কলকাতার রেলপথের ইতিহাস

অতীতের পাতা থেকেকলকাতার রেলপথের ইতিহাস কলকাতার ভাগ্যটাই খারাপ। মুম্বাই থেকে থানের রেলপথ ভারতের প্রথম রেলপথ হবার গর্ব করার সৌভাগ্য পেতে পারতনা যদি দুটি দুর্ঘটনা না ঘটত। প্রথম ইংল্যান্ডের থেকে একটা জাহাজ যাতে রেলের ইঞ্জিন আসছিল সেটা রাস্তা হারিয়ে অষ্ট্রেলিয়ার পশিম উপকুলে গিয়ে হাজির হল আর দ্বিতীয়টা যাত্রী বগী নিয়ে গঙ্গার মোহনাতে ডুবে গেল। আবার সব কিছু নতুন করে সাজানর জন্য যে সময় লেগেছিল তার সুযোগ চলে গেল মুম্বাইএর ভাগ্যে।

১৮৫৩ সালে মুম্বাই তার প্রথম রেল গাড়ি চালাল আর তার ১ বছর পরেই কলকাতা থেকে রেল যাত্রা শুরু হল। প্রথম ট্রেন চলল হাওড়া থেকে হুগলীর মধ্যে, তারিখ ছিল ১৮৫৪ সালের আগষ্ট মাসের ১৫ই। ভাগ্য আমাদের কি রকম, এর ঠিক তিরানব্বই বছর পরে ভারত তার স্বাধীনতা দিবস পালন করল।। হাওড়া তখন এক গ্রাম মাত্র। এক মাটীর তৈরি ষ্টেশন ঘর থেকে একটি ট্রেন সিঙ্গল লাইন ধরে যাত্রা সুরু করেছিল। লাইন পাতা হচ্ছিল প্রথমে রাজমহল পর্যন্ত। এর আগের ইতিহাস আমরা একটু ঘেটে নিই।

রাজ মহলের প্রয়োজন কেন হল। গঙ্গার ধারে এই শহরের উপরে নীল চাষের জন্য বিখ্যাত নীল-কুঠি তৈরী হয়েছিল ১৭৯৬ সালে, আর সিপাহী বিদ্রহের সময় গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের এই শহরটির গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। নদী আর পাহাড়ের মাঝে থাকার জন্য আর সাথে গঙ্গার নাব্যতা থাকার জন্য বৃটিশদের একটা মূল ঘাটি এখানে হয়েছিল। ১৮৫১ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়ান রেলয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার হাওড়া ষ্টেশনের জন্য প্রস্তাব দেন।

কিন্তু দেখা যায় যে ষ্টেসনের জন্য পর্যাপ্ত জমির বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়ে উঠছে না,। এদিকে লাইনের জন্য জরীপের কাজ শুরু করা হয়ে গেছে। গঙ্গার উপরে সেতু তৈরির অসুবিধার কথা ভেবে ঠিক হয় আপাতত লাইন পাতার কাজ শুরু হবে হাওড়া থেকে রাণিগঞ্জ পর্যন্ত। বালী খাল, শ্রীরামপুর অঞ্চল তখন ঘন জঙ্গলে ভরা। জরীপের জন্য তাল গাছের মাথায় বাঁশ বেঁধে জরিপের ভাষায় লাইন অফ সাইট নিয়ে লাইন পাতার রাস্তা পরিস্কার পাবার বন্দোবস্ত করতে হল।

লাইন পাতার কাজ তো শুরু হল কিন্তু তখন ভারতে লোহার কারখানা ছিলনা তাই রেললাইন, ব্রিজের জন্য লোহালক্কড় ইত্যাদি সমস্ত কিছুই ইংল্যান্ড থেকে
আমদানী করা হল। এমন কি যদিও নেপাল থেকে শাল কাঠ, স্লিপারের জন্য পাওয়া যাচ্ছিল তবুও আমেরিকা থেকে ফার গাছের কাঠ ইংল্যান্ডে আনিয়ে তাতে
ক্রিওজোট মাখিয়ে ভারতে পাঠান হতে লাগল। একথা আমরা মনে তাখতে পারি যে সুয়েজ খাল তখন তৈরী হয় নি কাজেই জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে আসতে হত। প্রায় ১৪০০০০ টন লোহার রেল ইত্যাদি এই জন্য ভারতে আনতে হয়েছিল।

১৫ আগষ্ট ১৮৫৪ সালে হাওড়া থেকে হুগলী পর্যন্ত প্রথম ট্রেন চলল। ৩০০০ লোকে প্রথম ট্রেনে চড়বার জন্য দরখাস্ত দেন কিন্তু প্রত্যেকের ভাগ্য সহায় ছিল না।তিনটি প্রথম শ্রেণি, দুটি দ্বিতীয় শ্রেনী আর তিনটে মাল গাড়ীর ফ্ল্যাট তৃতীয় শ্রেণী হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।তাও সমস্ত লোকে টিকিট পায় নি। হিসাবে দেখা যায় যে প্রথম তিন মাসে কোম্পানীর মোট ৬৮০০ পাউন্ড রোজগার হয়েছিল আর প্রায় ১ লাখ ১০ হাজারের মত যাত্রী পরিবহন করা হয়েছিল। ধীরে ধীরে রলে লাইনের বিস্তার হতে লাগল। ১৫ দিনের মধ্যে ট্রেন পান্ডুয়া পর্যন্ত যেতে শুরু করল। ৬ মাসের মধ্যে লাইনের বিস্তার বর্ধমান পর্যন্ত হয়ে গেল আর প্রাথমিক লক্ষ রাজমহল পর্যন্ত লাইন চলে গেল পরে চার বছরের মধ্যেই। ১৮৬০ সালের জুলাই মাসে প্রথম রাজমহল পর্যন্ত ট্রেন চালান হল।



লাইনটাকে ক্রমশঃ বাড়িয়ে দিল্লী পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা এর মধেই হয়ে গেছিল । ৬২ সালে মধ্যে লাইন কাশী পৌঁছে গেল। ১৮৬৩র ৫ ফেব্রুয়ারি হাওড়া থেকে লর্ড এলগিন আর চীফ ইঞ্জিনিয়ার টার্নবুল কে নিয়ে বিশেষ ট্রেন বেনারস রওয়ানা হল। প্রথম রাত জামালপুরে কাটিয়ে পরের দিন বেনারস তারা পৌছলেন। ১৮৬৬ তে দিল্লী পর্যন্ত লাইন চলে গেল। ইতিমধ্যে ১৮৬৭ সালে এলাহাবাদ থেকে জব্বলপুর পর্যন্ত লাইন হওয়াতে মুম্বাই আর কলকাতা এলাহাবাদ হয়ে যুক্ত হয় গেল। জুলে ভার্ণের ৮০ দিনে পৃথিবী প্রদক্ষিন লেখা তার আগেই হয়েছে। ১৮৭৯ সালে বৃটিশ সরকার ইষ্ট ইন্ডিয়ান রেলয়ে কিনে নিয়ে আবার কোম্পানীকেই লীজে কাজ চালানর জন্য দেন।

এদিকে ১৮৫৩ সালে মুম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত ট্রেন চলার পরে লাইন ধীরে ধীরে আগে এগোতে সুরু করল। ভূসয়াল থেকে একটা লাইন নাগপুরের দিকে আর একটা জব্বলপুরের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে দিল। ঈষ্ট ইন্ডিয়ান রেলয়ে এলাহাবাদথেকে জব্বলপুরের লাইন সংযোগ করাতে মুম্বাই আর কলকাতা ট্রেন চলাচলে যুক্ত হয়ে গেল। ইতিমধ্যে ১৮৭৮ সালের দুর্ভিক্ষে সস্তা শ্রমিক পাবার কল্যানে নাগপুর থেকে রাজনন্দগাঁও পর্যন্ত নাগপুর ছত্তিশগড় রেলয়ে ১৮৮২ সালের মধ্যে মিটার গেজে ট্রেন চালাতে শুরু করল।

নাগপুর ছত্তিশগড় রেলয়ে ছিল গ্রেট ইন্ডিয়ান রেলয়ের মালিকানায়। ১৮৮৭ সালে বেঙ্গল নাগপুর রেলয়ে তৈরী হয় এবং তারা এই নাগপুর ছত্তিশগড় রেলয়ে কিনে নিয়ে তাকে ব্রড গেজে রূপান্তরিত করেন। বেঙ্গল নাগপুর রেলয়ের মুল লক্ষ ছিল লাইনটাকে বাড়িয়ে বিলাসপুর হয়ে আসানসোল পর্যন্ত নিয়ে যাবার যাতে,
কলকাতা আর মুম্বাইএর মধ্যে একটা কম দূরত্বের লাইন পাওয়া যায়। এই উদ্দেশে কাজ এগোতে লাগল আর ১৮৯১ সালের মধ্যে প্রথম মালগাড়ি আসানসোল থেকে নাগপুর পর্যন্ত চলা সুরু করল। ১৯০০ সালে বেঙ্গল নাগপুর রেলয়ে হাওড়াতে এসে যুক্ত হল। পরের বছর মহানদির উপরে ব্রিজ তৈরী হয়ে যাবার
পরে হাওড়া মাদ্রাজ রেল যোগাযোগ সম্পুর্ন হল।

এতদিন ধরে হাওড়া ষ্টেশনের উপর যাত্রীর সংখ্যা যা ছিল, বেঙ্গল নাগপুর রেলয়ে তাদের ট্রেন চালান শুরু করার পরে তার অনেক বৃদ্ধি পেল। কাজে কাজেই
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভাবা হল এক নতুন ষ্টেশনে তৈরির কথা। ১৯০১ সালে লন্ডনের আর্কিটেক্ট হ্যালসী রিকার্ডো কে ভার দেওয়া হল হাওড়া ষ্টেশনের নক্সা বানাতে। সেই অনুযায়ী কাজ শুরে হয়ে ১৯০৫ সালের ১ ডিসেম্বর নতুন হাওড়া ষ্টেশনের উদ্বোধন হল, যদিও ১৯১১ পর্যন্ত ষ্টেশনের কাজ হয়েছে। পৃথিবীর যে কোন তৎকালীন ষ্টেশনের সাথে তাল রেখে এই ডিজাইন, আজও কলকাতার যাত্রী পরিবহন করে যাচ্ছে। তখনকার দিনে এই হাওড়া ষ্টেশন তৈরি করতে প্রায় পৌনে লাখ টাকার মতন খরচ হয়েছিল।