসরি। ১৮৮৪ সালে ১ জুলাই ব্রিটিশ সরকার, কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়েকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং এর নতুন নামকরণ করে ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে।

বিশ্বজুড়ে পাটের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য প্রধান পাট উৎপাদনকারী এলাকা ঢাকা এবং ময়মনসিংহ থেকে কলকাতা বন্দরে পাট সরবরাহ করার জন্য উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৮৮৫ সালে মূলত কাঁচা পাট নদীপথে কলকাতায় আনার জন্য ঢাকা স্টেট রেলওয়ে নামে খ্যাত ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৪৪ কিমি দীর্ঘ মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করা হয়। ক্রমান্বয়ে এটিকে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর হয়ে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট এবং পরবর্তীকালে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ১৮৮৭ সালে আরও ভাল ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে নর্দান বেঙ্গল রেলওয়ে এবং ঢাকা স্টেট রেলওয়েসহ কাউনিয়া থেকে কুড়িগ্রাম (ধরলা) পর্যন্ত ন্যারোগেজের (৭৬২ মিমি) রেললাইনকে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে একীভূত করা হয়।

একই কারণে ১৮৮২-৮৪ সালের মধ্যে সেন্ট্রাল রেলওয়ে নামে পরিচিত বনগাঁ-যশোর-খুলনা ব্রডগেজ রেললাইন এবং ১৮৯৯ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে শান্তাহার থেকে ফুলছড়ি (তিস্তামুখ ঘাট) পর্যন্ত ৯৪ কিমি মিটারগেজ লাইন চালু করা হয়েছিল। এ দুটি লাইনকে যথাক্রমে ১৯০৪ সালে ১ এপ্রিল এবং একই বছর ১ জুলাই ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের সঙ্গে আত্মীকরণ করা হয়। ১৯০৫ সালে কাউনিয়া ও বোনারপাড়ার মধ্যে ৪৪ কিমি মিটারগেজ রেল লাইন চালু হয়। এভাবে ঢাকা এবং রাজশাহী বিভাগের ব্যাপক এলাকায় রেলপথ বিস্তার লাভ করে।

কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ এবং আসামের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য পদ্মার উপরে সেতু নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়ে। ১৯১৪ সালে পদ্মার উপরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ প্রকল্প বাস্তবায়ন উপলক্ষে সারা থেকে শান্তাহার পর্যন্ত মিটারগেজ লাইনকে ব্রডগেজ লাইনে রূপান্তর করা হয়। কলকাতা থেকে দিলি­, মাদ্রাজ ও মুম্বাই পর্যন্ত প্রধান রেলপথগুলি ছিল ব্রডগেজ মাপের। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ দুই লেনবিশিষ্ট হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রেল চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়। ১৯২৪ সালের জুলাই মাসে শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ৯৫ কিমি এবং ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ।

পার্বতীপুর থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত ৬৭ কিমি রেলপথ মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে উত্তরবঙ্গে শিলিগুড়ি থেকে চিলাহাটি হয়ে কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য স্থানে মালামাল সরবরাহ ও যাত্রী চলাচল গাড়ি বদল ছাড়াই সম্ভব হয়ে ওঠে। ১৯১৫ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নাম থেকে সরকারিভাবে ‘স্টেট’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ সরকার তিন প্রকার গেজের (প্রস্থের) রেলপথ প্রবর্তন করে, যথা: ব্রড (১,৭৬৭ মিমি), মিটার (১,০০০ মিমি) এবং ন্যারো (৭৬২ মিমি)। নিকটতম নদীবন্দর অথবা প্রধান প্রধান রেলপথের মাঝে সংযোগ স্থাপনের জন্য স্বল্প দূরত্বের রেললাইন স্থাপন করা হয়। অধিকতর সম্ভাবনাপূর্ণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রেলপথের পরিবর্ধনও করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী গাড়িবদল ব্যতিরেকে রেলযোগাযোগ আরও সুসঙ্গত করার লক্ষ্যে রেলপথ রূপান্তরের কাজও অব্যাহত থাকে। ১৯১৯ সাল নাগাদ সরকার ও কোম্পানি কর্তৃক সর্বমোট ১,৮০৬.১৬ কিমি রেলপথ নির্মিত হয়।

বেসরকারি রেলওয়ে কোম্পানিগুলি নির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী কাজ করত। চুক্তিপত্রের শর্তাদিতে ছিল জমি, সরকারি সাহায্য, মুনাফা বহন, ভাড়ার হার ছাড়াও বিশেষ দায়িত্ব পালন, যেমন চিঠিপত্র, সৈন্যসামন্ত, পুলিশ, সরকারি অফিসার-কর্মচারী বা সরকারি টাকা পয়সা ও বহন সরকারি মালামাল পরিবহণ ইত্যাদি প্রসঙ্গে।

ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে চায়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলি চীন থেকে চা আমদানি শুরু করে। ১৮৩০ সালে বিভিন্ন কারণে চীন থেকে চা আমদানি বন্ধ হওয়ায় ব্রিটিশ কোম্পানিগুলি হিমালয়ের দক্ষিণাংশে আসাম (সিলেট) ও উত্তরবঙ্গে (দার্জিলিং ও কুচবিহার/আলীপুর দুয়ার) চা বাগান স্থাপনের কাজ শুরু করে। চা বাগানগুলির উৎপাদন বাজারজাত করার জন্য ১৯০২ সালে বেঙ্গল ডুয়ার্স ন্যারোগেজের রেলপথটি কাউনিয়ার উত্তরে নর্থ বেঙ্গলের কুচবিহার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে ১৯৪১ সালে প্রশাসনিক ভাবে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

এর দক্ষিণাংশ বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের আওতায়। কেবল বাহাদুরাবাদ-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইন ছাড়া ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের পুরো অংশটাই ছিল ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম পাশে। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতার শিল্প, বাণিজ্য ও শহরতলি এলাকার চাহিদা পূরণের জন্য এমনভাবে বিস্তার লাভ করে যে পুরো রেলওয়ে ট্র্যাকের বিন্যাস কলকাতামুখী হয়ে ওঠে।

১৮৩০ সালের দিকে মূলত আসাম অঞ্চলের সিলেট এলাকায় চা কোম্পানিগুলির স্থাপনা শুরু হয়। যেসব চা উৎপাদনকারী কোম্পানি আসামের চা বাগানে প্রচুর বিনিয়োগ করেছিল তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৯১ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপন করা হয়েছিল। এর প্রধান দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে। আসামসংলগ্ন সমৃদ্ধশালী জেলাগুলিতে চা এবং অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা নিতে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়ে।

১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডে গঠিত আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি এদেশে রেলপথ নির্মাণের দায়িত্ব নেয়। ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল­া ১৫০ কিমি মিটারগেজ লাইন এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৬৯ কিমি রেললাইন জনসাধারণের জন্য খোলা হয়। ১৮৯৬ সালে কুমিল্লা-আখাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ স্থাপন করা হয়। কিন্তু কলকাতা বন্দর এবং আশপাশের নদীভিত্তিক এলাকার কিছু স্বার্থান্বেষী স্টিমার কোম্পানি চট্টগ্রামে সমুদ্র বন্দরের স্থাপনা ও উন্নতি সাধনে বাদ সাধে। শেষ পর্যন্ত ১৮৯৭ সালে প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখেও, ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম বন্দরে জেটি নির্মাণ অনুমোদন করে। বন্দর প্রশাসন স্বয়ং ভিন্ন প্রশাসন হওয়া সত্ত্বেও, বন্দর নির্মাণ কজের ভার দেওয়া হয় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কোম্পানির ওপর।

বিভিন্ন রেলপথের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংযোগপথের অংশগুলিতে রেল যোগাযোগের কাজ চলতে থাকে। ১৯০৩ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পরিচালনায় বেসরকারি লাকসাম-নোয়াখালী রেল শাখা চালু হয়। ১৯০৫ সালে এই লাইনটি সরকার কিনে নেয়, এবং ১৯০৬ সালে ১ জানুয়ারি আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে একীভূত করে দেয়। টঙ্গী এবং আখাউড়ার মধ্যে রেললাইন স্থাপিত হয় ১৯১০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে, সিলেট এবং কুলাউড়ার মধ্যে ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালে, শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ লাইন ১৯২৮ সালে, শায়েস্তাগঞ্জ-বেল্লা এবং ফেনী-বেলুনিয়ার মধ্যে ১৯২৯ সালে, চট্টগ্রাম-ষোলশহর লাইন ১৯২৯ সালে, ষোলশহর-নাজিরহাট লাইন ১৯৩০ সালে, ষোলশহর এবং দোহাজারী লাইন ১৯৩১ সালে।

১৯১২-১৯১৮ সালের মধ্যে ময়মনসিংহ-ভৈরববাজার রেলওয়ে কোম্পানি ময়মনসিংহ-গৌরীপুর, গৌরীপুর-নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ-জারিয়া-ঝঞ্চাইল, গৌরীপুর-ভৈরববাজার রেললাইন স্থাপন করে। ময়মনসিংহ-গৌরীপুর-ভৈরব রেললাইন ছিল আসাম-বেঙ্গল রেল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাধীনে। ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগের জন্য ১৯৩৭ সালে ৬ ডিসেম্বর মেঘনা নদীর উপর রেলসেতু উদ্বোধন করা হয়। ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে অধিগ্রহণ করে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে একীভূত করে এবং এর নতুন নামকরণ হয় বেঙ্গল-আসাম রেলওয়ে।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত বিভক্তির পর বেঙ্গল-আসাম রেলওয়ে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান উত্তরাধিকারসূত্রে পায় ২,৬০৬.৫৯ কিমি রেললাইন এবং তা ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর) নামে পরিচিত হয়। ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এর নতুন নামকরণ হয় পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে। ইবিআর পায় প্রায় ৫০০ কিমি ব্রডগেজ এবং ২,১০০ কিমি মিটারগেজ লাইন, কিন্তু ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন বা ব্রডগেজ রেললাইনের উপরে চলাচল করার উপযুক্ত রেলযানসমূহ মেরামত করার কোন কারখানা পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। তবে, পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে সৈয়দপুরে একটি মিটারগেজ রেল কারখানা পেয়েছিল।

ইবিআর রেল পরিচালনার ক্ষেত্রে কতগুলি মারাত্মক অসুবিধা ও সমস্যার সম্মুখীন হয়, যেমন, সংযোগবিহীন রেললাইন, যানান্তরকরণের অসুবিধা, যমুনা নদীর দুই ধারে নাব্যতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফেরিঘাটসংলগ্ন রেললাইনের নিত্য স্থানান্তর সমস্যা ইত্যাদি। উপরন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেললাইনের উপর দিয়ে প্রবল ধকল যায়। দেশ বিভাগের আগে পর্যন্ত সেগুলি সঠিকভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়নি।

ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে রেলওয়ের ওপর সার্বিক সরকারি কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রিত হতো একটি মিলিটারি বোর্ডের মাধ্যমে। এরপর ব্রিটিশদের স্বার্থে স্টেট রেলওয়ে ও কোম্পানি রেলওয়ের আনুকূল্যে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কখনও সেন্ট্রাল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট, কখনও স্থানীয় সরকার, কখনও রেলওয়ে ডিরেক্টরেট, আবার কখনও রেলওয়ে বোর্ড নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এর দরুন ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমলে রেলওয়ে ব্যবস্থাপনার উচ্চ স্তরে বহুবার পরিবর্তন ঘটে।

১৮৬০ সালে দি এমপ্লয়ার্স অ্যান্ড ওয়ার্কমেন’স (ডিসপিউট) আইন প্রবর্তন করা হলেও এই আইনটি বাস্তব ক্ষেত্রে নিয়োগকারীর স্বার্থই রক্ষা করত। ১৯২৫ এবং ১৯৩২ সালে এই আইনের কিছু ধারা পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রেলওয়েতে কোন ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকারিতা ছিল না। এর প্রধান কার্যালয় ছিল রেলওয়ে-জেলা লালমনিরহাটে। প্রশাসন এই সংস্থার কার্যক্রমকে স্বাগত জানালেও ১৯২৪ সালে প্রশাসনের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে এর স্বীকৃতি সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়। তবে তা ছিল খুব স্বল্প সময়ের জন্য। ১৯২২ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিকদের জন্য জেলা কল্যাণ সমিতি গঠন করা হয়।

১৯২১ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মচারীরা চা বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সংহতি ঘোষণা করে ধর্মঘট ডাকে। এই ঘটনার মধ্যে দিয়েই দেশের রাজনীতিবিদদের সাথে রেলওয়ে কর্মচারীদের সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল। ১৯২৬ সালে ট্রেড ইউনিয়ন আইনের বিধান অনুযায়ী যেকোন ট্রেড ইউনিয়ন বহিরাগত ব্যক্তিদের সদস্যপদ দান করতে পারত, কিন্তু এ জাতীয় সদস্যের সংখ্যা হতে পারত সর্বোচ্চ শতকরা ৫০ ভাগ। শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হক, এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে রেলওয়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯২৯ সালের ট্রেড ডিসপিউট আইনটি ১৯৩২ সালে কিছুটা পরিবর্তন করা হয় এবং সে অনুযায়ী কোর্ট স্থাপন করে বিবাদ মীমাংসার ব্যবস্থা রাখা হয়।

১৪ দিনের পূর্ব-ঘোষণা ব্যতীত যেকোন ধরনের ধর্মঘট এবং লকআউট ঘোষণা নিষিদ্ধ করা হয়। এই আইন ১৯৩৮ সালে আরও পরিবর্তন করা হয়। ১৯৪২ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ধর্মঘট এবং লকআউটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ১৯৪৭ সালের শিল্প বিরোধ আইন মারফৎ ১৯২৯ সালের আইনকে পরিবর্তন করা হলেও, ধর্মঘটকে অবৈধ ঘোষণা করার বিধানটিকে অপরিবর্তিত রেখে দেওয়া হয়। তবে প্রশাসন ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত ওয়ার্কস কমিটিকে সংবিধিবদ্ধ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিল। নতুন আইনে বিচারক হবার যোগ্যতাসম্পন্ন এক বা একাধিক সদস্যসম্বলিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

রেলওয়ে কর্মচারীদের আন্দোলনের ফলে প্রধান যেসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে: যেসব রেলওয়ে কর্মচারীদের দিবা-রাত্রির যেকোন সময় কাজ করতে হয়, তাদের দায়িত্বের শ্রেণীবিন্যাস, এবং ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক কাজের সর্বোচ্চ সময় (কর্ম ঘণ্টা) ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন নির্ধারণ করা। সরকার ১৯১৯ সালের ওয়াশিংটন কনভেনশন অনুযায়ী দৈনিক ৮ ঘণ্টার ও সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টার কর্মসময় এবং ১৯২১ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটির দিন নির্ধারণ করেছে। এই সূত্র ধরে ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন পাস করা হয় এবং ১৯৩১ সালে তা রেলওয়েতে প্রযোজ্য হয়।

১৯৩৬ সালে দ্য পেমেন্ট অব ওয়েজেস অ্যাক্ট অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়কালে মজুরি প্রদানের বিধান করা হয়। কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইন, ১৮৯১ সালের কারখানা আইন, ১৯২৩ সালে কর্মচারী ক্ষতিপূরণ আইন এবং ১৮৯০ সালে রেলওয়ে আইনের ক্রমধারা অনুযায়ী একাধিক নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করা হয়। ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্যান্য সুবিধাগুলি হচ্ছে হাসপাতাল, কেন্টিন, সমবায় বিপণী, সমবায় গৃহায়ণ প্রকল্প, কল্যাণ ট্রাস্ট ও ঋণদান সমিতি, কর্মচারীদের পোষ্যদের জন্য বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, স্কাউটিং চালু করা ইত্যাদি স্থাপন ও প্রচলন। ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ এবং অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে ভাল সুবিধা ও আচরণ পেত।