শনিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৮

পহেলা বৈশাখ - স্বাগত বাংলা নববর্ষ

১৪ এপ্রিল মানে বাংলা সনের প্রথম দিবস। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। কালের যাত্রায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যুগে ক্ষণ গণনার প্রথা চালু করা হয়। এর মধ্যে ইসায়ী বা ইংরেজী সনের হিসাব দুনিয়া ব্যাপী প্রচলিত। অঞ্চল এবং ভাষা ভেদেও ক্ষণ গণনার প্রথা চালূ রয়েছে। আরবী সন বা হিজরী সালের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী। ফার্সিদেরও পৃথক সন রয়েছে। কালের আবর্তে বাংলায় ক্ষণ গণনার প্রথাও চালু হয়।

এটা নিশ্চয়ই বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের জন্য গর্বের বিষয়। বাংলা যাদের মুখের ভাষা, জন্মভুমির ভাষা তারা এ নিয়ে গর্ব করবেন। সুতরাং এই ভাষার ক্ষণ গণনার হিসাবের প্রথম দিন নিয়ে কিছুটা আবেগ থাকতেই পারে। যারা বা যিনি এই সন আবিস্কার করেছেন বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পেতে পারেন। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। অন্তত এটা বলা যায় বাংলা ভাষার প্রচলন এই অঞ্চলে এরও বহু আগে শুরু হয়েছিল। যে কারনে এই ভাষার সাথে সঙ্গতি রেখে ক্ষণ গণনা করার একটি পদ্ধতিও চালু করা হয়।

যদিও বাংলা সন চালুর বয়স ৫০০ বছর হয়েছে। কারন হিজর‍ী সানের সাথে সঙ্গতি রেখে এটার হিসাব শুরু করা হয়েছিল। তখন এই অঞ্চলে মুসলমানদের আধিপত্য ছিল। এই ক্ষণ গণনাকে এ অঞ্চলের বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন সকলেই আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন। কারন বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানই বেশি। কাজেই এই ক্ষণ গণনা পদ্ধতিটির পৃথক কোন ধর্মীয় আবেগ বা আবহ তৈরির কোন সুযোগ থাকতে পারে না। এটা নিয়ে বারাবারিও কিছু নেই।

পহেলা বৈশাখ নামটি উচ্চারিত হবার সাথে সাথে দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে মহা উৎসবের একটি চিত্র। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নারীদের শাড়ি ও ছেলেদের পায়জামা পাঞ্জাবি পোশাকে সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে। এদিনে তাদের পূজা এ আরাধনার পবিত্র রং লাল সাদা রঙ্গের কাপড় পরে দলে দলে শোভাযাত্রা বের করে দুঃখকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার লক্ষ্যে। বিভিন্ন কনসার্ট ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখে যোগ করে নতুন মাত্রা। কালক্রমে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখ পূজার সকল আসর অনুষ্ঠান বর্তমানে পহেলা বৈশাখে রুপ নিয়েছে। এদিনে নতুন বস্ত্র পরিধান করে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে,প্রদীপ জ্বালিয়ে রাতে গানের আসর বসায় যাতে গানে গানে সব রোগ শোক দূরীভূত হয়।

১লা বৈশাখ হল বাংলা বর্ষের প্রথম দিন। এই দিনে বাঙালি জাতি শুভ নববর্ষের উৎসব পালন করে। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শুভ নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে বরণ করে নেয়।

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ই এপ্রিল অথবা ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। আধুনিক বা প্রাচীন যে কোন পঞ্জিকাতেই এই বিষয়ে মিল রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

সকল সম্প্রদায় ও জাতি গোষ্ঠী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ১লা বৈশাখের এই শুভ দিনটিকে নিজেদের সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের শেকড় হিসাবে পালন করে। বাংলা নববর্ষের সাল গণনায় এবছরের বর্ষপঞ্জির হিসাবে ১৪২২ সাল । বলতে গেলে নববর্ষের বৈশাখী চেতনা আমাদের বিজাতীয় অপসংস্কৃতি হতে শেকড়ের মূল ধারায় ও রক্তের স্রোতের দিকে নিয়ে যেতে অসম্ভব রকম সাহায্য করে। বছর বছর বৈশাখের অবগাহন আমাদের নতুন প্রত্যয়ে - শেকড় অন্সুন্ধানের সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়।

বাংলা দিনপঞ্জীর সঙ্গে হিজরী ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুর হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু না সূর্যদোয় থেকে থেকে শুরু এটা নিয়ে অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যদোয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু হয়।

বাংলা সনের উৎপত্তি বিতর্ক ও সম্রাট আকবর

সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত।

এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন বাংলা শুভ নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।

ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতেহত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।

বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে নানা তথ্য ও তত্ত্ব পাওয়া যায়। বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে সঠিক কোন ইতিহাস পাওয়া না গেলেও অনেকে বলে থাকেন সম্রাট আকবরের নির্দেশে বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। আবার অনেকে রাজা শশাঙ্কের সময়ে বাংলা সনের শুরু হয়েছিল বলে মত দিয়ে থাকেন। তাদের মতে, সৌর পঞ্জিকা অনুসারে অনেক আগে থেকেই বাংলা বারটি মাস নিয়ে বছর গণনা করা হত৷ এ সৌর পঞ্জিকা ও গ্রেগেরিয় পঞ্জিকা শুরু হতো এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে৷ প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্ক (৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) নাকি গ্রেগেরিয় পঞ্জিকা অনুসারে ১৪ এপ্রিল থেকে বাংলার কাল গণনা শুরু করেছিলেন৷

অনেকে মনে করেন, পাল আমলে এই অঞ্চলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রভূত উন্নতি লাভ করার সময় বৌদ্ধ সহজিয়াদের হাতে সাল গণনার এই রীতি গণমানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছে। বাংলার শাসক পাল রাজাদের সময়ে তাদের সাম্রাজ্য প্রথম বাংলাভুমির বাইরে গিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করে। ফলে বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য এলাকায়। সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এ সময় থেকেই আসাম, ত্রিপুরা, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, উরিষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাডুতে নববর্ষ উদযাপিত হতো৷ কিন্তু সার্বজনীন উৎসব হিসেবে নয়৷ তখন এই নববর্ষকে ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবেই পালন করা হতো৷ এ উৎসবের মূল বিষয় ছিল কৃষিকাজকে প্রাধান্য দেয়া৷ কেননা এ সময় সমাজ-অর্থনীতি কৃষিকাজের উপর অধিকাংশ নির্ভরশীল ছিল ৷

ভারতবর্ষে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর তারা ঋতু বৈশিস্ট্যহীন হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে রাজ্য চালাতে শুরু করেন ও খাজনা আদায় করতেন ৷ কিন্তু খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে সেই বিশেষ দিনটির সাথে কৃষি ফসলের কোনো সমন্বয় ছিল না৷ ফলে অসময়ে কৃষকরা ফসলের খাজনা প্রদান করতে ব্যর্থ হতো৷ বলা হয়, খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা আনা ও প্রজাদের অনুরোধ রক্ষার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাধ্য হয়ে বিখ্যাত রাজ জ্যোর্তিবিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে হিজরি সালে সংস্কার আনার জন্য নির্দেশ দেন৷

তিনি সেই নির্দেশ অনুসারে সৌর ও হিজরি পঞ্জিকা বিশ্লেষণ করে নতুন বাংলা সালের নিয়ম নির্ধারণ করেন৷ ১৫৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয় এবং সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় বা ২৯তম বর্ষে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬) থেকেই নতুন পঞ্জিকা অনুসারে সাল গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয়৷ এ সালের নাম রাখা হয়ে ছিল ফসলি সাল, কিন্তু পরে এটি বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে বলে জানা যায়।

সম্রাট আকবর আসলেই বাংলা সন চালু করেছিলেন কিনা

সম্রাট আকবর কি আসলেই বাংলা সন চালু করেছিলেন নাকি অন্য কিছু ? ইদানিং অনেক লেখক এটি প্রমাণ করতে চান যে মুলতঃ সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক। আসলে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক ছিলেন না। তিনি শাসক হিসেবে অতি জোরে অবৈজ্ঞানিক ও সাধারণ নিয়মে অনুপযোগী একটি ঋতু বৈশিস্ট্যহীন বর্ষকে বাতিল করে পূর্ব হতে প্রচলিত এই এলাকার গণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় অথচ শাসকগণ কর্তৃক উপেক্ষিত একটি ঐতিহ্যপূর্ণ সার্বজনীন বর্ষ গণনার রীতিকে গ্রহণ করে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে ছিলেন। তুর্কি সহায়তায় ভারতে আরব ও মধ্য এশিয়া হতে আগত মুসলিমদের রাজত্ব শুরু হলে ধর্মের নামে এখানকার দীর্ঘ দিনের প্রচলিত বর্ষ গণনার রীতি বা অব্দগুলোকে গোঁড়াও অন্ধ ইসলামী শাসকেরা উৎখাত করে এখানে হিজরী সাল চালু করেছিল। কিন্তু সম্রাট আকবর ছিলেন মুক্ত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী, তিনি গোঁড়া আরব্য রীতির সমর্থক ছিলেন না।

তুলনামূলকভাবে তিনি পারস্য সংস্কৃতিকেই ধারণ করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি ধর্মেও পরিবর্তন এনেছিলেন। ইসলাম ধর্মের পরিবর্তে চালু করেছিলেন দীন-ই-ইলাহি। সেই আদলে তিনি দেখলেন, আরবের হিজরী সালের ব্যবহারটি এই এলাকায় ছিল অকার্যকর। তাই তিনি ভারতের বিশাল এলাকায় বা নেপাল হতে তামিলনাডু পর্যন্ত প্রচলিত অব্দকেই তাঁর শাসন ব্যবস্থায় গ্রহণ করেন। তাছাড়া বাংলা সাল বা বাংলা সংস্কৃতির সাথে সম্রাট আকবরের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি আরব্য সংস্কৃতির চেয়ে ফার্সি সংস্কৃতি ও ফার্সি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন ।

তিনি লোকজ সংস্কৃতি ও পীর ফকিরে ছিলেন বিশ্বাসী। তাই স্বাভাবিক ভাবেই সম্রাট আকবর আরবীর চেয়ে ফার্সিকে গুরুত্ব দিয়ে ছিলেন। তাঁর ভাবনায় এসেছিল ফার্সি আদলে বর্ষ গণনার নিয়ম যা মূলত বাংলা নয়, বলা চলে- সম্রাট আকবর একটি মুঘল অব্দ চালু করতে চেয়ে ছিলেন। সম্রাট আকবরের আমলে ফার্সি মাসের অনুকরণে নতুন প্রবর্তিত মুঘল মাসের নাম ছিল যথাক্রমে কারওয়ারদিন, আর্দি, খোরদাদ, তীর, আমারদাদ, শাহারিবার, ভিহিসু, আবান, আজার, দে, বাহমান ও ইসকান্দার মিজ৷ সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন ধর্ম দীন-ই-ইলাহি’র মতো এই পঞ্জিকারও নাম ছিল তারিখ-ই ইলাহি৷

ভারতীয় ঐতিহ্য ও বাংলা নববর্ষ

সম্রাট আকবর যে পার্সী ভাষা দিয়ে মোঘল শাসিত এলাকায় মাসের নাম দিয়ে ছিলেন এই অঞ্চলের মানুষ কিন্তু তা মেনে নেয়নি। তারা এই সব নাম বাদ দিয়ে সময়ের বিবর্তনে তা বদলিয়ে পূর্ব পুরুষদের আবিষ্কৃত ও চর্চিত নাম ব্যবহার করে আসছে। সে হিসেবে মাসের নামগুলো বিভিন্ন তারকার নাম অনুসারে বর্তমান নামে প্রর্বতন করা হয় ৷ বাংলা বা ফসলি সালে বারো মাসের নাম করা হয়েছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে যা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ সূর্যসিদ্ধান্ত (ঝঁৎুধ ঝরফফযধহঃধ) থেকে গৃহীত হয়েছে ৷ মাসের নামগুলো নিম্নরূপ-

বিশাখা নক্ষত্রের নাম থেকে বৈশাখ; জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ; উত্তরাষাঢ়া থেকে আষাঢ; শ্রবণা থেকে শ্রাবণ; পূর্বভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র; আশ্বিনী থেকে আশ্বিন; কৃত্তিকা থেকে কার্তিক; মৃগশীরা থেকে মাগশীষর (অগ্রহায়ণ);পূষ্যা থেকে পৌষ; মঘা থেকে মাঘ; উত্তর ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন; চিত্রা থেকে চৈত্র ৷ এই নাম গুলো সব এই উপমহাদেশের আদি ঐতিহ্য বহন করে এবং এই নামের সাথে আকবরের প্রচলিত মাসের নামের কোন মিল নাই।

আমাদের সংস্কৃতির এক মৌলিক উপাদন এই বাংলা বর্ষপঞ্জি৷ এ বর্ষপঞ্জির সূচনা হয় নববর্ষ উৎসবের মধ্য দিয়ে যা আমাদের জাতীয় চেতনার মূর্ত প্রতীক ৷ এ উৎসবের উদ্ভব হয়েছিল বাংলার কৃষক সমাজের মধ্য থেকে৷ আজও বাংলাবর্ষ আমাদের কৃষক সমাজের চেতনায় মিশে আছে৷ ভারতীয় ব্যবসায়ীরা অতি নিষ্ঠার সাথে শুদ্ধ চিত্তে হালখাতা এই দিন হালনাগাদ করেন। মূলত ব্যবসায়ীরা এই হালখাতা উৎসবকে বাঙালি জীবনে একটি উচ্চতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

বাংলা নববর্ষ নানা আয়োজনে সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও ভারতে সরকারী ভাবে প্রচলিত নববর্ষ কিন্তু শকাব্দ নিয়মে। আবার ভারতে এই শকাব্দ চালু করেছিলেন বৌদ্ধ সম্রাট রাজা কনিস্ক। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের বাইরে আজকাল এই শকাব্দের নিয়মেই ভারতের সরকারী ও পঞ্জিকা অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতি বছর ২২ মার্চ এই শকাব্দের নববর্ষ। পূজা পার্বণে অনুসরণ করলেও এই নববর্ষ কিন্তু ভারতীয়রা ধুমধামের সাথে পালন করে না।

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ

হালখাতা

এখন পহেলা বৈশাখ ও হালখাতা একে অপরের পরিপূরক। আগে পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা তাদের চাষাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখতেন। যা পরবর্তিতে ব্যবসায়িক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানীরা সারা বছরের বাকীর খাতা সমাপ্ত করার জন্য পহেলা বৈশাখের দিনে নতুন সাজে বসে দোকানে। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে শুরু করেন নতুন বছরের ব্যবসার সূচনা।

বিভিন্ন কর্পোরেট অফিস আজকাল হালখাতা করে তাদের ক্লায়েন্টদের কাছে কার্ড, মিষ্টি সহ নানা মুখরোচক খাবার দিয়ে থাকে। এখন আর বর্ষবরণের এই আয়োজন দেশে সীমাবদ্ধ নেই, এই অনুষ্ঠান বিদেশে প্রবাসীদের জন্য হয়ে ওঠেছে মিলন মেলার মেলার এক বিশাল ক্ষেত্র। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ। দুবাই, টোকিও, নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডনসহ বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে বসে পহেলা বৈশাখের বাহারি আয়োজন। সেই সাথে হালখাতাও দেশের বাইরে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে।

বাংলাদেশে বাংলা শুভ নববর্ষ বাপহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পড়ে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটমুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম-এর লালদিঘী ময়দান-এ। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহবান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ । ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবণ এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো নয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ।

বউমেলা

ঈশা খাঁর সোনারগাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে, যার নাম 'বউমেলা'। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো হিসেবে এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পেতে চায় ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে। বউমেলায় কাঙ্ক্ষিত মানুষের খোঁজে কাঙ্ক্ষিত মানসীর প্রার্থনা কিংবা গান্ধর্ব প্রণয়ও যে ঘটে না সবার অলক্ষে, তা কে বলতে পারবে।

ঘোড়ামেলা

এ ছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত জামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে।

সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে। শিশু-কিশোররা সকাল থেকেই উদগ্রীব হয়ে থাকে মেলায় আসার জন্য। এক দিনের এ মেলাটি জমে ওঠে দুপুরের পর থেকে। হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারণে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তথাপি সব ধর্মের লোকজনেরই প্রাধান্য থাকে এ মেলায়। এ মেলায় শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশি থাকে। মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়। নানারকম আনন্দ-উৎসব করে পশ্চিমের আকাশ যখন রক্তিম আলোয় সজ্জিত উৎসবে, যখন লোকজন অনেকটাই ক্লান্ত, তখনই এ মেলার ক্লান্তি দূর করার জন্য নতুন মাত্রায় যোগ হয় কীর্তন। এ কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। এভাবেই শেষ হয় বৈশাখের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।

চট্টগ্রামে বর্ষবরণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি পাহাড় পার্ক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এখানে পুরোনে বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুইদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মুক্ত মঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থবকে নানা প্রামীণ পন্যের পশরা। থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থাও। চট্টগ্রামে সম্মিলিত ভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিকগণের চেষ্টায়। ইস্পাহানী পাহাড়ের পাদদেশে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ১৯৭৮ সালে এই উৎসা এখনকবর ডিসি হিল পার্কে সরিয়ে নেওযা হয়।

১৯৭৮ সালের উদ্যোগের সয্গে জড়িত ছিলেন ওয়াহিদুল হক, নির্মল মিত্র, মিহির নন্দী, অরুন দাশ গুপ্ত, আবুল মোমেন সুভাষ দে প্রমূখ। প্রথম দিকে প্রত্যেক সংগঠন থেকে দুইজন করে নিয়ে একটি স্কোয়াড গঠন করা হত। সেই স্কোয়াডই সম্মিলিত সঙ্গীত পরিবেশন করতো। ১৯৮০ সাল থেকে সংগঠনগুলো আলাদাভাবে গাণ পরিবেশন শুরু করে। পরে গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদ যুক্ত হওয়ার পর অনুষ্ঠানে নাটকও যুক্ত হয়েছ। নগরীর অন্যান্য নিয়মিত আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শিশু সংগঠন ফুলকীর তিনদিন ব্যাপী উৎসা যা শেষ হয় বৈশাখের প্রথম দিবসে। নগরীর মহিলা সমিতি স্কুলে একটি বর্ষবরণ মেলা হয়ে থাকে।

পার্বত্য জেলায়, আদিবাসীদের বর্ষবরণ

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্রজাতিস্বত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিস্বত্ত্বা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি। উৎসবের নানা দিক রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মার্মাদের পানি উৎসব।

পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন

পশ্চিমবঙ্গে মহাসমারোহে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষারম্ভ পয়লা বৈশাখ। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিতে বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে সমগ্র পশ্চিম বাংলায়। বাংলার গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের মেলবন্ধন সাধিত হয়ে সকলে একসূত্রে বাঁধা পড়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দে। সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুবসংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়কপূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে।

এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। এই মেলায় অংশগ্রহণকারীগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকে। এছাড়া বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তিতা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করে সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা বর্জন করার প্রতীকী প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যমান। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি বহুলপ্রচলিত।

বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই এদিন থেকে তাদের ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন করে, যার পোশাকি নাম হালখাতা। গ্রামাঞ্চলে এবং কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে পয়লা বৈশাখ থেকে আরম্ভ হয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা সমগ্র বৈশাখ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়।

কলকাতা

ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা পয়লা বৈশাখ উদযাপনে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। নববর্ষারম্ভ উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন পাড়ার অলিতে গলিতে নানা সংগঠনের উদ্যোগে প্রভাতফেরি আয়োজিত হয়। বিগত বছরের চৈত্র মাসে শহরের অধিকাংশ দোকানে ক্রয়ের উপর দেওয়া হয়ে থাকে বিশেষ ছাড়, যার প্রচলিত কথ্য নাম চৈত্র সেল।

তাই পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে এবং এই ছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করতে অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে কলকাতার সমস্ত মানুষ একমাস ধরে নতুন জামাকাপড়, ইত্যাদি ক্রয় করে থাকে। পয়লা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার বিখ্যাত কালীঘাট মন্দিরে। সেখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ভোর থেকে প্রতীক্ষা করে থাকেন দেবীকে পূজা নিবেদন করে হালখাতা আরম্ভ করার জন্য। ব্যবসায়ী ছাড়াও বহু গৃহস্থও পরিবারের মঙ্গল কামনা করে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন। এইদিন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধুতি-পাঞ্জাবি এবং শাড়ি পরার রেওয়াজ প্রচলিত।

অন্যান্য দেশে পয়লা বৈশাখ

বাংলাদেশ এবং ভারত ছাড়াও পৃথিবীর আরো নানান দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়ে থাকে।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে যেমনঃ সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানবেরাতে বৈশাখী মেলার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ নাচ-গান-ফ্যাশন শো-খাবারের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির এ ধারাকে আনন্দময় করে তোলে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আগে বার্নউড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলেও ২০০৬ সাল থেকে সিডনি অলিম্পিক পার্কে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলায় বিপুল পরিমাণ লোকের সমাগম ঘটে এবং প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এটি একটি আনন্দঘন দিন।

সুইডেন

সুইডেনেও বিপুল উৎসাহের সাথে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়।

ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডে অবস্থানকারী প্রবাসী বাঙালিরা স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল (পথ উৎসব) পালন করে। এই উৎসবটি লন্ডনে করা হয়।ইউরোপে অনুষ্ঠিত সর্ববৃহৎ এশীয় উৎসব এটি এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া সর্ববৃহৎ বাঙালি উৎসব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন