দোল বিলাসে রঙিন পুরনো কলকাতা

দোল এসেছে। তবু রঙের ছোঁয়া লাগে না সাবেক রুপোর পিচকারিতে। আবিরের রেকাবিও আজ শূন্য। সময়ের স্রোতে রুপোর পিচকারি জৌলুস হারিয়ে বাতিলের দলে নাম লিখিয়েছে। মেটিয়াবুরুজের পিয়ারা সাহেব কিংবা বারানসীর মৈজুদ্দিন সাহেব আর নতুন ‘হোলির’ গান বাঁধেন না। নানা রঙের ফুল ও গাছের ছাল গুঁড়িয়ে আজ কে-ই বা তৈরি করেন বিশুদ্ধ আবির?

বাজারে রঙের সংখ্যা হয়তো প্রতি বছরই বৃদ্ধি পায়। এসেছে ভেষজ আবিরও। কিন্তু ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে বাঙালির নিজস্ব দোলের রং। দোলের সেই আয়োজনটাই বদলে গিয়েছে। দোল মানে কি শুধুই একে অপরকে রং দেওয়া? বাঙালির দোলের সঙ্গে মিশে আছে বাবুয়ানি এবং আভিজাত্যও। পুজোআচ্চার পাশাপাশি ছিল রঙে আতর মেশানোর রেওয়াজ। রং খেলা হত রুপোর পিচকারিতে। ফাগ খেলার শেষে গোলাপ জল ছেটানোর ঐতিহ্য কিংবা দোলের বিশেষ কিছু খাওয়াদাওয়া। আজও হাতে গোনা কিছু পরিবারে সেই সব আচার অনুষ্ঠান টিকে আছে।

তখন দোল ছিল অনেক রঙিন। আজও পুরনো রীতি মেনেই গৃহদেবতা রাধা গোবিন্দজিউ-র দোল খেলা হয় দোলের পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদে। দোলের দিন সন্ধ্যায় হয় চাঁচর। পরের দিন দোলের বিশেষ পুজো। দোলের আগের দিন হয় নারায়ণের চাঁচর। সাবেক রীতি মেনে আজও এই ঐতিহ্য চলছে। সন্ধেবেলা ঠাকুর দালানে বসত গানের আসর। বাড়ির সদস্যরাই গাইতেন রাগাশ্রয়ী গান। আগে বাড়ির মহিলারা এই আসরে থাকতেন না। পরে তাঁরাও যোগদান করতেন। গানের শেষে ফাগ ওড়ানো হত। তবে এখন শুধু দোল উপলক্ষে বিশেষ পুজোই হয়ে থাকে।

বাবু কালচারের কলকাতায় হোলিতেও বাবুয়ানির কমতি ছিল না। পুরনো চোরবাগান অঞ্চল অর্থাৎ এখনকার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের রামচাঁদ শীলের পরিবারে দোলের জলসায় গান গাইতে আসতেন গহরজান, মালকাজান শেলি, নূরজাহান প্রমুখ বাঈজি। শীল পরিবারে প্রায় দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে গৃহদেবতা দামোদর জিউ-র দোল উৎসব হয়ে আসছে। দোল হয় প্রতিপদের দিন, অর্থাৎ দোলের পরের দিন। আর পূর্ণিমার দিন হয় চাঁচর। চাঁচরের দিন দামোদরের রাখাল বেশে ও দোলের দিন রাজ বেশে পুজো হয়। চাঁচরের দিন হয় নেড়াপোড়া।

পরের দিন ভোর ৪টের সময় হয় দেবদোল। সেই সময় পরিবারের সকলেই মিলিত হন দামদর জিউকে আবির দেওয়ার জন্য। আগে দোলের প্রস্তুতি শুরু হত মাস খানেক আগে থেকে। দোলের আগের দিন অর্থাৎ চাঁচরের দিন ও দোলের দিন সারারাত চলত যাত্রানুষ্ঠান। আর থাকত বাঈজিগানের আসর। দোলের কিছু বিশেষ প্রথাও ছিল। যেমন যাত্রা দেখা শেষে বাড়ির সকলে যেতেন নিজস্ব বাগানবাড়িতে। সেখানে কাদামাটি খেলার পর গঙ্গা কিংবা পুকুরে স্নান করা হত। তার পর দোলের বিশেষ খাওয়াদাওয়া শেষে সকলে ফিরে আসতেন বাড়িতে। এখনও প্রতি বছর নিয়ম করে লেখা হয় দোলের কিছু নতুন গান, যা গাওয়া হয় দোলের অনুষ্ঠানে। এই পরিবারের দোল উৎসবের জন্য এক বার একটি গান রচনা করেছিলেন নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ।

দোলের ব্যতিক্রমী কিছু আচার অনুষ্ঠান আজও পালন করা হয় মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মার্বেল প্যালেসেও। দোলের সময় রাধাকান্ত, শ্রীমতী এবং গোপিচাঁদ বল্লভের বিশেষ পুজো হয়ে থাকে। অতীতের কোনও প্রথার পরিবর্তন হয়নি। রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক প্রচলিত বৈষ্ণব প্রথা অনুসারে এই সকল আচার অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমীর দিন বিগ্রহের অঙ্গরাগ হয়ে থাকে। অঙ্গরাগের কারিগররা আসেন নবদ্বীপ থেকে। তার পর দেবতাদের শয়নঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর দশমী তিথিতে বিগ্রহের শুদ্ধিকরণ, মার্জনা, স্নান, শৃঙ্গার, অলঙ্করণ, তিলককরণ এবং আবির পরানো অনুষ্ঠান হয়।



একাদশী থেকে শুরু হয় দোল উৎসব, যা চলে প্রতিপদ পর্যন্ত। একাদশীতে নিবেদন করা হয় গোলাপজাম ও লকেট ফল-সহ শরবতের ভোগ। থাকে বেল, ডাব, তরবুজের শরবত। আর থাকে আমছেঁকা। এই সময় প্রতি দিন নিবেদিত হয় রাজভোগ, যা তৈরি হয় রসুইঘরে। ভোগে থাকে চার প্রকার কলাই ভোগ, ময়দার লুচি, ছানার পদ, সিঙাড়া, কচুরি, পটল-বেগুন-এঁচড়ের তরকারি ও চাটনি। এ ছাড়াও থাকে মালপোয়া। পূণির্মার দিন হয় চাঁচর। তিনটি খড়ের ঘরের সামনে শ্রীধর নারায়ণকে স্থাপন করা হয় দেবতাদের প্রতিভূ হিসেবে।

খড়ের ঘরের মধ্যেই দেওয়া হয় আহুতি; হয় ফাগখেলা। নিবেদন করা হয় চাল-কলার নৈবেদ্য। রেড়ির তেলের মশাল জ্বালিয়ে ওই খড়ের ঘরগুলি শেষে অগ্নিদগ্ধ করা হয়। এর তাৎপয,র্র্ মেধাসুরের নিবৃত্তি। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে মেধাসুর বধের পরেই দোল উৎসবের সূচনা হয়েছিল। এর পর দেবতার উদ্দেশে আবির নিবেদন করা হয়। প্রতিপদের দিন ভোরে হয় দেবদোলের বিশেষ পুজো। পরে পঞ্চবটী-সহ তুলসী গাছে দেওয়া হয় আবির।

এ শহরের কিছু অঞ্চলের নামের সঙ্গেও আজও জড়িয়ে রয়েছে দোল উৎসব। সে সময় লালদীঘি এবং লালবাজার দুটোই সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের সম্পত্তি ছিল। লালদীঘির পাশেই ছিল তাঁদের কাছারি বাড়ি। আর এই কাছারি বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই ছিল শ্যামরায়ের মন্দির। প্রতি বছর ধুমধাম করে শ্যামরায়ের দোলযাত্রা পালন করা হত। কাছেই একটি বাজারে দোলের সময় বিক্রি হত কুমকুম আবির। আর সেই থেকেই এই বাজারের নামকরণ হয় লালবাজার। অন্য দিকে, শ্যামরায়ের মন্দিরে দোল খেলার পর বহু মানুষ পাশের দীঘিতে স্নান করতেন। ফলে জলের রং হয়ে উঠত লাল। সেই থেকেই দীঘির নাম হয় লালদীঘি।

সে কালে পাড়ায় পাড়ায় দোলের আমেজটাই ছিল অন্য রকম। দল বেঁধে এক পাড়ার কিছু মানুষ অন্য পাড়ায় বন্ধুদের রং মাখিয়ে আসতেন। আর যাঁদের বাড়িতে চৌবাচ্চা ছিল সেখানে রঙিন জলে একে একে বাড়ির পুরুষ সদস্যদের চোবানো হত। উত্তর কলকাতার কিছু পরিবারে আজও দোলের দিন এই দৃশ্য দেখা যায়।
দোলের পুজো আর রং খেলার পাশাপাশি আরও এক আকর্ষণ ছিল পুরনো কলকাতায়। সেটা হোলির গান।

আগে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি থেকে দোল উপলক্ষে প্রকাশিত হত নতুন গানের রেকর্ড। সেই ১৯০২ সাল থেকে শুরু করে পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্যন্ত ছিল এই ট্রাডিশন। শিল্পী তালিকায় কে না ছিলেন— প্রথম দিকে গহরজান, মৈজুদ্দিন, জোহরাবাঈ থেকে শুরু করে পরের দিকের আখতারিবাঈ, বড়ে গুলাম আলি খান। কিংবা কমলাঝরিয়া, কৃষ্ণচন্দ্র দে, বা যূথিকা রায়। দোলের গানের সেই ঐতিহ্য পরবর্তী কালেও বজায় রেখেছিলেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিমান মুখোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পী।

তখন পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে কলের গানে এই সব নতুন গান বাজত দোলের প্রায় মাসখানেক আগে থেকে। আকাশে বাতাসে অনুভব করা যের বসন্তের ছোঁয়া। এক দিকে ফাগ খেলা, অন্য দিকে এই সব গান। যেন একে অপরের পরিপূরক। কোথায় গেল সেই রঙিন দিনগুলো?