কলকাতা মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখলের প্রায় একশ বছর পর ১৮৫৩ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠারও একশ’ বছরে এ অঞ্চলে কোন মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়নি।

হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য পাওয়া সুদূর পরাহত দেখে ডাঃ প্রতাপ চন্দ্র ও ডাঃ এম. এম. বসু কলকাতার আমহার্ট স্ট্রীটে ভারতের প্রথম হোমিওপ্যাথিক স্কুল স্থাপন করেছিলেন। ডাঃ দ্বারকানাথ রায়ের সহযোগিতায় ১৮৮১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী তারিখে ‘ক্যালকাটা হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, পৃথিবীর বৃহত্তম হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ রূপে যা আজও বিদ্যমান। বিংশ শতাব্দির প্রথম কয়েক দশক ভারতীয় হোমিওপ্যাথির গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ক্যালকাটা হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ছাড়াও হোমিওপ্যাথি শিক্ষা বিস্তারের জন্য কলকাতা শহরে স্থাপিত হয় আরও কয়েকটি কলেজ।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ডানহাম হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’, ‘অ্যালেন হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’, ‘হেরিং হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’, ‘আশুতোষ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’, ‘রেগুলার হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’, ‘সেন্ট্রাল হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’, ‘বেঙ্গল হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ’ প্রভৃতি। এইসব কলেজগুলি আপন বিধি অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করতেন, শিক্ষা দিতেন। কলেজগুলির পঠন-পাঠন ব্যবস্থা, সিলেবাস, সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রত্যেক কলেজের পৃথক আইন-কানুন ছিল। বেসরকারী কলেজ, বেসরকারী সার্টিফিকেট।

১৯৩৪ সালের ১লা মার্চ চট্রগামে ডাঃ জাকির হোসেন চৌধুরী এবং সমাজ সেবক আব্দুল হক দোভাষের প্রচেষ্টায় ‘প্যারাডাইজ হোমিওপ্যাথি কলেজ” প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৪৮ সালে এই কলেজের নামকরণ করা হয় “ইষ্ট পাকিস্তান হোমিওপ্যাথিক কলেজ” এবং ১৯৭২ সালে পুনরায় নাম পরিবর্তন করে “ডাঃ জাকির হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল” করা হয়। এই কলেজটি বেঙ্গল গভর্মেন্ট ষ্টেট ফ্যাকাল্টির অন্তর্ভূক্ত ছিল।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৩৭ সালে বাংলার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের একটি সভা হয় কলকাতায়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের মাননীয় জনস্বাস্থ্য মন্ত্রী তমিজউদ্দিন ছিলেন উক্ত সভার সভাপতি। সভায় ‘স্টেট ফ্যাকাল্টি অব হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন’ গঠনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। উক্ত প্রস্তাব যাতে আইন সভায় পাশ হয় এবং সরকারের সমর্থন পায়, মন্ত্রী মহোদয় সে ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দেন।



১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়া ঘিয়াসউদ্দীন এম এল এ দ্বারা ‘হোমিওপ্যাথিক সিস্টেম অব মেডিসিন’ কেন্দ্রিয় আইন সভায় ৪৪-৩৬ ভোটে পাশ হয়। একই সময়ে ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অব হোমিওপ্যাথিক এডুকেশন’ গঠিত হয়। ১৯৪৩ সালে বেঙ্গল হেলথ মিনিষ্টার সৈয়দ নওশের আলী কর্তৃক হোমিওপ্যাথিক বিল আইন সভায় পাশ হয়ে হোমিওপ্যাথি রাষ্ট্রিয় মর্যাদা পায়। ১৯৪৩ সাল থেকে হোমিওপ্যাথিক ফ্যাকাল্টির কার্যক্রম আরম্ভ হয় এবং সবগুলো হোমিওপ্যাথিক কলেজকে একই শিক্ষাব্যবস্থা, সিলেবাস, পরীক্ষানীতি, সার্টিফিকেট প্রদানের নীতিভূক্ত করা হয় ও চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসানের পর ১৯৮৩ সাল হতে সমগ্র ভারতে একই হোমিওপ্যাথিক ডিপ্লোমা কোর্সের প্রবর্তন করা হয়। কোর্সের নামকরণ করা হয় ডি. এইচ. এম. এস. (ডিপ্লোমা ইন হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন এন্ড সার্জারি)। হোমিওপ্যাথি ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হওয়ার নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা জীববিদ্যাসহ উচ্চ মাধ্যমিক (১০+২) পাশ, চার বছরের শিক্ষাক্রম এবং ভারতে সর্বত্র একই ডিপ্লোমা কোর্স- ডি. এইচ. এম. এস. (DHMS)। উল্লেখ্য যে বাংলাদেশে ভারতের প্রায় অনুরূপ ডি. এইচ. এম. এস. কোর্সে ভর্তির নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এস. এস. সি. বা সমমান পাশ, যে কোন শাখা, বিজ্ঞান বাধ্যতামূলক নয়।

ভারতবর্ষে হোমিওপ্যাথির বিস্তারে কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্ণধারের আছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৮৮৭ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় সি. রিঙ্গার অ্যান্ড কোং নামে হোমিও ওষুধের প্রথম ফার্মেসী বা ওষুধের দোকান, ১৮৮৯ সালে স্থাপিত হয় রায় চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানী নামের ওষুধের দোকান, ১৯১৭ সালে স্থাপিত হয় হ্যানিম্যান পাবলিশিং কোম্পানী, যা ওষুধ তৈরী ও পুস্তক প্রকাশনার ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতবর্ষে বিখ্যাত। স্বল্প মূল্যে ওষুধ উৎপাদন ও বিতরণের পুরোভাগে ছিলেন মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য নামে হাওড়া জেলার একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী।

১৮৮৯ সালে তিনি ‘এম ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোং’ নামে কলকাতায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন, পূর্ববঙ্গের কুমিল্লায় ও ঢাকায় ‘এম ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোং’ এর শাখা খোলা হয়। তিনি শুধুমাত্র ওষুধ বিক্রেতাই ছিলেন না, হোমিও চিকিৎসা সংক্রান্ত বাংলা, ভারতীয় অন্য ভাষায় ও ইংরেজী ভাষায় বহু গ্রন্থ তিনি প্রকাশ করেছিলেন।

মহেশ চন্দ্র স্বল্প মূল্যে ওষুধ ও বই বিক্রি করার ব্যবস্থা করায় গ্রাম ও শহরের বহু শিক্ষিত অপেশাদার ব্যক্তিও হোমিওপ্যাথিতে আকৃষ্ট হন। এ ছাড়াও আরও বহু নাম জানা অজানা ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, হোমিও অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষকদের সহায়তায় হ্যানিম্যান প্রবর্তিত হোমিওপ্যাথি আজ ভারতবর্ষে তথা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ইত্যাদি দেশে জনগণের নিকট সমাদরে গৃহীত হয়েছে এবং কোন কোন দেশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে।