ছুটিতে বকখালি

বকখালি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার কাকদ্বীপ মহকুমার অন্তর্গত একটি পর্যটন কেন্দ্র ৷ বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এখানকার সমুদ্র সৈকত বিখ্যাত ৷ এখানে আছে ম্যানগ্রোভ বন এবং উন্মুক্ত চিড়িয়াখানা। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার এটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলেন ৷ কলকাতার সঙ্গে বকখালি সড়কপথে যুক্ত ৷ কলকাতা থেকে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক পথে বা রেলপথে নামখানা পযর্ন্ত গিয়ে সেখান থেকে অথবা কলকাতা থেকে সরাসরি বাসযোগে বকখালি যাওয়া যায়। যাওয়ার পথে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পড়ে।

এই নদীর ওপর ৮০ মিটার দীর্ঘ সেতু তৈরী হচ্ছে। এখানে পর্যটকদের জন্য হোটেল আছে। বকখালি থেকে জম্বুদ্বীপ ঘুরতে যেতে পারেন। জম্বুদ্বীপ যাওয়াটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ হলেও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। বঙ্গোপসাগরের মধ্যে একটি দ্বীপের নাম জম্বুদ্বীপ। বকখালি থেকে কিছুটা দূরে ফ্রেজারগঞ্জ থেকে জম্বুদ্বীপ যাওয়ার ভুটভুটি ছাড়ে। কমবেশি ১৫জন নিয়ে নৌকা ছাড়ে। ভাড়া ১৩০০ টাকা মতো। একটু বড় নৌকা হলে ১৬০০ টাকা ভাড়া। হাজার তিনেক টাকায় ছোট লঞ্চ ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে ছোট ভুটভুটিতে যাওয়াটা কিছুটা ঝুঁকির। আর ১০-১৫জন না হলে ভুটভুটি ছাড়ে না।

আপনাদের দলে অতজন না থাকলে নৌকা রিজার্ভ করতে হবে। জম্বুদ্বীপে কিন্তু নামা যায় না। কারণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ফলে দ্বীপে নামলেও আপনি খুব বেশি ভিতরে ঢুকতে পারবেন না। নৌকায় যেতে আসতে সবমিলিয়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লেগে যাবে। জম্বু দ্বীপ পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার অন্তর্গত। দ্বীপটি বকখালি বা ফ্রেজারগঞ্জ থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। দ্বীপটি জনমানব শূন্য। সমুদ্রের মাছ আহরণের মৌসুমে অর্থাৎ অক্তবর- ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেলেরা মাছ আহরণের জন্য এই দ্বীপে আসে।

দ্বীপটি এখন পর্যটন এর প্রধান আকর্ষণ। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় সমুদ্র সৈকত হল বকখালি। দামাল ঢেউ না থাকায় পর্যটনের জায়গা হিসাবে সে ভাবে ছাপ ফেলতে পারেনি। তাই অভিমানী সমুদ্র একাই থাকে নিজের মনখারাপ নিয়ে। নিজের মত নির্জনে। সমদ্রের রঙের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশী নীল রঙের চাঁদোয়া বাড়িয়ে তুলেছে বকখালির আকর্ষণ। সমুদ্রের ধারে নিরিবিলিতে বসে কেটে যায় অনেকটা সময়। বিকেলের দিকে স্থানীয় মানুষজনের ইতিউতি দেখা মেলে। জোয়ার এলে দোলা লাগে জলে। পায়ের উপর আছড়ে পরে ছোট ছোট ঢেউ। বিকেলে সমুদ্রের ধারে গুটি কয় দোকান দেখতে পাওয়া যায়।



সেখানে হরেক রকম খাবার বিক্রি হলেও সবচেয়ে বেশি বিকোয় গরম চা আর মাছ ভাজা। বিকেল কেটে গিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। সূর্য ডোবার হালকা আলো ছুঁয়ে যায় বকখালির আকাশে। নরম আলোয় ভরে যায় বকখালির বালুকাবেলা। সূর্যাস্তের পরও বসে থাকা যায় সমুদ্রের ধারে। ৫টি টাকা খরচ করলেই মিলবে চেয়ার। শান্ত সময় কেটে যাবে চোখের পলকে। বকখালি ঢোকার মুখে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র হোটেল। বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী যে কোনও হোটেলে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে নিন। আছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্যুরিস্ট লজও। চিন্তা নেই খাবার নিয়েও।

বেশ কয়েকটি ভালো খাবারের দোকান রয়েছে। যারা পছন্দ মত মেনু তৈরি করে দেয় এক লহমায়। রাতটুকু হোটেলে কাটিয়ে পরের দিন ভোরবেলা ফের বেরিয়ে পরা সমুদ্রের ধার ধরে। সকালবেলায় সমুদ্র বেশ খানিকটা দূরে সরে যায়। আর সেই দূরে যাওয়া সমুদ্রের কাছাকাছি গিয়ে হাঁটতে অতি বড় নিন্দুকেরও মন্দ লাগার কথা নয়। এই তটেই আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে লাল কাঁকড়ার। দূর থেকে দেখে মনে হবে কেউ যেন আপনার জন্য লাল চাদর বিছিয়ে রেখেছে। অথচ কাছে গেলেই ভ্যানিশ ! আর এদের সঙ্গে দেখা মিলবে জেলেদের। অনেক দূর সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ের মাঝে জাল ফেলে দাঁড়িয়ে তাঁরা।

দেখতে লাগে একটা ছোট বিন্দুর মতো। এরপর পায়ে পায়ে চলে যাওয়া ফ্রেজারগঞ্জের দিকে। ইংরেজ সাহেবদের পছন্দের সৈকতাবাস ছিল ফ্রেজারগঞ্জ। বাংলার ছোটলাট ফ্রেজার সাহেব এখানে এসে পাকাপাকি থাকতে শুরু করলে প্রাচীন নারায়ণগঞ্জের নাম পালটে হয়ে যায় ফ্রেজারগঞ্জ। শান্ত সাগরবেলা, সবুজ ঝাউবন আর ম্যানগ্রোভ অরণ্যর ছোঁয়া ফ্রেজারগঞ্জের প্রকৃতিকে অন্য রূপ দিয়েছে। ফ্রেজারগঞ্জ থেকে নৌকা ভাড়া করে চলে যাওয়া যায় জম্বুদ্বীপে। ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করতে করতে নৌকা গিয়ে পৌঁছবে সেই সবুজে মোড়া অচেনা দ্বীপভূমিতে।

দ্বীপে আছে বিশালাক্ষী মন্দির ও বনবিবির মন্দির। এই দ্বীপে দেখতে পাবেন জেলেদের গ্রামও।বকখালিতে হোটেল থেকে সমুদ্রে যাওয়ার পথেই পড়বে পিশ্চমবঙ্গ বন দফতরের সংরক্ষিত অরণ্য। টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। যদিও ভিতরকনিকা থেকে নিয়ে আসা চারটি কুমির ও সুন্দরবন থেকে আনা অনেকগুলি হরিণ ছাড়া আর কিছু নেই। হাতে সময় থাকলে চলে যাওয়া যায় হেনরিজ আইল্যান্ডে। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে একদিকে সবুজে মোড়া সুন্দরবন আর অন্যদিকে বকখালির সমুদ্র দেখার মজাটা এখানে না এলে অনুভব করা যাবেনা। অসাধারণ অভিঞ্জতা।